বিস্ময়কর হলেও সত্য, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত (১৯৭৪) হওয়ার পর প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হলো উপমহাদেশের কিংবদন্তী শিল্পী রুনা লায়লার একক সংগীতানুষ্ঠান।
৬২ বছরের বর্ণাঢ্য সংগীতজীবন তাঁর। সামনে নভেম্বরে পা দেবেন ৭৫ বছরে। পৃথিবীর অসংখ্য মঞ্চে গান গাওয়া এই শিল্পীর জন্য শিল্পকলার দরজা খুলতে লেগে গেল পাঁচ দশকেরও বেশি সময়! আর সেই দীর্ঘ অপেক্ষার কথাটাই যেন এক মুহূর্তে বলে দিলেন তিনি নিজের স্বভাবসুলভ রসবোধে।
অনুষ্ঠানের উপস্থাপক, গুণী অভিনেতা, নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী আফজাল হোসেন জানতে চেয়েছিলেন, তাঁকে নিয়ে শিল্পকলার এই প্রথম একক সংগীতানুষ্ঠান নিয়ে অনুভূতি কী?
রুনা লায়লার সংক্ষিপ্ত উত্তর, “অবশেষে ডেকেছে, এটাই তো বেশি।” কিংবদন্তী শিল্পীর এমন উত্তরে কানায় কানায় পূর্ণ জাতীয় নাট্যশালার মিলনায়তনে ছড়িয়ে পড়ে হাসির রোল!
এরপর শুরু হয় প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টার এক সংগীতযাত্রা, যেখানে গান, স্মৃতি, আবেগ আর ইতিহাস মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য সন্ধ্যা।
সংগীত পরিবেশনের আগে প্রথম পর্বে জীবনীধর্মী দুটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়। ভিডিও বার্তায় রুনা লায়লাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন বাপ্পা মজুমদার, ফোয়াদ নাসের, সাদেক আলী, নায়ক আলমগীর, ইমরান মাহমুদুল, আঁখি আলমগীর ও ঝিলিক। অন্য একটি ভিডিওতে রুনা লায়লা নিজেও তুলে ধরেন তাঁর দীর্ঘ সংগীতযাত্রার নানা অধ্যায়।
এরপর শুরু হয় আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন,“রুনা লায়লা সুরকে করেছেন সাধনা, আর সাধনাকে করেছেন জীবন। সৃষ্টি যখন সাধনায় দীপ্যমান হয়, তখন সেই শিল্পী আর কেবল ব্যক্তি থাকেন না; হয়ে ওঠেন এক অনন্ত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও জীবন্ত প্রেরণা।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন। আলোচনা শেষে রুনা লায়লার হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা স্মারক।
বিশেষ সংগীতানুষ্ঠানের প্রথম গান হিসেবে কিংবদন্তী রুনা লায়লা বেছে নেন দেশাত্মবোধক গান ‘দেশের জন্য যারা দিয়ে গেছে প্রাণ, ভুলিনি আমরা’। গান শুরুর আগে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন ভাষা আন্দোলনের শহীদ, মুক্তিযুদ্ধের বীর এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য আত্মত্যাগী মানুষদের।
তিনি বলেন,“আমাদেরকে যারা স্বাধীন বাংলা দিয়েছেন, যারা প্রাণ দিয়েছেন এই দেশের জন্য, যাদের কারণে এই বাংলাদেশ পেয়েছি এবং যারা বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন— তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি প্রথম গানটি করছি।”
গান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের দীর্ঘ করতালি যেন জানিয়ে দেয়, এই সন্ধ্যার শুরুটা শুধুই সংগীত দিয়ে নয়, কৃতজ্ঞতা দিয়েও মোড়ানো। এরপর মঞ্চে কথার জাদু ছড়ান আফজাল হোসেন।
রুনা লায়লাকে পরিচয় করাতে গিয়ে তিনি স্মরণ করেন জীবনানন্দ দাশের সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি, “সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।” তারপর যোগ করেন,“রুনা লায়লার কণ্ঠ মাধুর্য আমাদের মোহিত করে, আমরা দিকহারা হই। তাঁর গান শুনে মনে হয়— সকলেই শিল্পী নয়, কেউ কেউ শিল্পী।”
এই কথার পরই রুনা লায়লা গেয়ে ওঠেন তাঁর বহুল জনপ্রিয় ‘শিল্পী’ গানটি। এরপর একে একে ভেসে আসে ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘আমায় যেতে দাও না মাগো’, ‘বন্ধু তিন দিন’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝড়ে তুমি এলে’, ‘সাধের লাউ’ এবং বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ‘দমাদম মাসকালান্দার’।
চলমান নজরুল বর্ষ উপলক্ষে তিনি পরিবেশন করেন কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভুলিতে পারিনে তাই আসিয়াছি পথ ভুলি’। শ্রোতারা অনুভব করেন, আধুনিক, লোক, চলচ্চিত্র কিংবা নজরুল- প্রতিটি ধারাতেই রুনা লায়লার কণ্ঠ আজও সমান দীপ্ত। বয়স ৭৪, তাতে কী- রুনা লায়লা ইজ রুনা লায়লা!
গানের ফাঁকে ফাঁকে আফজাল হোসেনের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা অজানা গল্প। ৭৪ বছর বয়সেও কেন তিনি এখনও লাইভ গান গাইতে ভালোবাসেন—সেটিও অকপটে জানালেন।
শিল্পী জানান,“রেকর্ড করা গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলানো আমার ভালো লাগে না। আমি এখনও দর্শকের সামনে সরাসরি গান গাইতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।”
স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তিনি ফিরে যান নিজের প্রথম বাংলা চলচ্চিত্রের গানে। জানান, তখন তিনি পাকিস্তানে থাকতেন। করাচি থেকে লাহোরে গিয়ে রেকর্ডিং করেছিলেন। পরিচালক নজরুল ইসলাম ও সুরকার সুবল দাস তাঁকে বাংলা গান গাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কোনো দ্বিধা ছাড়াই রাজি হয়েছিলেন তিনি। সেই গানই ছিল—‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে’।



