পুরনো বা ব্যবহৃত বইয়ের দুনিয়ায় সম্প্রতি রহস্যময় কিছু ঘটনা ঘটছে। গত কয়েক মাস ধরে বই বিক্রেতারা ক্রেতাদের মধ্যে একটি অদ্ভুত আচরণ লক্ষ্য করছেন। হঠাৎ করেই তাদের দোকান থেকে বিপুল পরিমাণ উপন্যাস ও অন্যান্য বই কিনে দূর-দূরান্তের বিভিন্ন গুদামে পাঠানো হচ্ছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
‘বার্টার বুকস’-এর মালিক স্টুয়ার্ট ম্যানলি সপ্তাহে দুই থেকে তিন হাজার বই বিক্রি করেন। কিন্তু সম্প্রতি একটি কানাডিয়ান কোম্পানি এককভাবে তার কাছ থেকে যে পরিমাণ বইয়ের অর্ডার করেছে, তা তার পুরো এক সপ্তাহের বই বিক্রির সমান। ব্যবহৃত বইয়ের ব্যবসায় দীর্ঘ ৩০ বছর পার করার পর ম্যানলি বলেন, ‘আমি আমার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতায় এমন কাণ্ড কখনো দেখিনি।’
ম্যানলি একা নন, বিশ্বজুড়ে অনেক বই বিক্রেতাই এমন অস্বাভাবিক রকমের বড় বড় অর্ডারের কথা জানিয়েছেন। তবে এসব বইয়ের শেষ গন্তব্য কোথায়, তা নিয়ে নিশ্চিত নন তারা। অনেকেরই সন্দেহ, এই বইগুলো কোনো বইপ্রেমী বিদেশি পাঠক কিনছেন না, বরং নতুন তথ্যের জন্য ক্ষুধার্ত অন্য কোনো সত্তা এগুলো গিলে খাচ্ছে—আর সেটি হলো ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা এআই।
বই নিয়ে আদালতের লড়াই
পুরনো বইয়ের এই আকস্মিক চাহিদার পেছনে এআই-এর হাত থাকার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতের রায়ের সঙ্গে জড়িত। ২০২৫ সালে মার্কিন আদালতের এক রায়ে বলা হয়, এআই সফটওয়্যারকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য এভাবে কেনা বই ব্যবহার করা মার্কিন কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন নয়।
তিনজন লেখকের দায়ের করা একটি মামলার প্রেক্ষিতে এআই প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর পক্ষে এই রায় দেন বিচারক উইলিয়াম আলসাপ। তিনি তার রায়ে উল্লেখ করেন, অ্যানথ্রোপিক যেভাবে লেখকদের বই ব্যবহার করছে তা ‘অত্যন্ত রূপান্তরমূলক’, যা মার্কিন আইনের অধীনে অনুমোদিত।
তবে গত মাসে আদালতের নথিপত্র জনসমক্ষে আসার পর আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য উন্মোচিত হয়। জানা যায়, অ্যানথ্রোপিকের এআই চ্যাটবট ‘ক্লড’-কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বইগুলো ধ্বংস বা নষ্ট করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে অ্যানথ্রোপিকের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘ক্লড-কে প্রশিক্ষণ দিতে আমরা সাধারণ ওয়েবসাইট ডেটা, বাণিজ্যিকভাবে কেনা ডেটাসেট এবং আমাদের নিজস্ব ডেটার মিশ্রণ ব্যবহার করি।’ তারা আরও দাবি করেন, বিরল বা প্রাচীন কোনো বই কিনে তারা ধ্বংস করছেন না।
তা সত্ত্বেও বই ধ্বংস বা মণ্ড বানিয়ে ফেলার এই প্রক্রিয়াটি বইপ্রেমী ও বিক্রেতাদের মনে তীব্র অস্বস্তি তৈরি করেছে।
উত্তর লন্ডনের ‘ওয়াল্ডেন বুকস’-এর মালিক ডেভিড টোবিন বলেন, ‘বহু বছর ধরে অবিক্রিত থাকা বইগুলো বিক্রি হওয়া অবশ্যই আনন্দের, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলো যদি ধ্বংসই করে ফেলা হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।’
ডেস্ট্রাক্টিভ স্ক্যানিং
আদালতের নথি থেকে জানা যায়, পুরোনো বই সংগ্রহ ও ডিজিটাল করার এই প্রকল্পের কোড নাম দেওয়া হয়েছিল ‘প্রজেক্ট পানামা’। কোম্পানির অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল, ‘বিশ্বের সব বই ধ্বংসাত্মক উপায়ে স্ক্যান করা।’
‘ডেস্ট্রাক্টিভ স্ক্যানিং’ এমন একটি প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া, যেখানে বইয়ের ভেতরের পাতাগুলো দ্রুত স্ক্যান করার জন্য বইয়ের বাঁধাই বা স্পাইন কেটে আলাদা করে ফেলা হয়। স্ক্যান করা শেষ হলে অবশিষ্ট অংশগুলো রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহারের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
‘বার্টার বুকস’-এর ম্যানলি বলেন, ‘প্রজেক্ট পানামা নামটি আমার কাছে নতুন হলেও এর বাস্তবতা নতুন নয়। এটি বই বিক্রেতাদের বিভিন্ন ফোরামে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছে।’ তবে তাঁর বইগুলো এই নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্যই কেনা হচ্ছে কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন। কারণ, কেনা বইগুলোর তালিকায় অদ্ভুত বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে—কোথাও লাতিন ভাষার প্রাচীন জটিল বই, আবার কোথাও সাধারণ কাউবয় ঘরানার উপন্যাস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈচিত্র্যময় বিষয়বস্তুই ইঙ্গিত করে যে এগুলো এআই-এর জন্য কেনা হচ্ছে। কারণ, জেনারেটিভ এআই চ্যাটবট বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোকে উন্নত করতে এমন অপ্রচলিত ও বিরল লেখার ডেটা অত্যন্ত সহায়ক।
তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রফেসর এমিলি হাডসন জানান, যুক্তরাজ্যের কপিরাইট আইন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভিন্ন। যুক্তরাজ্যে এ ধরনের ব্যবহারের জন্য কপিরাইট মালিকের স্পষ্ট অনুমতি প্রয়োজন।
নৈতিক উদ্বেগ
এই বিপুল বিক্রি বই বিক্রেতাদের জন্য এক বড় নৈতিক সংকট তৈরি করেছে। বই ধ্বংস করার বিষয়টি তাদের ব্যথিত করলেও, তারা মানছেন যে সব বই সংরক্ষণ করার প্রয়োজনও হয়তো নেই।
এডিনবরার ‘ম্যাকনটনস’ বইয়ের দোকানের মালিক ডেরেক ওয়াকার বলেন, ‘ধরা যাক একটি শিক্ষাবিষয়ক বইয়ের মাত্র ১০০টি কপি ছাপা হয়েছে, যার ৭৫টিই বিভিন্ন লাইব্রেরিতে আছে। বাজার থেকে এর একটি কপি কিনে ধ্বংস করলে হয়তো খুব বেশি ক্ষতি নেই। কিন্তু আমরা এমন বইও বিক্রি করেছি যা অষ্টাদশ শতাব্দীর একমাত্র টিকে থাকা সংস্করণ। তেমন কোনো বই যদি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে কেনা হয়, তবে তা সত্যিই চিন্তার বিষয়।’
আর ম্যানলি বলেন, যেসব বই সাধারণ মানুষ আর শেলফে রাখতে চায় না, সেগুলো রিসাইকেল করা একদিক থেকে ভালো। বিশেষ করে যখন এর ফলে ব্যবসায় বাড়তি আয় হয়।
তিনি বলেন, “বইগুলো শেষ পর্যন্ত কোথায় যায় এবং নষ্ট হয়ে গেলে কী হয়, তা নিয়ে কারও কারও নৈতিক উদ্বেগ থাকতে পারে। কিন্তু বিশ্বের আর ‘দ্য ডা ভিঞ্চি কোড’-এর পঞ্চাশ লক্ষ কপির প্রয়োজন নেই। আমি ২০ বছর ধরে ওয়েবে বইয়ের বিজ্ঞাপন দিয়ে আসছি, কিন্তু সেগুলো এখন পর্যন্ত বিক্রি হয়নি।”


