দেশের ৬৪ তম জেলা ফেনী৷ কৃষি নির্ভর এ জেলার ৭০ শতাংশ অর্থনীতি কৃষি ঘিরে৷ নান্দনিক দর্শনীয় স্থান ও বিখ্যাত বেশ কয়েকটি খাবারের জন্য কদর আছে ফেনীর। এ জেলার ৮০ ভাগ মানুষই জড়িত কৃষিকাজের সাথে। শতকরা ৭৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের উৎস চাষাবাদ৷ ফলে প্রতি বছর খাদ্য ও শষ্য উৎপাদনে বড় অবদান রাখে ফেনী জেলার মানুষ।
তবে চলতি বছরের কয়েক দফায় বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কৃষি ক্ষেত্রে। রোপা আমন ও আউস দুই মৌসুমের বেশিরভাগ ফসল নষ্ট হয়েছে বন্যার স্রোতে। হেক্টরের পর হেক্টর আবাদী জমিতে জমেছে কাদা ও পলি। এতে কৃষি নির্ভর এ জেলার অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করছে বিশ্লেষকরা।
বিজ্ঞাপন
জুলাই মাসে বন্যার পর গত ২২ আগষ্ট উজানের ঢলের পানিতে তলিয়ে যায় পুরো ফেনী জেলা। স্মরণকালের ভয়াবহ এই বন্যার পানি নেমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সাথে দৃশ্যমান হচ্ছে তলিয়ে যাওয়া ফসলি জমি। ফসলের জমি দৃশ্যমান হওয়ার সাথে দৃশ্যমান হচ্ছে বন্যার ক্ষতি।

জেলা কৃষি অধিদফতরের তথ্য মতে, বন্যার পানিতে ফেনীর ছয় উপজেলায় শুধুমাত্র ফসল খাতে ৩০ হাজার ৩৫২ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। যার ক্ষতির পরিমাণ ৪৫১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এতে জেলার দুই লক্ষাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য বলছে, বন্যায় জেলার মোট ফসলি জমির ৭৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ নষ্ট হয়েছে। এরমধ্যে ২৬ হাজার হেক্টর আমন, ১ হাজার ৮৫৪ হেক্টর আউশ,১ হাজার ৮৬৫ হেক্টর আমন বীজতলা, ৬৯ হেক্টর ফলবাগান, আবাদকৃত ৫২৫ হেক্টর শরৎকালীন সবজির পুরো অংশ, ৭ হেক্টর আদা, ১৬ হেক্টর হলুদ এবং ১৬ হেক্টর আখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর আগে গত জুলাই মাসের বন্যায় ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়ায় আউশ আবাদ, গ্রীষ্মকালীন সবজি, আমন বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন মরিচের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সে ক্ষতি না কাটিয়ে উঠতেই ফের বন্যায় সব ভেসে গেছে কৃষকদের। তখন ব তিন উপজেলার কৃষিতে ১ কোটি ১৭ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এতে ১ হাজার ৭১৯ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো বলে জানিয়েছে জেলা খামার বাড়ি।
দেড় মাসের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি বন্যার মুখোমুখি হয়েছে এজেলার কৃষকরা। এবারের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ফসলের ৮০ শতাংশই শেষ। এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার উপায় নেই কৃষকদের মৌসুমের শুরুতে সব অর্থ ব্যয় করে চাষাবাদ করেছেন কৃষকরা। এতে নতুন করে জমি প্রস্তুত ও চাষাবাদ করার অর্থ নেই কৃষকদের। ফলে জেলার অর্থনীতির ও কৃষি খাতের অবক্ষয় ঠেকাতে সরকারি প্রনোদনার অবকাশ নেই দাবি কৃষকদের।
ফুলগাজীর জগৎপুর গ্রামের কৃষক ওহিদুল হক জানান, ৩ কানি জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন। বন্যার পানি আসার ২ দিন আগে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ করে ধানের চারা লাগানোর কাজ শেষ করেছিলেন। কিন্তু বানের জলে তার ফসলী জমির সকল ফসল শেষ। একদিকে ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে অন্যদিলে ফসলও শেষ এমন ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে সব হারিয়ে পথে বসেছেন তিনি।

পরশুরামের কৃষক আলী আহমেদ বলেন, বছরের প্রথম দফায় বন্যায় আমন বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপর আবার বীজ রোপন করি। আমন আবাদের কিছুদিন পর বন্যার পানিতে সব ভেসে যায়। দেড় মাসের ব্যবধানে তৃতীয় দফার বন্যায় সবগুলো ফসলি জমি এখন বালুর স্তূপ হয়ে আছে। কোনোভাবে আবাদ করে খাবো এমন পরিস্থিতি আর নেই। এখন জমি তৈরির টাকাও নাই। আগামী বছরের জমানো সব ধান চালও বিলীন হয়েছে বন্যায়। খাব কি জানি না।
ছাগলনাইয়া উপজেলার কৃষক মোশাররফ হোসেন বলেন, বন্যার দুইদিন আগে লোক দিয়ে কাজ শেষ করেছি। সকল জমিতে ধান লাগানো শেষ হয়ে গেছিল।এখন বন্যার পানিতে সব ডুবে জমিতে শুধু বালুর স্তূপ। একদিকে ফসল নষ্ট হয়েছে অন্যদিকে ঘরে থাকা গচ্ছিত ধান-চাল ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে আবাদ করার মতো কোন পরিস্থিতি নেই। এমন অবস্থায় জেলায় খাদ্য সংকট দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
তিনি বলেন, এখন আমরা নিরুপায়। সরকার আমাদের পাশে না দাঁড়ালে আমরা অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে চলে যাব।
ফেনী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. একরাম উদ্দিন বলেন, এবারের বন্যায় কৃষিতে বড় ক্ষতি হয়েছে। কৃষি অফিসের কার্যালয় পানিতে ডুবে ছিল এরপরেও কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং তাদের নানা পরামর্শে কাজ করছে। ইতোমধ্যে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। কৃষকদের আমনের চারা দেওয়ার ব্যাপারে দাপ্তরিকভাবে আলোচনা উঠে এসেছে। এছাড়া এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আগাম জাতের কিছু ফসল আবাদের বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।