এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন চট্টগ্রাম ওয়াসার “চট্টগ্রাম স্যুয়ারেজ সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ক্যাচমেন্ট-২ ও ৪)” প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘসুত্রিতায় পড়েছে। প্রায় দুই বছরেও শেষ হয়নি এই নিয়োগ। ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই আগ্রহপত্র প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি গুরুত্বপূর্ণ এই ক্রয়প্রক্রিয়া। ফলে সংশ্লিষ্টরা এতে অনিয়ম হওয়ার আশংকা করছেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, পরামর্শক নিয়োগ ছাড়া প্রকল্পের নকশা, কারিগরি তদারকি, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া কঠিন। ফলে পরামর্শক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা শুধু প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থ ছাড় এবং চট্টগ্রাম নগরবাসীর প্রত্যাশিত আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা প্রাপ্তির ওপর।
প্রকল্পে অংশগ্রহণেচ্ছুদের মতে, একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে দুটি প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করার কারণে কাজে দীর্ঘসূত্রিতা হচ্ছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী এবং প্রকল্প পরিচালকের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
বিষয়টি জানতে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আমিনকে ফোন করা হলে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তিনি বলেন, ‘দায়িত্বশীল জায়গা থেকে আমি কোন মন্তব্য করতে পারব না’।
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় প্রকল্পের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত বড় অবকাঠামো প্রকল্পে পরামর্শক নির্বাচন সম্পন্ন হতে প্রায় দুই বছর সময় লাগার বিষয়টি স্বাভাবিক নয় বলেও মনে করছেন তারা। আরএফপি ক্লারিফিকেশন নিয়ম অনুসারে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে কিনা সেটি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রকল্প তদারকিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত আরেক কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থাকার কথা না। কারণ পরামর্শক নিয়োগের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার কমিটি আছে। সেখানে দাতা সংস্থার প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চট্টগ্রাম ওয়াসার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীসহ অনেকেই আছেন।
তিনি বলেন, গত সপ্তাহে এ বিষয়ে একটি মিটিং হয়েছে। সব নথি যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে যত দ্রুত সম্ভব মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়সীমা বলতে না পারলেও আমরা আশাবাদী, শিগগিরই পরামর্শক নিয়োগ চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ সময়মতো শেষ হওয়া জরুরি। বিশেষ করে পরামর্শক নিয়োগের মতো প্রাথমিক কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপে দীর্ঘ বিলম্ব হলে পুরো প্রকল্পের সময়সূচি পিছিয়ে যেতে পারে। এতে ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থ ছাড়ে জটিলতা এবং প্রকল্পের সুফল পেতে নাগরিকদের দীর্ঘ অপেক্ষার ঝুঁকি তৈরি হয়।
চট্টগ্রাম নগরীতে আধুনিক স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। নগরীর জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ সুরক্ষা, জলাবদ্ধতা-সম্পর্কিত ঝুঁকি এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এই প্রকল্প সরাসরি যুক্ত। কিন্তু এমন একটি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগেই দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, ক্রয়প্রক্রিয়ার গতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে।
চট্টগ্রাম নগরীর দীর্ঘদিনের পয়ঃনিষ্কাশন সংকট সমাধানের লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়িত হবে—এটাই নগরবাসীর প্রত্যাশা। কিন্তু পরামর্শক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপেই যদি প্রায় দুই বছর কেটে যায়, তাহলে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ গতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত চট্টগ্রামবাসীর জন্য প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরামর্শক নিয়োগ শুরু হওয়ার আগেই প্রায় দুই বছর নষ্ট হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠছে—নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে আদৌ কি শেষ হবে ৫,১৫২ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প?
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, পরামর্শক নিয়োগে দীর্ঘ বিলম্ব পুরো প্রকল্পের সময়সূচি ভেঙে দিতে পারে, ব্যয় বাড়াতে পারে এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ ছাড়েও জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এ ধরনের প্রকল্পে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছ ও কার্যকর ক্রয়প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।

