এভাবে হাবিব রোজ সেই নির্জন ডেরায় গিয়ে ইবাদত করতে থাকলেন, ১০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগপর্যন্ত। দশম দিনে, জোহরের নামাজের সময় তাঁর মনে একটা দুশ্চিন্তা ভর করল—‘আজ রাতে আমি কী নিয়ে ঘরে ফিরব, আর স্ত্রীকেই–বা কী বলব?’ তিনি যখন বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে মহামহিম, সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর বাড়ির দরজায় একটা গাধাবোঝাই আটা নিয়ে একজন কুলি পাঠালেন। আরেকজন এল চামড়াছেলা একটা ভেড়া নিয়ে, অন্য একজন নিয়ে এল তেল, মধু, শাকসবজি ও নানা মসলা। বাহকেরা সব জিনিস একে একে নামাল। তাদের সঙ্গে ছিলেন সুদর্শন এক যুবক—হাতে ৩০০ রুপার দিরহাম ভরা একটা থলে। হাবিবের বাড়ির কাছে এসে সে দরজায় কড়া নাড়ল।
‘কী চাই তোমার?’ দরজা খুলে হাবিবের স্ত্রী জানতে চাইলেন। ‘মালিক এসব পাঠিয়েছেন,’ সেই সুদর্শন যুবক জবাব দিল। ‘হাবিবকে বলবেন, তুমি তোমার কাজের পরিধি বাড়িয়ে দাও, আমরাও তোমার বেতন বাড়িয়ে দেব।’ এই কথা বলে যুবকটি প্রস্থান করল। রাত নামলে হাবিব ঘরের দিকে রওনা হলেন, লজ্জিত ও বিষণ্ন মন নিয়ে। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই তাঁর নাকে ভেসে এল রুটি আর রান্নার সুঘ্রাণ। স্বামীকে দেখামাত্রই স্ত্রী দৌড়ে এসে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন, মুখও মুছে দিলেন গভীর যত্নে। আর তাঁর সঙ্গে নরম আচরণ করলেন, যেমনটা সে এর আগে কখনো করেননি।
‘শুনছ,’ স্ত্রী বলে উঠলেন, ‘তুমি যাঁর অধীনে কাজ করছ, তিনি তো দারুণ এক ভদ্রলোক, উদার এবং দরদ-মমতায় পূর্ণ। দেখো, এক সুদর্শন যুবক মারফত তিনি কী কী পাঠিয়েছেন! আর ওই যুবক এই বলে গেল—হাবিব যখন ঘরে ফিরবেন, তাঁকে বলো: “তুমি তোমার কাজের পরিধি বাড়িয়ে দাও, আমরাও তোমার মজুরি বাড়িয়ে দেব।”’ এই কথা শুনে হাবিব বিস্মিত ও স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ‘আশ্চর্য!’ তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘মাত্র ১০টা দিন আমি তাঁর হয়ে কাজ করলাম, আর তিনি আমার ওপর এতটা অনুগ্রহ করলেন! আমি যদি আরও পরিশ্রম করি, কে জানে তাহলে তিনি কী করবেন!’ এরপর তিনি দুনিয়াবি সবকিছু থেকে চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর সেবায় সমর্পণ করলেন।
হাবিবের কেরামতি
একদিন এক বৃদ্ধা হাবিবের কাছে এসে তাঁর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লেন এবং হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলেন। ‘আমার একটা ছেলে আছে, অনেক দিন ধরে সে আমার থেকে দূরে। ওর এই বিচ্ছেদ আমি আর সহ্য করতে পারছি না,’ হাবিবের কাছে বৃদ্ধা মিনতির সুরে বললেন, ‘আল্লাহর কাছে একটু প্রার্থনা করুন। হয়তো আপনার দোয়ার বরকতে আল্লাহ ওকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেবেন।’ ‘তোমার কাছে কি টাকাপয়সা কিছু আছে?’, হাবিব জিজ্ঞেস করলেন। ‘হ্যাঁ, দুই দিরহাম আছে,’ বৃদ্ধা জবাব দিলেন। ‘ওটা নিয়ে এসো এবং দরিদ্রদের দান করে দাও।’ বৃদ্ধা তা-ই করলেন। হাবিব তখন আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন। দোয়া শেষ করে বৃদ্ধাকে বললেন, ‘এবার বাড়ি যাও। তোমার ছেলে তোমার কাছে ফিরে এসেছে।’
বৃদ্ধা তখনো নিজের বাড়ির দরজায় পৌঁছাননি, এর আগেই তিনি তাঁর ছেলেকে দেখতে পেলেন। ‘আরে, এই তো আমার ছেলে!’ তিনি চিৎকার করে উঠলেন এবং তাকে সঙ্গে করে হাবিবের কাছে এলেন। ‘কী ঘটেছিল?’ হাবিব ছেলেটির কাছে জানতে চাইলেন। ‘আমি কেরমান শহরে ছিলাম,’ ছেলেটি উত্তর দিল, ‘আমার ওস্তাদ আমাকে কিছু মাংস আনতে পাঠিয়েছিলেন। আমি মাংস কিনে মাত্রই তাঁর কাছে ফিরছিলাম, এমন সময় আচমকা এক বাতাস এসে আমাকে তুলে নিল। তখন আমি এক কণ্ঠকে বলতে শুনলাম, “বাতাস, তাকে তার নিজের ঘরে পৌঁছে দাও, হাবিবের দোয়া এবং দান করা সেই দুই দিরহামের বরকতে।”’ আরেক বছর জিলহজ মাসের ৮ তারিখ হাবিবকে দেখা গেল বসরায়, আর ৯ তারিখ আরাফাতের ময়দানে।



