যুদ্ধ আবার পুরোদমে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা

যুদ্ধ আবার পুরোদমে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা
  • ইরানের বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও সেতুর মতো বেসামরিক স্থাপনায় মার্কিন হামলা।

  • কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান ও সৌদিতে মার্কিন স্থাপনায় ইরানের পাল্টা হামলা।

  • নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতে ইরানে অন্তত ৫০ জন নিহত।

  • জর্ডানে ইরানের হামলায় ২ মার্কিন সেনা নিহত। এক মার্কিন সেনা নিখোঁজ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে আবার পুরোদমে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) শর্তগুলো ওয়াশিংটন আর মানবে না। গতকাল শনিবার ইরানও এমওইউ সম্পর্কে একই অবস্থানের কথা জানিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এভাবে আর দু-তিন দিন হামলা চালালে তেহরান ‘সর্বাত্মক অভিযান’ শুরু করবে।

যুক্তরাষ্ট্র গতকাল টানা সপ্তম দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে পারস্য উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট দেশের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে ইরান।

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে এমওইউ সই করে। এতে সব ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে সংঘাত বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করা, ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে আরও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল।

প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তানের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের নেতা ও কর্মকর্তারা আলোচনায় বসেন। এ বৈঠকের পরপর দুই দেশের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়। থেমে থেমে তা অব্যাহত ছিল। কিন্তু গতকাল টানা সপ্তম দিনের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোকেও নিশানা করছে। নতুন করে সংঘাত শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটিতে অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন। এদিকে জর্ডানে গত শুক্রবার ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র

গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান আলোচনায় না ফিরলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে। এর পর থেকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে মার্কিন বাহিনী।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি গতকাল লিখিত বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘন করছে। এতেই প্রমাণ হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর ‘মূল্যহীন ও অকার্যকর’।

এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন হামলা আরও দু–তিন দিন অব্যাহত থাকলে তেহরান সর্বাত্মক অভিযান আবার শুরু করবে।

পাল্টাপাল্টি হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শুক্রবার দিবাগত রাতে টানা সপ্তম দিনের হামলায় তারা ইরানের নজরদারি ব্যবস্থা, সামরিক রসদ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার ও নৌবাহিনীর অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, হরমোজগান প্রদেশে সর্বশেষ মার্কিন হামলায় তিনজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। দুটি সেতু, একটি সড়ক সুড়ঙ্গ, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১১৬টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার অচল হয়ে পড়েছে।

মার্কিন হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশ কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে হামলা চালিয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) গতকাল জানিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাবে তারা কুয়েতের একটি তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। কুয়েতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার কারণে কয়েকটি উৎপাদন ইউনিট বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

হেলিকপ্টার মেরিটাইম স্ট্রাইক স্কোয়াড্রন ৩৭-এর একটি ‘এমএইচ-৬০আর সি হক’ ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস পিঙ্কনি থেকে উড্ডয়ন করছে

বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত শেখ ইসা বিমানঘাঁটির বিমান আশ্রয়কেন্দ্র, জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও সংযোগকারী কয়েকটি সেতু লক্ষ্য করে হামলা চালনো হয়েছে বলেও জানিয়েছে ইরান। পাশাপাশি জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংক লক্ষ্য করেও হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে দেশটি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, প্রায় তিন মাস পর শুক্রবার দিবাগত রাতে প্রথমবারের মতো সৌদি আরবেও হামলা চালিয়েছে ইরান। রাজধানী রিয়াদের কাছে আল-খারজে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু এলাকায় সতর্কসংকেত বেজেছে।

ঘটনার বিষয়ে জানাশোনা আছে এমন দুই ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেন, আল-খারজের ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছেন। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ বা ইরান হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

জর্ডানে দুই মার্কিন সেনা নিহত

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শুক্রবার জর্ডানে ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং অপর এক সেনা নিখোঁজ হয়েছেন।

সেন্টকম জানায়, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকানোর অভিযানের সময় এ ঘটনা ঘটে।

আল–জাজিরার খবরে বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন–ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর প্রথম পর্যায়ে ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন। এরপর এক বিমান দুর্ঘটনায় পাইলটের মৃত্যু হয়। এখন জর্ডানে নিহত ২ জনসহ নিহতের সংখ্যা দাঁড়াল ১৬।

বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য

ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের কর্মকর্তারা জানান, গত ১০ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ১২টি শহরের ৯৫টি স্থানে হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন। হামলার ফলে বিদ্যুৎ স্থাপনা ও পানি শোধনাগারের পাম্পে হামলার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের সুপেয় পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন করে সংঘাত শুরুর পর ৬ জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকের সব প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তাই তেহরানও ওই সমঝোতার আওতায় থাকা নিজেদের সব অঙ্গীকার স্থগিত করেছে।

যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ইরানে টানা হামলার পরিধি ও মাত্রা দিন দিন বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানও উপসাগরীয় দেশগুলোয় হামলা চালিয়ে জবাব দিচ্ছে। তিন মাসের মধ্যে প্রথমবার সৌদি আরবে হামলা হয়েছে। সিরিয়ায় এই প্রথমবারের মতো হামলা চালানোর খবর পাওয়া গেছে।

কাতারভিত্তিক আরব পারস্পেকটিভস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইদন আলকিনানি আল-জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধ যেদিকে মোড় নিচ্ছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। ধীরে ধীরে এটা অনেক বেশি বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। আলকিনানির মতে, আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক কোনো সংগঠনের উদ্যোগের অনুপস্থিতি এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক আইনের কোনো কার্যকারিতা না থাকা।

Scroll to Top