সেদিন চ্যানেল আইয়ের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থাপিকা দীপ্তি চৌধুরী বলছিলেন, মানুষ কখনো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়, কখনো নেয় না। কিন্তু মানুষ জানে না কখন সে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। আসলে সেটা জানা কঠিন। কারণ ইতিহাসে স্থান নিতে সময় লাগে। মানুষই তো ইতিহাস। মানুষই তো মানুষকে শেখায় কোন কাজটি করা উচিত কিংবা অনুচিত। এই যে আমাদের দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জন্য ছোট একটি কাজ করলেও সেটি অনেক বড় কাজ করা হবে। অনেক কাজ করার পর সেই কাজের কোনো গুরুত্বই থাকে না। অনেক কাজ করার পর সমালোচনাও হতে পারে। কিংবা কোনো কাজ করার পর প্রশংসায় ভেসে যায়। প্রশংসা পাবার আশায় কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকলে নিজের সঙ্গেই প্রতারণা করা হবে। প্রতারণা করা হবে শিক্ষার সঙ্গে।
উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সময় আমার বাবা একটি পিঠার দোকান করেছিলেন। তখন বাবার যে বয়স সেই বয়সে রাজপথে নামা কিংবা আন্দোলনে অংশ নেয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু তিনি পিঠার দোকান করে সেই দোকানের নামের পে অফ লাইন দিয়েছিলেন ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’। তার মানে পিঠা বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। সেই খাবারটাকে তিনি শহরে নিয়ে এসেছিলেন। পিঠাঘরের ভেতর যে বৈদ্যুতিক বাতি ছিল সেগুলো লাগানো হয়েছিল হারিকেনের ভেতরে। দেখতে অভিনব লাগতো। তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন বাংলার ঐতিহ্যকে।
আমার মনে পড়ছে কক্সবাজারে যখন সায়মন হোটেলটি তৈরি হয় তখন এটিই ছিল আধুনিক সুন্দর হোটেল। সেই হোটেলের রেস্টুরেন্টে যে লাইটগুলোর শেড ব্যবহার করা হয়েছিল গ্রামে মাছ ধরার জন্য যে ‘পোলো’ ব্যবহার করা হয় সেগুলো দিয়ে। আবার হোটেলের রুমগুলোর নাম্বার লেখা থাকতো ছোট ছোট ঝিনুক দিয়ে। তারা এটা যখন করেছিল তখন হয়তো হাতেগোনা পর্যটক গেছে কিংবা আমরাও কম গেছি। তবুও তারা চেষ্টা করেছিলেন কক্সবাজারের ঐতিহ্যকে মানুষের কাছে পরিচিত করার জন্য।
আমাদের এক ছোট ভাই আছেন তার নাম কাজী জসিমুল ইসলাম, আমরা তাকে বাপ্পি নামেই ডাকি। তিনি নানারকম ভাবনা নিয়ে কাজ করেন। অনেক সময় সফল হন আবার কোনোটায় সফলতা আসে না। তবুও তিনি কাজ করে যান আপন তাগিদে। এখন সবাই যে ই-বুক সিস্টেমে বই পড়ে তিনি এই সিস্টেমটা এনেছিলেন বেশ অনেক আগে। যখন দেশের মানুষ এতটা ল্যাপটপ বা কম্পিউটার ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন না। চায়না থেকে সরঞ্জামাদি এনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই নিয়ে চেষ্টা করেছিলেন মার্কেটিংয়ের জন্য কিন্তু তখন তিনি এটাতে সফল হননি। এখন ঢাকা শহর ভরা ইলেকট্রিক গাড়িতে। এই গাড়ির ট্যাক্স কমেছে। সরকারও উৎসাহ দিচ্ছে ইলেকট্রিক গাড়ি ব্যবহারের জন্য। ক্রেতাদের উৎসাহ দেয়ার জন্য নানারকম উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অথচ বাপ্পি বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই চেষ্টা করছেন এই ইলেকট্রিক গাড়ি ঢাকা শহরে চালানোর জন্য। তিনি যে ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরি করেছিলেন তার নাম দিয়েছিলেন ‘বাঘ’। এটি পুরোটাই বাংলাদেশে তৈরি। কিন্তু সেই একই অবস্থা! বেশিদূর এগোতে পারেননি। আমি জানি না প্রথম ইলেকট্রিক গাড়ির জন্য কিংবা বাঘের নামে গাড়ি তৈরির জন্য বাপ্পির নাম ইতিহাসে থাকবে কিনা! তবে আজ ইলেকট্রিক গাড়ি ঢাকা শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এটা দেখে বাপ্পি হয়তো ভাবছেন তিনি যে গাড়ি তৈরি করেছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় চলছে এই গাড়িগুলো। আমি নিজেও এরকম একটি গাড়ি ব্যবহার করছি।
আমরা মানিকগঞ্জের সেই জুলহাসের কথা বলতে পারি তিনি উড়োজাহাজ তৈরি করে আলোচনায় এসেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তার কি হলো-এখন আর আমরা তার নাম শুনতে পাই না। তেমনি খুলনার কলেজ ছাত্র নাজমুলের কথাও বলা যায়। সে মাত্র দুই লাখ টাকায় হেলিকপ্টার তৈরি করেছিল। বগুড়ার আমির হোসেন বুলেটপ্রুফ হেলিকপ্টার তৈরি করে আলোড়ন সৃষ্টি করে। স্কুলের বিজ্ঞান মেলায় অনেক তরুণ-তরুণী নতুন নতুন উদ্ভাবনী আমাদের সামনে হাজির করে, আমরা মুগ্ধ হই। এইসব মেধাবীকে যদি সঠিকভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কাজে লাগানো যেতো তাহলে হয়তো আমরা নতুন কিছু পেতে পারতাম। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেদিন এক বক্তৃতায় বলেছেন-‘বাংলাদেশ হবে নতুন উদ্ভাবনের দেশ। তরুণ উদ্ভাবকেরা যা উদ্ভাবন করবে সেটি বিশ্বকে দেখাবে যা বাংলাদেশের জন্য হবে গর্বের।’
এই তো তিনি কয়েকদিন আগে তিনজন প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েকে চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন। এদের মধ্যে গাইবান্ধা জেলার আয়েশা। চ্যানেল আইয়ের একটি অনুষ্ঠানে আমরা তাকে দেখিয়েছিলাম। মেয়েটির হাত নেই কিন্তু পা দিয়ে লিখে সে বিএ ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে। তাকে আমরা উৎসাহ দিয়েছিলাম লেখাপড়ার জন্য। নাহলে তার মা তাকে সার্কাস দলে দিয়ে দিতো। কারণ সার্কাসে দিলে মেয়েটির মা কিছু অর্থ পাবে আর মেয়েটিও কসরত দেখিয়ে হাততালি পাবে। চ্যানেল আই সেখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটির পাশে খুঁটি হয়ে তাকে লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। চ্যানেল আই শুধু আর্থিক সাহায্যই করেনি নানাভাবে তার পরিবারের পাশে ছিল। বিদেশ থেকেও একজন তার পরিবারের পাশে ছিলেন। আজকে মেয়েটি গ্রাজুয়েশন শেষ করেছে। একটি চাকরিও জুটেছে প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণে।
গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ ছাদকৃষির মাধ্যমে সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। অনেক তরুণ এখন কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। নতুন নতুন জাত আবিষ্কার হচ্ছে। কতো বিচিত্র ধরনের কৃষি আমাদের জাতীয় জীবনে যোগ হয়েছে তার ইতিহাস অনেকের জানা। কৃষিক্ষেত্রে অবদানের জন্য শাইখ সিরাজ স্বাধীনতা পুরস্কারও পেয়েছেন।
প্রকৃতিবিদ মুকিত মজুমদার বাবু অনেক কাজ করছেন। এই তো সম্প্রতি তিনি ‘বাঘ দিবস’ উপলক্ষে বাঘ রক্ষার জন্য হাতিরঝিলে বিশাল একটি ম্যারাথন র্যালি করলেন। বাংলাদেশে এই প্রথম চ্যানেল আই এবং আইস্ক্রিন সেটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে। তখন অনেকেই তাকে বলেছিলেন সুন্দরবনের ব্যাপার ঢাকায় কেন করা হলো! ঢাকায় র্যালি করলে প্রচার বেশি হয় এবং বেশি মানুষের কাছে তথ্যটি পৌঁছানো যায়। বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘ রয়েছে মাত্র একশত পঁচিশটি। এইসব প্রচার- প্রচারণার কারণে মানুষ সচেতন হলে বাঘের সংখ্যা যদি বাড়ে তাহলে তা হবে এই র্যালিরই সাফল্য।
আমার মনে আছে রমনা থেকে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান চ্যানেল আইতে লাইভ দেয়ার জন্য গিয়েছিলাম। তখন তো আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না। আমাদের প্রকৌশলী মোসাদ্দেক হাসান এবং হাসান কামরুল রাকিব তাদের মেধা কাজে লাগিয়ে পাশের বাড়ি থেকে কানেকশন নিয়ে কোএক্স ক্যাবলের মাধ্যমে চ্যানেল আইতে অনুষ্ঠানটি প্রচার করেছিল-সেটাও একটা ইতিহাস।
অসংখ্য মানুষ যে ইতিহাস তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছে তাদেরকে যদি আমরা একটু উৎসাহ দিতে পারি, একটু সাহায্য করতে পারি, তাদের পাশে যদি দাঁড়াতে পারি তাহলে তারা তৈরি করতে পারবেন এমন ইতিহাস- যে ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ গর্ব করবে। অহংকার করবে। কারণ সবার আগে আমাদের বাংলাদেশ।



