জীবন আর সময় কোনটাই থেমে থাকে না। বহতা নদীর মত সময়ের সাথে সাথে দেশ, মানুষ আর রাজনীতিতে আসে পরিবর্তন। সে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় যেমন থাকে উন্নয়নের গল্প তেমন থাকে বঞ্চনার ইতিহাস। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এ নিয়মের বাইরের কোন কিছু নয়। তবে লাল সবুজের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন সময়ই সুখকর কিছু ছিল না।
এদেশের সকল সরকারই কতিপয় ব্যক্তিকে বিত্তশালী হবার পথকে সুগম করে দিয়েছে আর সাধারণ জনগন ভাগ্যের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে কোনভাবে জীবন চালাতে ব্যতিব্যস্ত থাকে। কারন তারা জানে রাজনৈতিক দলের কাছে তাদের জীবন খুব একটা মূল্যায়িত হয় না। শেখ হাসিনার দীর্ঘ সময়কালীন সরকার দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু মানব উন্নয়ন করতে পারেনি। ইট পাথরের উন্নয়ন যে সুদীর্ঘ ফল আনবে না এ কথা নানাভাবে বলা হলেও ক্ষমতার দাপটের কাছে বিলীন হয়ে গেছে তা। একজন শেখ হাসিনা শুধু নিজেকে ধবংস করেনি, ধংস করেছে দেশের আপামর জনগনকে। এ কথার ব্যাখ্যা করতে হলে হয়তো অনেক কথা বলতে হবে। কিন্তু রাজনীতির সব কথা সব সময় বলা যায় না।
২০১৮ সালের পর থেকে, ‘আমিই রাজা’- এ দাম্ভিকতার ফল মানুষ দেখেছে ২৪ সালের জুলাই মাসে। সময় গেলে সাধনা হয় না – এ শুধু কথার কথা নয়। তা বুঝতে আওয়ামী লীগের হয়তো আরও সময় লাগবে। যা বিএনপি বুঝতে সময় নিয়েছে ১৭/১৮ বছর। ৭১ এর প্রজন্ম হিসেবে আমরা ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে আজ অবধি বাংলাদেশের অনেক উত্থান পতনের সাক্ষী। তাই এখনকার জেন-জিদের ভাবনা চিন্তা দেখে মনে হয়, একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বিনাশ করে নতুন করে শুরু করা যায় না। আর জাতির জন্ম ইতিহাসকে অস্বীকার করে নতুন ইতিহাসও রচনা করা যায় না। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার যুদ্ধ আর বাংলাদেশের সংবিধান হল আমাদের অস্তিত্ব। তাই সংবিধানকে নতুন করে লেখা যেমন আইনগত ভাবে জটিল তেমনিভাবে এ সংবিধান ছাড়া অতীত ও বর্তমান সরকার প্রশ্ন বিদ্ধ হবে। কারণ বর্তমানের বিএনপি সরকার দেশের কোন নতুন সরকার নয়। বিগত সময়ে বিএনপি সংবিধানে অনেক সংশোধনী এনেছে তাদের আমলে। আসলে ৫৪ বছরের ইতিহাসে দেশের আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যে অভুত্থান বা আন্দোলন হয়েছে, তখনকার প্রেক্ষাপটে সে আন্দোলন প্রয়োজন ছিল। একটা দিয়ে অন্যটাকে বিচার করা যায় না। দু:খজনক হলো ভোট বিহীন নির্বাচন দেখে যে প্রজন্মটি বড় হয়েছে, তারা শুনেছে বা পড়েছে অনেক বিকৃত ইতিহাস। এর জন্য দায়ী দীর্ঘ সময়ের একক একটি সরকার। কথায় আছে- ‘ইতিহাস হলো পাতিহাঁস, এটা এক প্রজন্ম ঘটায় আরেক প্রজন্ম লেখে।’ তবে এবারের জুলাইয়ের আন্দোলনের চিত্রটা অন্যরকম। নতুন প্রজন্ম এতটাই অস্থির যে তারা শর্টকাট রাস্তায় সব কিছু পেতে চায়। দেখার বা বুঝার সময় দিতে নারাজ। আর সে কারনেই আন্দোলনের পর তারা নিজেদের বৈশিষ্ট্যতাকে যেভাবে বিকিয়ে দিয়েছে, তা কতটা গ্রহনযোগ্য সে বিচারের দায়ভার কেবল তাদের। জনগন তাদেরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল। তারা নিজেদের স্বার্থে শরীক হয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সাথে। এটা মানতে পারেনি অধিকাংশ মানুষ।
বর্তমান সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন কোন সরকার নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া তার বাবা মা দুজনের শাসনামলে দেখেছে। এছাড়া ১/১১ পূর্ববর্তী সময়ের সরকারের বিএনপির দলীয় রাজনীতিতে তিনি বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। তা নিয়ে অনেক তর্ক বির্তক রয়েছে। তবে সময়ের পরিক্রমায় আজ তিনি প্রধানমন্ত্রী এবং তার ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে ভালো মন্দ বিচারের বুদ্ধিমত্তার বিকাশের বিস্তার ঘটেছে এটাই স্বাভাবিক। তার উপর নির্বাসিত জীবনে তিনি যে দেশে ছিলেন তার প্রভাবে তিনি যে নিজেকে পরিবর্তন করেছে তা সত্যি প্রশংসনীয়। তবে যে প্রশ্নটি একজন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে চিন্তায় আসে তা হলো, বাংলাদেশকে কি খুব সহজে পরিবর্তন করা যাবে? একদাগে উত্তর দিলে মনে হবে, ‘না।’ কারন বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দূর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার হয় তা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। এর জলন্ত উদাহরণ হলো, এলাকাভিত্তিক টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলদারির প্রভাব বিস্তার। দেশের সব জেলাতেই দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও তার অংগসংগঠনের নেতা কর্মীরা বেশির ভাগ কর্মদোষে এলাকা ছাড়া। আর যারা এলাকায় আছে তাদের ব্যবসা বানিজ্য করা অসম্ভব। কারণ অলিখিত ভাবে ক্ষমতা বদলের সাথে সাথে এলাকার নিয়ন্ত্রণ এখন বিএনপি ও তার অংগসংগঠনের নেতা কর্মীদের হাতে। আবার আওয়ামী লীগ যেমন হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে বিএনপিকে তটস্থ রেখেছে তেমনিভাবেই বর্তমান পুলিশ প্রশাসন একই কাজ করছে। যদিও সরকার বলে যাচাই বাছাই করে মামলা দেয়া হবে। সবই কথার কথা। দেশের এমন কোন প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে বর্তমান সরকার সমর্থিত ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি আছে। বিগত সময়ের মত একই অবস্থা। সোজা উত্তর, ১৬ বছর তারা ছিল বঞ্চিত তাই এবার তাদের পালা। তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন তারেক জিয়া বদলে গেলেই কি দেশ বদলে যাবে? কখনোই না। সবার আগে মানব সম্পদের উন্নয়ন দরকার। আর সে উন্নয়ন হতে হবে নৈতিকতায়, শিক্ষায় ও প্রজ্ঞায়। তবেই- “আই হ্যাভ এ প্ল্যান” সফলতার পথে হাঁটবে।
বিএনপি সরকারের মেয়াদকে বিচার করার সময় আসেনি এ কথাটা যেমন সত্য, তেমনিভাবে একটা প্রশ্ন সরকার কাছে করতেই হয়- আর্থিক সংকটের মাঝেও তাদের নির্বাচনের অঙ্গীকারের কিছু প্ল্যান বাস্তবায়ন কি করে করছে তার ব্যাখ্যা কিন্তু পরিস্কার নয়। ঘটনাটা যদি বিগত সরকারের অবকাঠামো গত উন্নয়নের অন্তরালে জনগনের জন্য আবারও বঞ্চনার প্রতীক হয়, তবে বিএনপি অতীতের মতই ভুল করবে। এবারের সাংসদের বেশ কজনই বিএনপির বিগত সময়ের ক্ষমতার ভাগীদার। তাই প্রশ্ন অনেক কিছু নিয়েই উঠতে পারে। আর বর্তমানের বিরোধী দল হিসাবে জামায়াত বিগত সময়ে বিএনপির শরীক দল ছিল। এবারের বিরোধী দলকে খুব বলিষ্ঠ দল বলা যায় না। কারন এরা বহুরুপী। জুলাই সনদকে তাদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে নিজেদের চাওয়া পাওয়া পূরন করার চেষ্টা করবে। ৭১ এর বিরোধী শক্তি আজ সংসদে তাদের কালিমা মুছনের চেষ্টা করছে। এর জন্য দায়ী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই।
বাংলাদেশের জনগণ ডালভাত খেয়ে জীবনের নিশ্চয়তা চায়। তাদের কাছে জুলাই সনদ, গনভোট বাস্তবায়ন মুখ্য নয়। ঠিক এ কারনেই দেশের রাষ্ট্রপতি কে হবেন কিংবা তার কাজ কি তা নিয়ে ভাবে না। তবে রাজনীতির মেরুকরণে বিএনপিকে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড় হলে অনেক কিছু বদলে যাবে। বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থায় অন্তবর্তীকালীন সরকার পদ্ধতি পুনরায় কার্যকর করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনকে মাথায় রেখে রাষ্ট্রপতি হিসাবে রাজনৈতিক ব্যক্তি আসা প্রয়োজন। আমলা থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার পরিনতি কি তা বিদায়ী রাষ্ট্রপতি চুপ্পু জলন্ত উদাহরণ। অন্যদিকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার প্রধান তারেক জিয়ার বয়স, চিন্তার সাথে দলের সিনিয়র নেতাদের চিন্তাভাবনার সামঞ্জস্যতা এখন অবধি বুঝা না গেলেও, এটা পরিস্কার যে, উভয়ই মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তারেক জিয়ার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এমনটা না হলেই ভালো।
সব কথার পরেও কিছু না বলা কথা থেকে যায়। আর সে কথা হয়তো বলার জন্য বর্তমান সরকারকে আরও দেখতে হবে বুঝতে হবে। দেশের সরকার চালানোতে যারা বিশেষ ভুমিকা পালন করে তারা হলো আমলা, সচিব, পুলিশ প্রশাসন ও বিচার বিভাগ। অতীব দু:খের বিষয় প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ এরা রাজনীতি মুক্ত হয়ে কাজ কখনোই করে না। তারা সুবিধামত সরকারকে ব্যবহার করে। আবার নিজেদের স্বার্থেই ক্ষমতার মোহতে আবিষ্ট করে রাখে সরকারকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থান হবার সম্ভবনা নেই তা আবারো প্রমাণ করেছে ১৯২৬ সালের নির্বাচন। দেশের মানুষের কাছে রাজনৈতিক বড় দল বলতেই আওয়ামী লীগ আর বিএনপি। ১/১১ এর পর মনে করা হয়েছিল বিএনপি বোধ হয় চিরদিনের জন্য বিতাড়িত। এখন যেমন মনে করা হয়ে থাকে আওয়ামী লীগকে। তবে এ চিন্তা বিএনপির অভ্যন্তরে নেই বলে আওয়ামী লীগের গতিবিধি নিয়ে এখন অবধি তারা সুচিন্তিত পরিকল্পনায় কাজ করছে। রাজনীতি হলো দাবার চালের মত। এখানে পাশ পাল্টাতে হলে আবেগের সাথে বিবেকের তাড়নায় কাজ করতে হয়। আর আগামীর সময়টা বিএনপিকে অবশ্যই ভারসাম্যের চালটা দিতে হবে। তা না হলে, ‘আমার বন্ধু মহা যাদু জানে।’ – কথাটা শতভাগ সঠিক হবে না। আর তাই অতীতের ইতিহাসকে ভুল প্রমান করার জন্য এটাই মোক্ষম সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার কাছে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)


