
চলতি এশিয়ান গেমসে এপর্যন্ত স্বর্ণপদক জিতেছেন অনেক অ্যাথলেটই। তাদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে দুই ইরানিয়ান। মেয়েদের লাইটওয়েট ডাবল স্কালস ইভেন্টে জেইনাব নোরুজির সাথে জুটি বেঁধে স্বর্ণ জেতা রোয়ার কিমিয়া জারেয়ি। বড় অর্জনের পেছনে গল্পটা ছিল কঠিন। যুদ্ধের মধ্যে সতীর্থ ছাড়া অনুশীলন করে এপর্যন্ত পৌঁছেছেন জারেয়ি, সোনার পদকে রাঙিয়ে বলেছেন সেই গল্প।
বৃহস্পতিবার ইরানের রোয়ার কিমিয়া জারেয়ি ক্যারিয়ারে অন্যতম সেরা দিন পার করেছেন। নাগারাগাওয়া ইন্টারন্যাশনাল রেগাটা কোর্সে জেইনাব এবং কিমিয়া লাইটওয়েটে স্বর্ণপদক জিতেছেন। সঙ্গে মেয়েদের ডাবল স্কালস ইভেন্টে রৌপ্যপদকও এনেছেন তারা।
সাত মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মাথার উপর ঘনঘন যুদ্ধবিমান উড়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে ইরান রোয়িং ফেডারেশন কিমিয়াদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প বাতিল করে। সব ক্রীড়াবিদদের বাড়িতে ফেরত পাঠায়। কিমিয়াদের সাথে ছিল কেবল একটি করে আর্গোমিটার (রোয়িং সিমুলেটর) এবং কোচের দেয়া একটি প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা। না ছিল কোন রোয়িং বোট, না ছিল কোন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। পরেরদিন কী ঘটবে, সে বিষয়েও কোন নিশ্চয়তা ছিল না কিমিয়াদের।
সেসময় নিজ শহর হামাদানে ফিরে যান রোয়ার কিমিয়া। ইরানের রোয়াররা নিজ উদ্যোগে জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বাভাবিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তারা নিজেদের ঘরে অনুশীলন করতেন, মাঝেমধ্যে বাইরে বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেতেন। সকলে কোচের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং সাধ্যমতো প্রশিক্ষণের সময়সূচি মেনে চলতেন।
স্বর্ণপদক জিতে কিমিয়া বলেছেন, ‘আমাদের ওপর প্রতিদিন বোমা হামলা হচ্ছিল। একমাস ধরে শুধু আর্গোমিটার ব্যবহার করে ঘরেই অনুশীলন করেছি। প্রতিদিন ২০ কিলোমিটার করে অনুশীলন করতাম।’
বিষয়টি কেবল ব্যায়াম এবং অনুশীলন করার জন্য শান্ত জায়গা খুঁজে পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। যুদ্ধ তখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একদিনের বিশেষ এক অনুশীলনের কথা স্মরণ করে কিমিয়া বলেছেন, ‘যখন অনুশীলন শুরু করতে যাচ্ছিলাম, তখন বাড়ির খুব কাছেই বোমা পড়ার শব্দ শুনলাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই সবকিছু দেখতে পেলাম, শুধু ধোঁয়া। যুদ্ধের প্রথম মাস ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রতিটি শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বলতে পারব না যে কেবল কয়টি শহর আক্রান্ত হয়েছিল। বরং অধিকাংশ শহর এর শিকার হয়েছিল।’
যেকোন সময় অনুশীলন ব্যাহত হতে পারত। কিমিয়া জানাচ্ছেন, ক্রীড়াবিদদের প্রায়ই কঠিন ও অসম্ভব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো। বলেছেন, ‘এমন সময়ও গেছে যখন আমাকে অনুশীলন থামাতে হয়েছে, কারণ বাড়ির কাছেই বোমা হামলা হচ্ছিল। মাঝেমধ্যে নিজেকে প্রশ্ন করতাম, আমরা কী জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করব, নাকি রোয়িং চালিয়ে যাব?’
সংঘাতের তীব্রতা কমে এলে কিমিয়া ও নারী দলের বাকি সদস্যরা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ফেরেন। পুনরায় পানিতে নৌকা চালানোর অনুশীলন শুরু করতে পারেন। কিমিয়া বলেছেন, ‘সেই কঠিন সময়ে ফেডারেশন, কোচ এবং সতীর্থদের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’
‘সৌভাগ্যবশত, ফেডারেশন, কোচ এবং সতীর্থদের সহায়তায় আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিলাম। এমনকি সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতেও। যখন দেশের পরিস্থিতি নিয়ে নানা দুঃসংবাদ শুনছিলাম, তখনও আমরা বাড়িতে বা নিজেদের কক্ষে নিয়মিত অনুশীলনের ভালো সেশন চালিয়ে গেছি।’
এমন পরিস্থিতির কারণে মাঝেমধ্যে কিমিয়ার কাছে এশিয়ান গেমসের বিষয়টি তুচ্ছ মনে হতো। কিন্তু বারবার সেই লক্ষ্যের কথা স্মরণ করতেন যার জন্য অনুশীলন করে গেছেন। হাংঝু গেমসে নিজের ইভেন্টে চতুর্থ হয়েছিলেন, প্রতিযোগিতা শেষে কান্নায় ভেঙে পড়ার কথা এখনও মনে আছে কিমিয়ার। তাই পরিবার এবং দেশে অপেক্ষয় থাকা মানুষের কথা ভাবতেন।
কিমিয়া বলেছেন, ‘পদক, দেশের মানুষ, পরিবার এবং নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রতিদিন নিজেকে অনুপ্রাণিত রাখতে পেরেছি। এই পদক ইরানের জনগণের কাছে, বিশেষ করে ইরানি মেয়েদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।’
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…


