দুই রাউন্ড শেষে শিরোপা দৌড়ে এগিয়ে যারা | চ্যানেল আই অনলাইন

দুই রাউন্ড শেষে শিরোপা দৌড়ে এগিয়ে যারা | চ্যানেল আই অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বিশ্বকাপ শুরুর পর ১২ দিন পার হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সব দল দুই রাউন্ড করে খেলে ফেলেছে। সব বড় দলই প্রায় জয় তুলেছে এবং ক্লাব-দেশের বড় বড় তারকারা একের অধিক গোল করেছেন। বড় দলগুলো বা বিশ্বকাপের ফেভারিটের তকমা পরে যারা এবার খেলতে এসেছিল, তাদের অনেকে হোঁচটও খেয়েছে। অনেক দল উঠে গেছে নকআউট পর্বে। এবারের ৪৮ দলের আসরে প্রথম নকআউট পর্ব শুরু হবে সেরা ৩২-এ থাকা দলগুলো নিয়ে। এই দুই ম্যাচের খেলা দেখে খানিকটা বোঝা যাচ্ছে শিরোপা দৌড়ে কারা এগিয়ে আছে, কারা পিছিয়ে পড়েছে এবং কাদের সম্ভাবনা আছে পরের ম্যাচে জয় তুলে এগিয়ে যাওয়ার।

প্রথমেই আমাদের দেখতে হবে দুই রাউন্ড শেষে ভালো খেলে এগিয়ে আছে কারা। পারফরম্যান্সের বিচারে সবার থেকে এগিয়ে রাখতে হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। এরপর খেলার ধরন ও গতিতে এগিয়ে রাখতে হবে ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্সকে। ব্রাজিল, মরক্কো, পর্তুগাল, স্পেন, জার্মানি, আইভরি কোস্ট, সেনেগাল, জাপান এমনকি বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মেক্সিকোও এবারের বিশ্বকাপে শিরোপার দাবি রাখে। কেউ কেউ প্রথম বা দ্বিতীয় ম্যাচে হোঁচট খেলেও তাদের গুরুত্ব এখনও কমে যায়নি। তবে এ দলগুলোর সবাই মোটামুটি নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে ফেলেছে।

বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকে সরাসরি প্রথম বা দ্বিতীয় স্থানে থেকে পরের রাউন্ড নিশ্চিত করার হিসেবে এগিয়ে আছে- গ্রুপ ‘এ’ থেকে সাউথ কোরিয়া, ‘বি’ থেকে কানাডা, সুইজারল্যান্ড, ‘সি’ থেকে ব্রাজিল, মরক্কো, ‘ডি’ থেকে অস্ট্রেলিয়া বা প্যারাগুয়ে। ‘ই’ গ্রুপ থেকে জার্মানি ও আইভরি কোস্ট। ‘এফ’ থেকে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে নেদারল্যান্ডস, জাপান এবং সুইডেন তিন দলই। ‘জি’ গ্রুপ থেকে মিশর, ইরান এবং বেলজিয়াম একই অবস্থানে রয়েছে। ‘এইচ’ গ্রুপে স্পেন এবং উরুগুয়ে এগিয়ে। ‘জে’ গ্রুপে অস্ট্রিয়া বা আলজেরিয়ার মধ্যে এক দল দ্বিতীয় হতে পারবে। ‘কে’ গ্রুপ থেকে কঙ্গো এবং পর্তুগালের মধ্যে এক দল দ্বিতীয় হওয়ার দৌড়ে আছে। ‘এল’ গ্রুপ থেকে ইংল্যান্ড, ঘানা এবং ক্রোয়েশিয়ার মধ্যে সমানতালে লড়াই চলছে।

এবারের বিশ্বকাপে প্রথম বড় ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ও গত আসরে সেমিফাইনাল খেলা মরক্কো। দুদলই এখন পর্যন্ত ভালো খেলা উপহার দিয়েছে। ব্রাজিলের নামের সাথে তাদের খেলার ধরন ও পারফরম্যান্স মোটেও সন্তোসজনক হয়নি, ম্যাচটি ড্র হয়েছিল ১-১ গোলে। তবে ফেভারিটের তকমা পরে না আসলেও এবারের আসরে মরক্কো ভালো করবে সেটা বলাই যায়। তেমন স্পিরিট কাজ করছে কাগজে-কলমে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস বা আফকন চ্যাম্পিয়নদের মাঝে। এবারের আসরে শিরোপার দৌড়ে মরক্কোকে এগিয়ে রাখছেন অনেকে। তবে ব্রাজিলের হেক্সা মিশন এবারও পূরণ হবে না এমন মনে করছেন অনেক সমর্থক। তাদের খেলার ধরনের কারণে এমনটা মনে করছেন তারা। যদিও দলটির নাম ব্রাজিল এবং কোচের দায়িত্বে কার্লো আনচেলত্তি। তাই নকআউটের পর থেকে অতিমানবীয় কিছু হবে আশা ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের। আবার চোট কাটিয়ে প্রথম ম্যাচে নামতে যাচ্ছেন ব্রাজিলের আশা-ভরসা নেইমার, সেটিও অন্যতম কারণ।

ফ্রান্স বাদে এর আগের কয়েকটি আসরে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে নিয়ে বিপরীত বা প্রতিপক্ষ দলের অনেক সমর্থক এমন আশা করলেও আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স তাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। লাতিন পরাশক্তি বিশ্বজয়ী মেসিদের এখনও যেমন পারফরম্যান্স তাতে সমর্থকরা আবারও আশায় বুক বেঁধেছেন দলটি টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা ঘরে তুলবে। দুই ম্যাচে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্সও সেই কথা বলেছে। আর্জেন্টিনার দুই ম্যাচে করা মোট পাঁচ গোলের সবকটি এসেছে লিওনেল মেসির থেকে, হ্যাটট্রিকও করেছেন তিনি। মহাতারকা প্রথম দুই ম্যাচের পাঁচ গোল করে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন। দলের সঙ্গে আছেন জুলিয়ান আলভারেজ, থিয়াগো আলমাদা, রদ্রিগো ডে পল, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার বা এনজো ফের্নান্দেজের মতো তারকারা। টিম স্পিরিট এবং দলের বোঝাপড়ায় এখন পর্যন্ত সবার থেকে এগিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, এবারও শিরোপার দৌড়ে অন্য সবার থেকে এগিয়ে আলবিসেলেস্তেরা।

দুই রাউন্ড শেষে শিরোপা দৌড়ে এগিয়ে যারা | চ্যানেল আই অনলাইন

বিশ্বকাপে এবারের আসরে শিরোপার অন্যতম দাবিদার গত দুই আসরের ফাইনালিস্ট, গতবারের রানার্সআপ ফ্রান্স। দলটি প্রথম ম্যাচে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস চ্যাম্পিয়ন সেনেগালকে খুব একটা পাত্তা দেয়নি। প্রথম ম্যাচেই তাদের পারফরম্যান্স জানিয়ে দিয়েছে আবারও তারা শিরোপার জন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকোতে এসেছে। কাইলিয়ান এমবাপে, উসমানে ডেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে বা দিজায়ার দুয়ে কাকে ছেড়ে কাকে আটকাবে, এটাই প্রতিপক্ষের অন্যতম চিন্তার কারণ। খেলোয়াড়দের গত একবছরের পারফরম্যান্স এবং ফরাসি ক্লাব পিএসজির চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জয়ের দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় ছিল ফ্রান্সের, যা তাদের মনোবল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দলটির ফরোয়ার্ড ও অধিনায়ক এমবাপে দুই ম্যাচে চার গোল করেছেন এবং নকআউটে উঠে জানান দিয়ে রেখেছেন, এবারও তারা বিশ্বকাপ জয়ে কাউকে ছাড় দেবে না।

প্রতিবারই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা দাবিদার হিসেবে খেলতে আসে ইংল্যান্ড। দলটির খেলোয়াড়, কোচ বা সমর্থকদের আচরণে থাকে শিরোপা জেতার অদ্ভুত এক চাহিদা। শুরু থেকে সেভাবেই আশাটা জিইয়ে রাখেন থ্রি লায়ন্সদের খেলোয়াড়রা। তবে নকআউটের যেকোনো পর্যায়ে হোঁচট খেয়ে ছিটকে যেতে হয় তাদের। তবে গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের গতি ও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স জানাচ্ছে, এবার তাদের ঘরেই ফিরবে হয়তো ফিরতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের শিরোপা। যদিও দ্বিতীয় ম্যাচে আফ্রিকান দেশ ঘানার কাছে গোলশূন্য ড্র করে হোঁচট খেয়েছে দলটি। তবে পুরো ম্যাচে তাদের পারফরম্যান্স এবং বলের দখলই বলে দিয়েছে কিছু একটা এবার করেই ছাড়বে হ্যারি কেনের দল। প্রথম ম্যাচে দুই গোল করে আবারও গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে টিকে আছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। পারফরম্যান্সের পর ভাগ্য এবং সময়ই বলে দিবে ১৯৬৬ সালের পর এবার শিরোপা থ্রি লায়ন্সদের ঘরে ফিরছে কিনা।

এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম ফেভারিট দল নেদারল্যান্ডস। বিশ্বকাপের আগে তাদের নিয়ে তেমন কোন আলোচনা না থাকলেও সুইডেন ম্যাচের গতি ও খেলায় মুগ্ধ হয়েছেন অনেক ফুটবল সমর্থক। প্রথম ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র হলেও সুইডেনের বিপক্ষে ৫-১ গোলের বড় জয় তাদের নামের পাশে ফেভারিটের তকমা যোগ করেছে। সঙ্গে দলটির খেলার গতি এবং নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া প্রতিপক্ষকে ভাবিয়ে তুলেছে। এবারের আসরে শিরোপার অন্যতম দাবিদার ডাচরা প্রতিপক্ষের চিন্তার কারণ হবেন নিশ্চিত। দলটির একক কোন বড় তারকা না থাকলেও পুরো দল মিলে ভালো করবে বিশ্বকাপে। অন্যদিকে, এশিয়ার একমাত্র প্রতিনিধি জাপান যারা নিজেদেরকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার মনে করতে পারে। প্রথম দুই ম্যাচের পারফরম্যান্স এবং বিশ্বকাপের আগে বড় বড় কয়েকটি দলকে হারানো তাদেরকে ভালো আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। জাপানের দলগত পারফরম্যান্স যেকোনো দলকে হারিয়ে দিতে পারে। এবার আসরে সেমিফাইনাল বা শিরোপার দৌড়ে এগিয়ে ফাইনালে গেলেও অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকবে না।

বিশ্বকাপে হট-ফেভারিটের তকমা পরে এসেছিল ইউরোপের অন্যতম দুই দেশ স্পেন ও পর্তুগাল। তবে দল দুটির প্রথম দুই ম্যাচের পারফরম্যান্স কোনভাবেই বলছে না তারা নামের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছে। তবুও শিরোপার দাবি থেকে দল দুটি ফেলা দেয়া যাচ্ছে না। প্রথম ম্যাচে হোঁচট খাওয়ার পর দ্বিতীয় ম্যাচে স্পেন এবং পর্তুগাল ঘুরে দাঁড়িয়েছে। স্পেন ৪-০ গোলের বড় ব্যবধানে সৌদি আরবকে হারিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে। চোট কাটিয়ে ফর্মে দেখা গেছে স্প্যানিশ ওয়ান্ডারকিড লামিন ইয়ামালকে। নকআউট নিশ্চিত না হলেও পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়াতে দলটির তেমন বাধা থাকবে না বলাই যায়। অন্যদিকে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে নিজের জানান দিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। দুই গোল করে দলকে জেতানোর পাশাপাশি দেশের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েছেন মহাতারকা। দলকে টেবিলের শীর্ষে তুলে জানান দিয়েছেন ৪১ বছর বয়সেও ফুরিয়ে যাননি। পর্তুগালের দলগত পারফরম্যান্স ঠিকঠাক থাকলেও বিশ্বকাপে যেকোনো দলকে হারানোর সক্ষমতা আছে দলটির মধ্যে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবারের আসরে সেরা চারের লড়াইয়ে স্পেন এবং পর্তুগালকে দেখা যেতে পারে বলছে তাদের পারফরম্যান্স।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলে হওয়া আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল জার্মানি। অথচ আগের দুই বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নেয়া জার্মানি এবারের আসরে প্রথম দুই ম্যাচ খেলেই নকআউট পর্বে উঠেছে। প্রথম ম্যাচে দলটি নবাগত কুরাসাওয়ের জালে ৭-১ গোলের বড় জয়ের পর আইভরি কোস্টের জালে শেষ মুহুর্তের গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলেছে জশুয়া কিমিখের দল। প্রথম ম্যাচের পর অনেকেই ধারণা করেছিল ভয়ঙ্কর জার্মানির দেখা পেতে যাচ্ছে এবারের আসর। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে লড়াই করে জয় কিছুটা সেই ধারণাতে ভাটা পড়েছে। তবে এবার আশা দেখাচ্ছেন ফরোয়ার্ড ডেন্ডিজ উন্ডাভ, সেরা একাদশে না থাকলেও তিন গোল করে দুর্দান্ত তিনি। এই জার্মানি এবারের আসরে নকআউটে ভয়ঙ্কর হিসেবেই দেখা দেবে সেটাই আশা করছেন ফুটবল সমর্থকরা।

Scroll to Top