১৮৭১ সালের ব্রিটিশ গায়ানার এক দরিদ্র পরিবারে যখন একটি শিশু জন্মাল, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞান বা চারপাশের মানুষ এই সত্য মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না যে এই জীবনটি কোনো সাধারণ জীবনের চেয়ে একচিলতুও কম নয়। শিশুটির কোনো হাত ছিল না, ছিল না কোনো পা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই চরম বিরল শারীরিক অবস্থাকে বলা হয় টেট্রা-অ্যামেলিয়া সিন্ড্রোম। জন্মের পরপরই অনেকের কাছেই এটি মনে হতে পারত এক নিষ্ঠুর পরিহাস কিংবা আজীবন অন্যের দয়ায় বেঁচে থাকার এক অন্তহীন অভিশাপ। কিন্তু প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর রসিকতাকে থোড়াই কেয়ার করে সেই শিশুটি একদিন এমন এক ইতিহাস গড়লেন, যা যুগের পর যুগ মানবাত্মার অদম্য শক্তির সবচেয়ে উজ্জ্বল দলিল হয়ে রইল। বিশ্ব তাকে একসময়ে চিনত ‘দ্য হিউম্যান ক্যাটারপিলার’ বা মানব শুঁয়োপোকা নামে, আবার কেউ কেউ ডাকত ‘দ্য লিভিং টর্সো’ বলে। অথচ এই নামগুলোর আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক রক্তমাংসের মানুষ, যার প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বারবার হার মেনেছিল।
শৈশব এবং কৈশোরের কঠিন দিনগুলো পার করে প্রিন্স রেন্ডিয়ান খুব দ্রুতই অনুধাবন করেছিলেন যে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে করুণা কোনো সমাধান নয়। নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি এমন এক অসম্ভব সাধনা শুরু করলেন, যা দেখলে যেকোনো সুস্থ মানুষের চোখ কপালে উঠবে। যেহেতু তার কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিল না, তাই তিনি নিজের কাঁধ, মুখ, চোয়াল এবং শরীরের ঊর্ধ্বাংশের পেশিগুলোকে জাদুকরি দক্ষতায় ব্যবহার করতে শিখেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবিষ্কার করলেন কীভাবে মাটিতে সামান্য গড়াগড়ি দিয়ে বা শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয়। শুধু তাই নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজগুলো যেমন নিজের মুখের থুতনি ও কাঁধের সাহায্য নিয়ে নিখুঁতভাবে শেভ করা, দেশলাই জ্বালানো, কিংবা সিগারেটে আগুন ধরানো তার কাছে নিখুঁত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তিনি কলম দিয়ে লিখতে পারতেন এবং ঠোঁটের কোণে ব্রাশ বা কলম খুব সাবধানে চেপে ধরে চমৎকার সব রেখা টেনে ছবিও আঁকতেন। কিছু জটিল কাজের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষভাবে তৈরি একধরনের কাঠের সাপোর্ট বা বাক্স ব্যবহার করতেন, যা তার শরীরের সঙ্গে মানানসই করে বানানো হয়েছিল। সেই কাঠের বাক্সের ওপর ভর দিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় জিনিস আঁকড়ে ধরতেন বা নিজের কাজের পথ সুগম করতেন।
সমসাময়িক মানুষেরা প্রায়ই অবাক হতেন এই ভেবে যে, যার দৈহিক চলাচলের জন্য অন্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করার কথা, তিনি কীভাবে এত সুশৃঙ্খল এবং স্বাবলম্বী একটি সংসার পরিচালনা করছেন …
উনিশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে যখন সার্কাস ও সাইডশো বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল, তখন প্রিন্স রেন্ডিয়ানের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ১৮৮৯ সালে বিখ্যাত শোম্যান পি টি বার্নাম তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসেন। এরপর দীর্ঘ প্রায় পঁচিশ বছর ধরে তিনি বার্নাম অ্যান্ড বেইলির সার্কাসের অন্যতম প্রধান এবং মোস্ট ওয়ান্টেড পারফর্মার হিসেবে বিশ্বজুড়ে মঞ্চ কাঁকিয়েছেন। তবে তার মঞ্চের পরিবেশনা কোনো সস্তা কৌতূহল মেটানোর মাধ্যম ছিল না; বরং তা ছিল মানুষের শারীরিক ক্ষমতার চরম উৎকর্ষের এক জীবন্ত প্রদর্শনী। দর্শকরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখতেন, কীভাবে হাত-পা না থাকা একজন মানুষ পরম শান্তিতে নিজের পকেট থেকে সিগারেট বের করে, ঠোঁটের ফাঁকে তা গুঁজিয়ে, দেশলাই বাক্সের কাঠি ঘষে আগুন জ্বেলে ধোঁয়া ওড়াতেন। তার এই পারফরম্যান্সের সময় পুরো সার্কাস তাঁবুতে পিনপতন নীরবতা নেমে আসত। দর্শকের চোখে তখন কৌতূহলের চেয়েও বেশি থাকত এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ ও বিস্ময়।
মঞ্চের আলো ঝলমলে দুনিয়ার বাইরে প্রিন্স রেন্ডিয়ানের ব্যক্তিগত জীবন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা, শান্ত এবং পারিবারিক মায়ায় ঘেরা। তিনি কখনোই নিজেকে কেবল একজন প্রদর্শনী পসরা হিসেবে দেখতে চাননি। কর্মজীবনের একপর্যায়ে সারাহ নামের এক সাধারণ নারীকে তিনি ভালোবেসে বিয়ে করেন। তাদের সেই সুখের সংসারে জন্ম নেয় পাঁচ সন্তান—চার কন্যাসন্তান ও এক পুত্রসন্তান। মঞ্চের নাটকীয়তা আর প্রচারের আলো থেকে দূরে তিনি ছিলেন একজন দায়িত্বশীল স্বামী এবং স্নেহময় পিতা। পরিবারের ভরণপোষণ থেকে শুরু করে তাদের আগলে রাখা সবকিছুই তিনি নিজের মতো করে নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি কেবল ইংরেজি নয়, একাধিক ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন এবং তার আশেপাশের মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত মার্জিত ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতেন। সমসাময়িক মানুষেরা প্রায়ই অবাক হতেন এই ভেবে যে, যার দৈহিক চলাচলের জন্য অন্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করার কথা, তিনি কীভাবে এত সুশৃঙ্খল এবং স্বাবলম্বী একটি সংসার পরিচালনা করছেন।
১৯৩২ সালে টড ব্রাউনিং পরিচালিত কালজয়ী ও বিতর্কিত হরর-ড্রামা চলচ্চিত্র ‘ফ্রিকস’ (Freaks)-এ অভিনয় করে প্রিন্স রেন্ডিয়ান বিশ্বচলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন। সেই সিনেমায় তাকে কোনো অভিনয় করতে হয়নি, তিনি নিজের আসল সত্তা নিয়েই ক্যামেরার সামনে হাজির হয়েছিলেন। চলচ্চিত্রে তার সিগারেট রোল করার সেই ঐতিহাসিক দৃশ্যটি আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে শিহরণ জাগায়। সিনেমাটি মুক্তির পর সমাজের একটি বড় অংশ প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বাধ্য হয়। ১৯৩৪ সালের ১ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে ৬৩ বছর বয়সে যখন প্রিন্স রেন্ডিয়ানের জীবনাবসান ঘটে, তখন তিনি পেছনে রেখে যান এক অনন্য লড়াইয়ের গল্প। সমাজ তাকে হয়তো শারীরিক বৈচিত্র্যের কারণে ভিন্ন চোখে দেখতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি নিজের কর্ম, প্রতিভা এবং আত্মমর্যাদার জোরে সেই সমাজকেই নিজের শক্তির মঞ্চ বানিয়েছিলেন। প্রিন্স রেন্ডিয়ান আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে মানুষের আসল সীমাবদ্ধতা শরীরের অক্ষমতায় নয়, বরং তার মনের অনীহায়।

