একজন বিমর্ষ রূপসী একদিন বলে, যদি কেউ তোমাকে কোনো দুঃখ দেয়, তবে সেই দুঃখের নাম দিয়ো ‘কন্যা’। বলে, প্রথম ঋতুস্রাবের দিন অনেক রাত অবধি ঘুম আসেনি রূপসীর। দরজা লাগিয়ে বিছানায় শুয়ে সে ভেবেছে। রুদ্ধদ্বার বিনিদ্র সেসব ভাবনার কথা কি পুরুষেরা জানে?
মানুষেরা কি শুনতে পায় গাছের মগডালে দুই বন্ধু আমের আলাপ? একটি আম অন্যদিকে বলে, মাটিতে তাকিয়ে দেখো, মানুষের কী বিশ্রী হিংসা, হানাহানি। দারুণ হতো যদি মানুষেরা না থাকত আর আমরা এই আমেরা মিলে পৃথিবী শাসন করতাম? চমৎকার ভাবনা, কিন্তু বন্ধু আম জানতে চায়, আমাদের মধ্যে কারা শাসন করত—কাঁচারা না পাকারা?
একটি নাইট কোচ ছুটে যায়। বাসের ছাদে বহন করা কাঁঠালের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
আমার শিশুকন্যা প্রায়ই এক অভিনব খেলায় মেতে ওঠে আমার সঙ্গে। ছুটে এসে বলে, ‘আমাকে ধরো তো দেখি বাবা।’ আমি তাকে ধরি। সে হাসিতে লুটিয়ে পড়ে বলে, ‘এ কী, তুমি তো আমার হাত ধরেছ, আমাকে ধরেছ কই?’ আমি এবার তার মাথায় হাত রাখি। সে বিপুল কৌতুকে বলে ওঠে, ‘এ তো আমার মাথা, আমি বলেছি আমাকে ধরতে।’ আমি এই অদ্ভুত বোধিতাত্ত্বিক ক্রীড়ায় পরাজিত হই। আমি আমার কন্যাকে ধরতে পারি না। ভুল করে ধরে বসি তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। তোকে কোনো দিন কি ধরতে পারব কন্যা আমার? একটা মদির ব্যর্থতা জেগে থাকে মনের মধ্যে।
আমার কন্যা এঘর–ওঘর করতে করতে সুর করে পড়ে—
চড়ই পাখি বারোটা
ডিম পেড়েছে তেরোটা
একটা ডিম নষ্ট
চড়ই পাখির কষ্ট।
এই ছড়ার অন্তর্গত পরাবাস্তব বেদনাটিকে লক্ষ্য করে বন্ধু রফিক খুবই উৎফুল্ল হয়েছিল। জীবনের জন্য এত অসহ্য ব্যথা ছিল ওর, এত অসহ্য আনন্দ। ও কবর দেখেও কাঁদত, বাসর দেখেও। অনেক অনুরোধ করে রফিকের মায়ের কাছ থেকে ওর ডায়েরিটা চেয়ে এনেছি। অদ্ভুত দিনলিপি। একেকটি দিনে একটি মাত্র সংবাদ, একটি মাত্র ভাবনা। একটি দিন যেন একটি অ্যাপেলের মতো সম্পূর্ণ নিটোল।
রবিবার
কী আশ্চর্য বৃষ্টি সারা দিন। কাগজের ফুলই শুধু বৃষ্টিকে ভয় পায়।
সোমবার
বহুদিন জোনাকি দেখি না। জোনাকি দেখা প্রয়োজন।
মঙ্গলবার
বাইরে বেরিয়ে আসার আগে সবকিছু শুরু হয় ভেতরে, নিচে, দৃষ্টির আড়ালে, যেমন বীজ আর বৃক্ষ।
বুধবার
জ্ঞানীরা এমন হয়, ছেলেমানুষ, উন্মাদ, পৈশাচিকও বটে।
বৃহস্পতিবার
ভোরে যখন সূর্য ওঠে কোনো কোনো দিন বিশ্বাস হতে চায় না যে কোথাও কখনো রাত ছিল। যেন আজ।
শুক্রবার
একটা নিভৃতি প্রয়োজন, যেখানে বসে অসম্ভব সব ভাবনাগুলো ভাবা যায়।
শনিবার
পৃথিবীর সমস্ত মোহই চারদিকে কেমন যেন মাছি পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
রফিকের শেষ চিঠিটিও আমি সংরক্ষণ করেছি। সে লিখেছিল—


