‘অ্যাকাউন্টিং ক্লাসের ছেলেটা ৬ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমে গেছে!’

‘অ্যাকাউন্টিং ক্লাসের ছেলেটা ৬ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমে গেছে!’

শেষ হাসি কি রদ্রিই হাসবেন? নাকি খালি হাতেই ফিরতে হবে? আজ রাতেই মিলবে উত্তর। তার আগে পড়ে ফেলুন এই স্প্যানিশ অধিনায়কের বেড়ে ওঠার গল্প। প্লেয়ারস ট্রিবিউনে লিখেছিলেন তিনি।

আমাদের বাড়িতে পড়াশোনাকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হতো। বাবা সব সময় চাইতেন, আমি যেন এক বছরের জন্য কোনো মার্কিন স্কুলের এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে যাই। কিন্তু আমি তো ডুবে ছিলাম ফুটবলে। তাই এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম নয়, ১৪ বছর বয়সে আমাকে পাঠানো হলো একটা সামার ক্যাম্পে, যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাটে। মাদ্রিদের একটা বাচ্চার কাছে কানেটিকাট নামটাই অদ্ভুত। মনে হতো, কোনো হলিউডি সিনেমার ভেতর ঢুকে পড়েছি।

আপনারা নিশ্চয়ই সেই সিনেমাগুলো দেখেছেন, যেখানে বাচ্চারা একটা বড় লেকের ধারে ক্যাম্পে যায়। সেখানে কাঠের তৈরি ডিঙি নৌকা থাকে, গাছে চড়তে হয়, তাঁবুতে ঘুমাতে হয়, কাঠি দিয়ে আগুন জ্বালাতে হয়। জায়গাটা সত্যিই ছিল ঠিক তেমন। ফোন ছিল না। ওয়াই-ফাই ছিল না। সম্পূর্ণ নতুন একটা দেশে আমি একা একা বন্ধু বানানোর চেষ্টা করছিলাম। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলতাম, ‘হ্যালো, আই অ্যাম রদ্রিগো। আই অ্যাম ফ্রম মাদ্রিদ।’ আর ঘুরেফিরে একই কথা, ‘ভাইলোক, আমরা ফুটবল খেলব কখন?’

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠল, কারণ আমি যখন সেখানে গিয়েছি, তখন মাত্রই ২০১০ সালের বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে। ইন্টারনেট চেক করারও উপায় ছিল না, খুব কষ্ট হচ্ছিল। অফিসে একটা ছোট কম্পিউটার ছিল। প্রতিদিন ক্যাম্পের কাউন্সেলরদের কাছে গিয়ে জেনে নিতাম, কোন কোন দল জিতেছে। আপনাদের হয়তো মনে আছে, স্পেন প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরেছিল। আমার মনে হচ্ছিল ওরা আমার সঙ্গে মজা করছে।

‘সুইজারল্যান্ড! সত্যি? তোমরা ঠিকঠাক গুগল করেছ তো?’

খেলা যখন জার্মানির বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে গড়াল, আমার তখন টেনশনে মরো মরো দশা। যত দূর মনে পড়ে, তখন একটা নৌভ্রমণে ছিলাম। প্রধান কাউন্সেলরকে বারবার অনুরোধ করছিলাম, ‘একটু স্কোরটা জেনে দেবে প্লিজ?’ অবশেষে কেবিনে ফিরে জানলাম, স্পেন ফাইনালে উঠে গেছে।

সংবাদ সম্মেলনে রদ্রি

সেই ফাইনাল ম্যাচ ও ইনিয়েস্তার গোল

ফাইনালের দিন প্রধান কাউন্সেলরের কাছে রীতিমতো অনুনয়-বিনয় শুরু করলাম, যেন কম্পিউটারে আমাকে ম্যাচটা দেখতে দেওয়া হয়। তিনি যে কম্পিউটারটা বের করলেন, সেটার পর্দা মাত্র ১০ ইঞ্চি। একদম ছোট। মনে মনে বললাম, এটাই সই। দেখতে পারলেই হলো।

আমরা তখন বনের একদম মাঝখানে। কীভাবে কীভাবে যেন সেখানেই একটা সরাসরি সম্প্রচারের লিংক পেয়ে গেলাম, যেটা আবার পুরোপুরি বৈধও না। এমন একদল মার্কিনের মাঝখানে খেলা দেখা শুরু করলাম, যাঁদের মাঠে কী হচ্ছে তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। ইনিয়েস্তা যখন গোলটা করল, চিৎকার করতে করতে ছুটে গেলাম বাইরে। লেকের চারপাশে দৌড়াতে শুরু করলাম। ‘ভামোওওওস!’

মার্কিনরা ভাবছিল আমি পাগল হয়ে গেছি। ওদের বিস্মিত দৃষ্টিই বলে দিচ্ছিল, মনে মনে বলছে, ‘মানে কী! স্প্যানিশ ছেলেটা কি সত্যিই কাঁদছে? সামান্য ফুটবলের জন্য!’ ওরা বুঝতে পারছিল না, এই জয় আমার কাছে কী।

আমার দুই পৃথিবী

সারাটা জীবন আমি দুটি জগতের মাঝখানে কাটিয়েছি। একটা বাস্তবের দুনিয়া, অন্যটা ফুটবলের দুনিয়া। ফুটবল আমার নেশা। ছোটবেলা থেকে এই নেশার পেছনে ছুটছি। বয়স যখন ১০, তখনো যদি কোনো ম্যাচে ভালো খেলতে না পারতাম, সারা দিন মা-বাবার সঙ্গে কথা বলতাম না। মা-ও আমার দিকে তাকিয়ে ভাবতেন, ‘সমস্যা কী? এটা তো স্রেফ একটা খেলা!’

খুব ছোটবেলাতেই মা-বাবার সঙ্গে একটা অলিখিত চুক্তি হয়েছিল। কখনো এ নিয়ে সরাসরি কথা বলেছিলাম কি না মনে নেই, তবে একধরনের বোঝাপড়া হয়ে গিয়েছিল। চুক্তিটা হলো—যদি ফুটবলের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই, আমাকে একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়তে হবে। তাই ১৭ বছর বয়সে মাদ্রিদ ছেড়ে (স্প্যানিশ ফুটবল ক্লাব) ভিয়ারিয়ালে চলে আসি, একই সঙ্গে জউমি আই ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই।

পরের বছর লা লিগায় আমার অভিষেক হয়। টিভিতে আমাকে দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের মাথা ঘুরে গিয়েছিল। ওরা বিশ্বাসই করতে পারছিল না, অ্যাকাউন্টিং ক্লাসের ছেলেটা ৬ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমে গেছে!

‘এ কী! এটা কি সত্যিই সেই ছেলে?’

‘গুগল কর, গুগল কর!’

‘নাহ! এটা সেই রদ্রিগো হতেই পারে না! রদ্রিগো নামের আরও কত মানুষ আছে। এটা নিশ্চয়ই ও না!’

জার্সি-টার্সি পরা অবস্থায় টিভিতে একটু অন্য রকমই লাগে। আর আমার চোখে-মুখে বোধ হয় বেশ একটা গম্ভীর ভাব ছিল। তাই ওদের মধ্যে কয়েকজন নিশ্চিত হয়েই বলেছিল, ‘নাহ, এটা ও না।’

এরপর যখন আরও বেশি বেশি খেলতে শুরু করলাম, ওরা বুঝল ওটা সত্যিই আমি। আমাকে ক্যাম্পাসে দেখে অবাক হয়ে বলত, ‘সে কী, তুমি এখানে! তুমি না কাল রাতেই বার্সেলোনার বিপক্ষে মাঠে ছিলে!’

ছেলেবেলা থেকে ফুটবল ছিল তাঁর নেশা

ক্লাস বনাম ম্যাচ

শিক্ষকদের চোখে আমি অবশ্য আর দশজন ছাত্রের মতোই ছিলাম। স্পেনে বিশ্ববিদ্যালয় মানে বিশ্ববিদ্যালয়ই। আপনি সেখানে পড়াশোনা ও কাজে এসেছেন। তাই যখন ল্যাপটপ নিয়ে আমার ছোট্ট ঘরে বসতাম, কাজে এতটাই মগ্ন হয়ে যেতাম যে আর সব ভুলে যেতাম।

একদিন কোনো একটা পরীক্ষার জন্য পড়ছিলাম। ফোন সাইলেন্ট করা ছিল। এক ফাঁকে হঠাৎ ফোন হাতে নিয়ে দেখি প্রায় ২০টা খুদে বার্তা, ৫০টা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ আর ১০টি মিসড কল! ভাবলাম ঘটনা কী! কেউ কি মারা গেছে!

আমার এক সতীর্থ ফোন করছিল। ধরলাম।

‘রদ্রি, তুমি কোথায়?’

‘কোথায় মানে? আমি তো এখানেই, ইউনিভার্সিটিতে।’

‘ম্যানেজার তোমাকে খুঁজছেন। সবাই তোমাকে খুঁজছে।’

‘কেন?’

‘আজ ভ্যালেন্সিয়ার সঙ্গে আমাদের ম্যাচ। সবাই বাসে উঠে গেছে।’

আমার মনে হলো ওরা মজা করছে। বললাম, ‘ধুর, মজা নিও না, ম্যাচ তো আগামীকা…’

কথা শেষ করতে পারলাম না। আপনারা কখনো এমন দুঃস্বপ্ন দেখেছেন—স্কুলে গিয়েছেন, অথচ পরীক্ষার কথা ভুলে গেছেন? ঠিক সেই জিনিসটাই আমার সঙ্গে ঘটছিল। তবে স্বপ্নে না, বাস্তবে! আর সেটা কোনো স্কুল ছিল না, ছিল খোদ ‘লা লিগা’।

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, বাস ছেড়ে দাও। আমি হোটেলেই দেখা করছি।’

ভাইরে ভাই! যত দ্রুত সম্ভব জামাকাপড় পরে দিলাম গাড়ির দিকে দৌড়। ভ্যালেন্সিয়ার রাস্তায় আমার ওপেল গাড়িটাই সেদিন একদম জেমস বন্ডের মতো ছুটিয়েছিলাম। হোটেল ছিল এক ঘণ্টার দূরত্বে। যখন সেখানে পৌঁছালাম, ততক্ষণে টিম মিটিং শুরু হয়ে গেছে। ‘কুকুরটা হোমওয়ার্ক খেয়ে ফেলেছে’ টাইপ চেহারা করে আমি ভেতরে ঢুকলাম।

কিন্তু না, ফুটবলে এসব অজুহাত চলে না। সেদিন আমাকে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য সেটা আমার পাওনাই ছিল। ওটা ছিল আমার জন্য একটা বিরাট শিক্ষা। কারণ বুঝতে পেরেছিলাম, আমাকে আমার এই দুই পৃথিবী সামাল দেওয়ার কাজটা আরও ভালোভাবে করতে হবে।

স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি

ফুটবলের আসল জাদু

জীবনের এই সফরের প্রতিটি পদক্ষেপে আমি ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে শিখেছি, নতুন নতুন শিক্ষা যোগ করেছি। এটা যেন ধাঁধার একেকটা টুকরো মেলানোর মতো। ভিয়ারিয়ালে শিখেছি, ফুটবলার হওয়া আর পেশাদার ফুটবলার হওয়ার মধ্যে পার্থক্য কী।

যখন আপনি আপনার দেশের হয়ে জেতেন, সেই আবেগটা আবার একেবারেই আলাদা। সেটা তো শুধু কোনো শহরকে আনন্দ দেওয়া নয়, পুরো একটা দেশকে আনন্দে আত্মহারা করা। কত শত ভিন্ন ভিন্ন ধরনের মানুষ, ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্ম! একটা সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্মও সেই আনন্দের অভিজ্ঞতা প্রথমবার অনুভব করে।

যে রাতে ইয়ামাল ফ্রান্সের বিরুদ্ধে গোল করেছিল, কিংবা মিকেল (মেরিনো) যখন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে গোল করল, হাজারো শিশু রাস্তায় নেমে পাগলের মতো ছুটেছিল! শুধু হাজার না, লাখো!

পাঠ্যবই, ইকোনমিকস, অ্যাকাউন্টিং…ইত্যাদির ওপর সম্মান রেখেই বলছি, পৃথিবীতে কেবল একটা জিনিসই আছে, যা মানুষের হৃদয়কে এভাবে ছুঁয়ে যেতে পারে। আর তা হলো ফুটবল।

Scroll to Top