
ঢাকা, ১৯ মে – জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হওয়ার পর এবার ঝুলে থাকা আইনি প্রক্রিয়া ও অধ্যাদেশগুলো সুরাহার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে যেসব জরুরি অধ্যাদেশ পাস করানো সম্ভব হয়নি, সেগুলো নতুন করে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সংসদের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনি শূন্যতা দূর করতেই সরকারের এই তৎপরতা।
সংসদীয় গণতন্ত্রে অধিবেশন চলাকালীন অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার বাধ্যবাধকতা থাকে। কোনো কারণে তা না হলে অধ্যাদেশগুলোর আইনি বৈধতা ধরে রাখতে বিশেষ পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর চিফ হুইপ জানান, বিগত অধিবেশনে যেসব অধ্যাদেশ পাস হয়নি, সেগুলো প্রতিটি ধরে ধরে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার সংক্রান্ত অধ্যাদেশ গত অধিবেশনে পাসের অপেক্ষায় ছিল। সরকার এখন খতিয়ে দেখছে কোন অধ্যাদেশগুলো হুবহু পরবর্তী অধিবেশনে বিল আকারে আনা হবে, আর কোন সেকশনগুলোতে সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, কেবল অধ্যাদেশ নয়, আগামী বাজেট অধিবেশন এবং সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের যোগদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সাধারণত মে এবং জুন মাস জুড়েই চলে বাজেট পাসের তোড়জোড়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আসন্ন বাজেট অধিবেশনকে সামনে রেখে সংসদকে পুরোপুরি প্রস্তুত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। এর মধ্যেই সংরক্ষিত নারী আসনগুলোর মাধ্যমে সংসদে নারী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি সম্পন্ন করার তাগিদ রয়েছে সরকারের ভেতর।
পাশাপাশি সংসদের ভেতরের কারিগরি ত্রুটি দূর করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। চিফ হুইপ জানান, আগামী রোববার সংসদের সাউন্ড সিস্টেমের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর সামনে একটি বিশেষ কারিগরি প্রেজেন্টেশন বা উপস্থাপনা দেওয়া হবে, যাতে আসন্ন বাজেট অধিবেশনে স্পিকার ও সংসদ সদস্যদের বক্তব্য প্রচারে কোনো বিঘ্ন না ঘটে।
এবারের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বার্তাটি এসেছে চিফ হুইপের বক্তব্যে। দেশের চলমান বড় সংকটগুলো মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধীদলের একযোগে কাজ করার সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “জাতীয় সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধীদল একসঙ্গে কাজ করছে।” উদাহরণের টেনে তিনি বলেন, যেভাবে দেশের জ্বালানি বা তেলের সমস্যা সমাধানে দুই পক্ষ এক টেবিলে এসেছে, ঠিক একইভাবে চলমান বিদ্যুৎ সংকটও সরকার ও বিরোধীদল মিলে দ্রুত সমাধান করতে পারবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট গত কয়েক বছর ধরেই দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। চিফ হুইপের এই বক্তব্য যদি সত্যি মাঠপর্যায়ে প্রতিফলিত হয়, তবে তা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অভাবনীয় ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান নূরুল ইসলাম মনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চিফ হুইপের কথায় যে ইতিবাচক রাজনৈতিক সমঝোতার আভাস মিলেছে, তার আসল পরীক্ষা হবে আসন্ন বাজেট অধিবেশনে। বিরোধীদল সংসদের ভেতরে কতটা গঠনমূলক ভূমিকা রাখে এবং সরকার পক্ষ পাস না হওয়া অধ্যাদেশগুলো নিয়ে বিরোধী মতকে কতটা জায়গা দেয়—সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে বাজেট অধিবেশনের আগে সরকারের এই অভ্যন্তরীণ গোছগাছ ও পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রযন্ত্রকে গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে একটি সঠিক পদক্ষেপ।
এনএন/ ১৯ মে ২০২৬






