দুই সন্তান জানতো না বাবার সঙ্গে এই ঈদ ই তাদের শেষ ঈদ

দুই সন্তান জানতো না বাবার সঙ্গে এই ঈদ ই তাদের শেষ ঈদ

রাতে নিজ ঘরে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে গানবাজনা করে ভোর রাতে গলা ছেড়ে অনেকটা উচ্চস্বরে গান গাইছিলেন তিনি। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে গান গাইতে শুনে ছুটে যান মা আমিনা বেগম ছালেহা। ছেলেকে ঘুমানোর জন্য বারবার জোর দিচ্ছিলেন। কিন্তু ছেলে মাকে বুঝিয়ে বিছানায় রেখে দরজা বাইরের দিকে আটকে দেয়। মাও সেই সময়ে ঘুমের মধ্যে ডুবে যান। জানতেন না প্রিয় সন্তানের সঙ্গে এটাই তার শেষ দেখা। আর দুই সন্তান জানতো না বাবার সঙ্গে এই ঈদ-ই-তাদের শেষ ঈদ।

এ মর্মান্তিক গল্প সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও গীতিকার মতিউর রহমানের (পাগল হাসান)।

দুই সন্তান জানতো না বাবার সঙ্গে এই ঈদ ই তাদের শেষ ঈদ

গত ১৮ এপ্রিল সকাল পৌনে সাতটার দিকে সুনামগঞ্জের ছাতক-দোয়ারাবাজারের সুরমা ব্রিজের সামনে বাস-অটোরিকশা মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে মারা যান পাগল হাসানসহ ২ জন। এসময় আহত হয়েছিলেন আরও তিনজন। ওইদিন রাতে তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতকের শিমুলতলা মুক্তিরগাঁও গ্রামে দাফন সম্পন্ন হয়।

শুক্রবার (২১ এপ্রিল) সুনামগঞ্জের ছাতকের শিমুলতলা মুক্তিরগাঁও গিয়ে বার্তা২৪.কম’র স্টাফ করেসপন্ডেন্ট মশাহিদ আলী কথা বলেন পাগল হাসানের গর্ভধারিণী মা আমিনা বেগম ছালেহা এবং তার দুই ছেলে মাকসুদুর রহমান জিনান ও মুশফিকুর রহমান জিসানের সঙ্গে।

ছেলের সঙ্গে শেষ দেখা নিয়ে কথা বলেন মা আমিনা বেগম ছালেহা। তিনি বলেন, হাসান প্রতিদিন রাতেও কম ঘুমিয়ে গান গাইতো। গত বৃহস্পতিবার ভোরে তার গলার আওয়াজ শুনে আমার ঘুম ভেঙে যায়। পরে ঘরের বাইরে গিয়ে দেখি বারান্দায় দাঁড়িয়ে গান গাইছে। তখন রাত ৪টা থেকে সাড়ে ৪টা হবে। আমি তাকে ঘরে গিয়ে ঘুমানোর জন্য বলি। কিন্তু সে আমায় বলে ‘তুমি জানো না নি আমি ঘুরাইয়া আইয়া ঘুমাই।’ তখন আমি তাকে ঘুরতে যেতে নিষেধ করেছিলাম। আর ধাক্কা দিয়ে তার ঘরে নিয়ে যাই। পরে আমায় বলে ‘তুমি আমার শক্তির সঙ্গে পাইবায় নি? তোমার লগে আমার শক্তি করা লাগবো বলে আমায় কোলে নিয়ে বিছানায় রেখে যায়।


এসময় আমায় ঘরে রেখে কাপড়ের টুকরা দিয়ে দরজা আটকে যায়। যাতে আমি তাকে খুঁজতে না বের হই। সকালবেলা আমার মেয়ের ফোনে কল আসে হাসান আর নেই। পরে আমার মেয়ে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করে ভাই ঘরে আছে কি না। আমি বলেছিলাম ঘরে আছে, কিন্তু আমি জানতাম না ওই সময়েও আমার হাসান আর দুনিয়াতে নেই। এভাবে ছেলের সঙ্গে শেষ স্মৃতির কথা বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মা ছালেহা।

পাগল হাসানের দুই ছেলে। বড় ছেলে মাকসুদুর রহমান জিনান (১৫) সুনামগঞ্জ শহরের জামেয়া ইসলামিয়া মাদানিয়া মাদ্রাসায় ও ছোট ছেলে মুশফিকুর রহমান জিসান (১৪) সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবার সঙ্গে কাটানো অনেক স্মৃতি থাকলেও বেশি নাড়া দিচ্ছে দুইটি কথা, প্রথমটা হলো- পড়ালেখা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং দ্বিতীয়টা হলো গরীব লোককে কোনো সময় গরীব না বলা।


মাকসুদুর রহমান জিনান বলেন, ‘আমার আব্বু খুব ভালো মানুষ। তার মতো দুনিয়া আর কেউ হয় না। তিনি সব সময় আমাদের বলতেন, আমরা যেন পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হই। দুইভাই বড় হয়ে তার মুখ যেন উজ্জ্বল করতে পারি। আব্বুর ইচ্ছে ছিল আমি হাফেজ হই। তার স্বপ্ন পূরণের লক্ষে পড়াশোনা করছি। এখন শুধু দাওরা দেওয়ার বাকি রয়েছে। তারপর আমি পুরোপুরি হাফেজ হয়ে যাবো।’

জিনান বলেন, আব্বুর সঙ্গে কাটানো প্রতিটা সময় খুব বেশি মিস করছি। আব্বু ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় আমি জেগে ছিলাম। আমাকে চুমো দিয়ে যান। তখন ফজরের আজান হয়নি। ওইদিন রাতে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে ঘরে বসে গান করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আব্বু বলতেন- আমি যা রেখে যাচ্ছি তা তোমরা ও তোদের দাদি খেয়ে শেষ করতে পারবে না। তোমরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হও তখন নিজেদের পছন্দ মতো ঘর তৈরি করবে। এখন আমি যদি ঘর তৈরি করি, পরে তোমাদের তা পছন্দ না হলে ভেঙে ফেলবে।’

মুশফিকুর রহমান জিসান বলেন,‘ অন্যান্যদের নানা বাড়িতে ঈদ কাটালেও আব্বুর সঙ্গে এবারের ঈদ করতে বলেন। তাই ঈদের আগেই নানা বাড়ি থেকে নিজেই গিয়ে নিয়ে আসেন আমাদের। আব্বুর সঙ্গে এটাই ছিল শেষ ঈদ। আব্বু আমাদের জন্য ঘর তৈরি করেননি। গান গেয়ে যে সম্মানিটুকু পাইতেন সেগুলো দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। সম্প্রতি যে শিলাবৃষ্টি হয়েছে। তখন আমাদের এলাকায় অনেকের ঘরের টিন শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যায়। তখন আব্বু নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সবাইকে টিন কিনে দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। আব্বু কখনো নিজের খেয়াল রাখতেন না। তিনি সব-সময় মানুষের উপকার করতেন।’

জিসান বলেন, ‘আব্বুর স্মৃতি ধরে রাখতে আমি গান গেয়ে সুনাম কুড়াবো। ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে গানের তালিম নিচ্ছি এবং মাঝে মাঝে আব্বুর কাছ থেকেও গান শিখতাম এবং গাইতাম।

সরেজমিনে সুনামগঞ্জের ছাতকের শিমুলতলা মুক্তিরগাঁও গ্রামে পাগল হাসানের বাড়িতে ভক্ত ও এলাকার মানুষ বাড়ির উঠানে বসে আছেন। কেউ কেউ তার কবর জিয়ারত করছেন আর কেউবা দুই ছেলের মাথায় হাত ভুলিয়ে দিচ্ছেন। বাড়িতে দুই চালা দুই কক্ষের টিনের বেড়া ও টিনের চালার ঘরের একটি কক্ষ ছিল তার। বিছানার পাশে তার গানের নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র রাখা হয়েছে। সেখানে বসে অনেকেই স্মৃতি মনে করছেন। বাড়ির উঠানের গোয়ালঘরের মধ্যে রাখা হয়েছে তার শখের মোটরসাইকেলটি। হাসানের মৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

Scroll to Top