ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এবং একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপে পড়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই সমঝোতা নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিনি বলেন, চুক্তির বিস্তারিত শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সমঝোতা ইসরায়েলের জন্য নতুন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে মোকাবিলার বিষয়টিকে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছিলেন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে তিনি নিজের রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরতেন। কিন্তু এবার যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ায় তার অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সমালোচকদের প্রশ্ন, যিনি নিজেকে ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রভাবশালী মিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছাল। তাদের মতে, এই পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্যও অস্বস্তিকর।
ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছেন, নেতানিয়াহুর সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে—হয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে জড়ানো, নয়তো ইসরায়েলের কিছু কৌশলগত স্বার্থে ছাড় দেওয়া।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির চুক্তির সমালোচনা করে বলেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের বাধ্য করে না। আমরা এমন কোনো চুক্তির অংশ নই, যা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।’
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি নেতানিয়াহুর কিছু সামরিক সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার এমন মন্তব্য ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধী দলগুলোও বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গাজা, লেবানন ও ইরান ইস্যুতে দীর্ঘদিনের সামরিক কৌশল প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। গাজায় দীর্ঘ সংঘাত চললেও হামাস পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। একইভাবে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবও পুরোপুরি কমানো সম্ভব হয়নি।
মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা ও ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কেন এই ধরনের সমঝোতায় গেল তা বোঝা কঠিন। তার মতে, এই চুক্তি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচও মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি ইসরায়েলের ইরান-নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। তার ভাষায়, বাস্তবসম্মত ও সংযত কৌশল গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে আরও জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে ইসরায়েলকে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। আর সেই পরিবর্তিত বাস্তবতায় নেতানিয়াহুকে এখন একদিকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা, অন্যদিকে প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।




