শাহজালালের মাজার: স্বচ্ছতার বিতর্ক যখন সামাজিক নিগ্রহে রূপান্তর | চ্যানেল আই অনলাইন

শাহজালালের মাজার: স্বচ্ছতার বিতর্ক যখন সামাজিক নিগ্রহে রূপান্তর | চ্যানেল আই অনলাইন

সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার। ইতিহাস, বিশ্বাস আর আবেগের এক চিরন্তন মেলবন্ধনে শত শত বছর ধরে এটা শুধু সিলেটের নয়, গোটা উপমহাদেশের মানুষের এক শ্রদ্ধার জায়গা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মাজারের দানবাক্স-কাণ্ড এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হয়েছে, তা কোনো সাধারণ স্বচ্ছতার দাবি নয়; বরং এটা ক্রমশ এক নজিরবিহীন সামাজিক সংকট, জেদ আর চরিত্রহননের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে, স্বচ্ছতার নামে এই দানবাক্স-কাণ্ড আসলে মাজার-সংশ্লিষ্ট মানুষদের সামাজিকভাবে বিবস্ত্র ও অপমান করার এক প্রচেষ্টায় রূপ নিয়েছে। এখন মাজারের সাথে বংশপরম্পরায় জড়িত থাকা মানুষগুলোই যেন মূল টার্গেট।

শাহজালালের মাজার: স্বচ্ছতার বিতর্ক যখন সামাজিক নিগ্রহে রূপান্তর | চ্যানেল আই অনলাইন
ছবি: সংগৃহীত।

ঘটনার শুরুটা হয়েছিল একটি বহুল আলোচিত দাবি দিয়ে— ‘স্বচ্ছতা’। এরপর মাজারের দান ও মানতের টাকা দিয়ে সিলেটের সার্বিক উন্নয়ন করতে হবে— এই পপুলিস্ট দাবি তোলা হয়। কিন্তু বাস্তবতা এবং ধর্মীয় ও আইনি কাঠামোর সামনে এসে সেই দাবির অসারতা স্পষ্ট হতে সময় লাগেনি। একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় উদ্দেশ্যে বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের জায়গা থেকে করা মানত কিংবা দানের অর্থ অন্য কোনো খাতে বা রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা যে ধর্মীয় বিধান এবং আইনিভাবে সিদ্ধ নয়, তা সম্ভবত এই আন্দোলনের কুশীলবদের একাংশ এখন উপলব্ধি করতে পেরেছে। ফলে, দান ও মানতের টাকা দিয়ে রাস্তাঘাট বা বৈষয়িক উন্নয়নের সেই চটকদার আলোচনা আগের মতো আর নেই।

ছবি: সংগৃহীত।

একধরনের আলোচনার গতি কমলেও, অন্য উদ্দেশ্য কিন্তু এখনও চলমান। এখন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, এই পুরো দানবাক্স-কাণ্ডের মূল লক্ষ্য আসলে অর্থের সদ্ব্যবহার নয়; বরং শত শত বছর ধরে যে সব পরিবার নিষ্ঠা, ত্যাগ এবং পরম্পরার মধ্য দিয়ে এই মাজারের সেবা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছেন, তাদের হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া। সামগ্রিক পরিস্থিতি এখন এমন একটি প্রতিহিংসামূলক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যার মূল কথা হলো— ‘তোমরা অনেক খেয়েছ, আর খেতে দেওয়া হবে না। এই টাকা সরকারি আমলারা খাক কিংবা অন্য কোনো পক্ষ এসে ভোগ করুক, তাতে আপত্তি নেই; কিন্তু বংশানুক্রমিক ভাবে মাজারের সাথে জড়িয়ে থাকা এই মানুষদের আর রাখা যাবে না।’

যে-কোনো অন্যায্য উদ্দেশ্যকে সমাজে গ্রহণযোগ্য করতে হলে প্রথমে একটা ‘ভিত্তি’ তৈরি করতে হয়। আর সেই ভিত্তি তৈরির সবচেয়ে সহজ উপায় হলো চরিত্রহনন। মাজার-সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে এখন গণহারে চোর, লুটেরা, দুর্নীতিবাজ ও দখলদার হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে খাদেম পরিবারগুলো এই মাজার রক্ষণাবেক্ষণসহ মাজারের আধ্যাত্মিক ভাবগাম্ভীর্য, শৃঙ্খলা বজায় রেখেছেন এবং দেশ-বিদেশ থেকে আসা লাখো ভক্ত-অনুরাগীকে সেবা দিয়েছেন, তাদেরকে আজ চোর সাব্যস্ত করার এক পরিকল্পিত মহড়া চলছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং নানা মাধ্যমে তাদেরকে সামাজিকভাবে যেভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও অপদস্থ করা হচ্ছে, তা সিলেটের সামাজিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।

এই সামাজিক নিপীড়নের প্রক্রিয়াটি কতটা নিচে নামতে পারে, তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকালে বোঝা যায়। সেখানে এখন মানুষের বডি শেমিং বা শারীরিক গঠন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হচ্ছে; কে কোথা থেকে এসেছে, কে আবাদি আর কে আবাদি নয়— এমন সব চরম বর্ণবাদী, আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট ও কুৎসিত আলাপ চলছে।

এগুলো কি সত্যিই সুস্থ মানুষের কোনো আলোচনা? এগুলো কি কথিত ‘স্বচ্ছতা’ বিষয়ক আলাপ? এসবের মাধ্যমে কিছু মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে, অথচ যাদের চরিত্রহনন হচ্ছে, এই একতরফা পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু বলতেও পারছেন না। তাদের পক্ষে কোনোভাবে কেউ একটু যুক্তি দিয়ে কথা বললে, তাদেরকেও নানা আপত্তিকর ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। অথচ ঐতিহাসিক পরিহাস হলো, যে মাজার নিয়ে কঠোর আঞ্চলিকতা এবং আদি বাসস্থান নিয়ে অযৌক্তিক আলাপ তোলা হচ্ছে, সেই মাজারের মূল ব্যক্তি হযরত শাহজালাল নিজেই সিলেটি ছিলেন না; তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য সুদূর ইয়েমেন থেকে এই সিলেটে এসেছিলেন।

ছবি: সংগৃহীত।

সামাজিক মাধ্যম তো সম্পাদনাহীন এবং নিয়ন্ত্রণহীন এক প্ল্যাটফর্ম, সেখানে ক্ষোভ আর কুৎসার প্রকাশ চিরন্তন। কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে মূলধারার কিছু গণমাধ্যম থেকে। সেখানেও এমন সব আপত্তিকর অভিধা যুক্ত করে কাউকে কাউকে চিত্রিত করা হচ্ছে, যা ন্যূনতম সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থী। কথ্য ভাষায় বা সামাজিক পরিসরে ঠাট্টা কিংবা হিংসাপ্রসূতভাবে অনেকে অনেককে অনেক নামে ডাকতেই পারে, কিন্তু দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে সাধারণত সেসব শব্দ বা নাম উল্লেখ হওয়ার কথা নয়। অথচ এখন সেটাই হচ্ছে। জীবিত তো বটেই, এমনকি মৃত মানুষদেরও রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। মৃত ব্যক্তিদেরও নানা ভাবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, অনেককে বানানো হচ্ছে লুটপাটের সহযোগী। সবচেয়ে বড় অবিচার হলো, যাদের নামে এই অভিযোগগুলো করা হচ্ছে, তাদের বা তাদের পরিবারের কারও কোনো বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে না। চলছে একতরফা ‘মিডিয়া ট্রায়াল’।

সম্প্রতি কিছু গণমাধ্যমে মাজার-কাণ্ডকে কেন্দ্র করে সিলেট থেকে প্রত্যাহার হওয়া সাবেক ডিসি সারওয়ার আলমের বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে তিনি আক্রোশমূলক কিছু মন্তব্য করেছেন। অথচ একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এই সময়ে এসে এসব বিষয়ে তার এমন মন্তব্য করার কোনো এখতিয়ার বা সুযোগ ছিল না। সিলেট থেকে প্রত্যাহৃত হওয়ার পর গণমাধ্যমে এসব নিয়ে কথা বলা তার জন্য আচরণবিধি বহির্ভূত। যদি আদালত তাকে ডাকে কিংবা কোনো কমিটি ডাকে, তবে সেই যথাযথ কর্তৃপক্ষের সামনেই কেবল তিনি তার বক্তব্য দিতে পারতেন। তা না করে তিনি প্রকাশ্যে উসকানিমূলক কথা বলে চলেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি উত্তপ্ত করে তুলছে। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এখানে তার কোনো পক্ষ হওয়ার সুযোগ ছিল না, তবু তিনি যেন নিজেই এখানে একটা পক্ষ হয়ে যাচ্ছেন। এখানে কোনো গণমাধ্যম যদি প্রশাসনের কারও বক্তব্য নেওয়ার দরকার মনে করে, তবে বর্তমান জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের মন্তব্য নিতে পারত। কারণ দায়িত্ব হস্তান্তর করে সিলেট থেকে এসেছেন সারওয়ার আলম, এবং তার গৃহীত যে-কোনো উদ্যোগের দায় ও দায়িত্ব বর্তমান প্রশাসনের, কারণ কোনো জেলা প্রশাসক ব্যক্তি-পর্যায়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিলেও, এটা আর ব্যক্তিগত থাকে না, হয়ে পড়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।

ছবি: সংগৃহীত।

সুফি ঘরানা ও মাজার-সংস্কৃতি, তা কেবল দালান আর দানবাক্সের হিসাব নয়। এর সাথে জড়িয়ে থাকে আধ্যাত্মবাদ; আধ্যাত্মিক পরম্পরা, খাদেমদের আত্মিক সংযুক্তি এবং লক্ষ লক্ষ ভক্ত-আশেকানের অন্তস্থ অনুভূতি। মাজারকেন্দ্রিক যে নিবিড় আত্মিক অনুভূতি, এটাকে স্রেফ জাগতিক আর্থিক হিসাবে মাপলে তো গোল বাধবেই; এবং ঠিক সেটাই হয়েছে। দানবাক্সের বিতর্ককে উসকে দিয়ে খাদেম পরিবারগুলোর ওপর যে সামাজিক ও মানসিক নিপীড়ন চালানো হচ্ছে, তার পরিণতি সিলেটের চিরায়ত সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সম্মান, ঐতিহ্য এবং মাজারের আদব পরিপন্থী।

বর্তমানে মাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা আগামী ২৫ জুলাই বা তার আগে এর একটি যৌক্তিক ও সম্মানজনক সমাধান বের করতে পারবেন। সে পর্যন্ত আমাদের সকলের অত্যন্ত ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে অপেক্ষা করা উচিত। এই অপেক্ষার সময়ে যদি কারও কোনো গঠনমূলক প্রস্তাবনা থাকে, তবে তা প্রকাশ করা যায়। কিন্তু তা না করে আমরা যদি বিবিধ আক্রোশে কারও চরিত্রহননে মাতি, কাউকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে উঠেপড়ে লাগি— তবে তা কেবল এই পুণ্যভূমির পবিত্রতাকেই ক্ষুণ্ণ করবে না, বরং আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অস্থিরতা ও অবক্ষয়কেই বাড়িয়ে তুলবে। আমরা যখন শান্তি ও স্বচ্ছতা চাই, তখন সমাজও আমাদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণই প্রত্যাশা করে।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আইএর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Scroll to Top