হাল ফ্যাশন এক্সক্লুসিভ: খাঁটি বাংলাদেশি মুড়ি-পেঁয়াজু দিয়ে মাস্টারশেফ ইউকের কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়া সাবিনা খানের একান্ত সাক্ষাৎকার 

হাল ফ্যাশন এক্সক্লুসিভ: খাঁটি বাংলাদেশি মুড়ি-পেঁয়াজু দিয়ে মাস্টারশেফ ইউকের কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়া সাবিনা খানের একান্ত সাক্ষাৎকার 

সাবিনা খানের হাত ধরে বাংলাদেশের মুড়ি-পেঁয়াজু বাজিমাত করেছে মাস্টারশেফ ইউকের মঞ্চে। হাল ফ্যাশনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানালেন তাঁর রন্ধন-দর্শন, রান্না নিয়ে স্বপ্ন ও পরিকল্পনার কথা৷ 

প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ওশেনিয়া, আফ্রিকার মরুভূমি থেকে বরফশীতল উত্তর মেরু যেখানেই যাই না কেন, বাংলাদেশের রসনাবিলাস আর রন্ধনশৈলীর কাছে যেন হার মেনেছে বহু সংস্কৃতি। মুঘল থেকে পর্তুগিজ, ব্রিটিশ, এমনকি শৈল্পিক খাবারের জন্য খ্যাত ফরাসিরাও বাংলাদেশের খাবারের স্বাদের বৈচিত্র্য নিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সময়ে। রাস্তার মোড়ে সন্ধ্যার আড্ডা জমে ওঠে যে মুড়িমাখা আর ঝালমুড়ি আর পেঁয়াজুতে, সেই সাধারণ অথচ অনন্য ক্ল্যাসিক স্বাদকেই নতুনভাবে উপস্থাপন করে বিবিসিতে প্রচারিত, বিশ্বখ্যাত রান্নার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান মাস্টারশেফ ইউকের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেছেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি রন্ধনশিল্পী সাবিনা খান।

মাস্টারশেফ ইউকের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেছেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি রন্ধনশিল্পী সাবিনা খান
সাবিনার কল্যাণে পেঁইয়াজুর নতুন নাম এখন বুলেটস অব জয়

‘বুলেটস অব জয়’ অর্থাৎ মুড়ি-পেঁয়াজুর সেই অভিনব রূপের নেপথ্যের গল্প জানতে চেয়েছি আমরা হাল ফ্যাশনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায়। সেই সঙ্গে উঠে এসেছে আরও নানা প্রসঙ্গ। বিশেষ করে রান্না ও খাবার নিয়ে তাঁর স্বপ্ন আর পরিকল্পনার কথা। 

সাবিনা খান একজন প্যাশোনেট রন্ধনশিল্পী হলেও আসলে পেশায় তিনি এনভায়রন্টম্যেন্ট কনসালট্যান্ট। স্বামী আসিফ ও দুই সন্তানকে নিয়ে বর্তমানে লন্ডনে বসবাস করছেন। তবে তাঁর শৈশব কেটেছে ঢাকার গুলশানে, যেখানে ঘরের রান্না, পারিবারিক স্বাদ আর দেশীয় খাবারের স্মৃতি আজও তাঁর সৃজনশীলতার মূল অনুপ্রেরণা।

ঢাকায় শৈশব কেটেছে সাবিনা খানের

একসময় পড়াশোনা করেছেন ঢাকার স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় স্কলাস্টিকায়। সাবিনা খানের এই কৃতিত্বে স্কুলের অ্যালামনাই হিসেবে তাঁকে নিয়ে উচ্ছাস জানিয়েছে সামাজিক মাধ্যমে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও ছাত্র-ছাত্রীরা। এখানে তাঁর সঙ্গে প্রাণবন্ত আলাপচারিতার বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

হাল ফ্যাশনের সঙ্গে জুম-এ সাবিনা খানের একান্ত সাক্ষাৎকারে

মাস্টারশেফের মতো এত বড় একটি প্ল্যাটফর্মে খাঁটি বাংলাদেশি পেঁয়াজু ও মুড়ি পরিবেশনের ভাবনাটি কীভাবে এলো?

এই শোয়ে আমি এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম, যা আমার শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত। পেঁয়াজু ও মুড়ি আমাদের খুব পরিচিত খাবার। এটি সবার প্রিয় স্ট্রিট ফুড আবার ঘরোয়া নাশতাও। কিন্তু এটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছি আমি, যাতে সেটা ফাইন ডাইনিং পর্যায়ে চলে যায়। আর সেটাই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ।

তিনি এই শোয়ে এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন, যা তাঁর শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত

পেঁয়াজুকে আমি খুব বেশি পরিবর্তন করিনি, কারণ এর মৌলিক স্বাদটাই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মুড়ি পরিবেশন করাটাই সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল। মুড়ি খুব দ্রুত নরম হয়ে যায়; তাই সেটাকে কীভাবে ক্রিস্পি রাখা যায় এবং একই সঙ্গে একটা সুন্দর প্লেটিং দেওয়া যায় এটা নিয়ে আমাকে অনেক ভাবতে হয়েছে। আমি সিদ্ধান্ত নিই, মুড়িটাকে আলাদা করে পরিবেশন করব, যেন খাওয়ার সময় সেটার টেক্সচার ঠিক থাকে। পুরো ডিশটাকে আমি “সালাদ” হিসেবে ভাবলাম, যেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন উপাদান থাকবে। মৃদু হেসে সাবিনা বললেন, আমি আগে গবেষক ছিলাম, তাই শুধু রান্না করে খাবার পরিবেশনই করি না। আমি প্রতিটি উপাদানের পেছনের দিকটা চিন্তা করি।

এক্ষেত্রে রন্ধন ও পরিবেশনায় আপনার কী কী ভাবনা কাজ করেছে আর যে চ্যালেঞ্জগুলো পার হতে হয়েছে সে গল্প বলুন না আমাদেরকে!

আমি কালো ছোলা (কাবুলি চানা নয়, দেশি ছোলা), মুড়ি এই উপাদানগুলো রাখতে চেয়েছিলাম। তখন বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের অস্থিরতা চলছিল যেমন ইরানের পরিস্থিতি, বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন। এই বিষয়গুলোও আমাকে প্রভাবিত করেছিল। সেকারণেই একেবারেই ভিন্ন উপস্থাপন চিন্তা করেছিলাম। আমার মাথায় প্রথম যে চিন্তাটা আসে সেটা হচ্ছে কীভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতির উপাদান এক প্লেটে আনা যায়৷ তাই আমার পরিবেশনায় ছিল ফ্রেঞ্চ টেকনিক: গার্লিক কনফি, বাংলাদেশি উপাদান: শর্ষের তেল ও পাঁচফোড়ন, আন্তর্জাতিক টাচ: কোয়েলের ডিম। তাঁর বয়ানে, আমি শর্ষের তেলকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছি। তাই মধু, গার্লিক কনফি, পাঁচফোড়ন দিয়ে একটি ড্রেসিং তৈরি করি যেটা একেবারেই ইউনিক বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, এই স্বাদগুলো অনেকের কাছে একদম নতুন। শর্ষের তেল অনেকের কাছে খুব স্ট্রং, কালো ছোলা সবার পরিচিত নয় আবার মুড়ি তো একেবারেই অজানা।  

খাঁটি দেশি মুড়ি-পেঁয়াজুকে হারমনি সালাদ রুপে পরিবেশন করেছেন সাবিনা

এ পর্যায়ে সাবিনা বললেন, আমি চিন্তায় ছিলাম প্রথমবার খেয়ে কেউ যদি বলে “এটা আবার কী?” তাহলে কেমন হবে? কিন্তু আমি ঝুঁকি নিয়েছি। আমার এক ব্রিটিশ বন্ধু এই ডিশ টেস্ট করে বলেছিল “এটা অসাধারণ।” তখন আমি কিছুটা আত্মবিশ্বাস পাই। এই ডিশের নাম দিই ‘হারমনি সালাদ’ (Harmony Salad) কারণ এতে বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলন ঘটেছে। মসলাদার ব্ল্যাক চিক পিস যেমন ছিল এখানে তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের ফ্যালাফলের সঙ্গে মিল আছে আমাদের পেঁয়াজুর। এখানে আরও ব্যবহার করা হয়েছে জেম লেটুস, গাজর ও ডালিম।এর সঙ্গে পরিবেশন করা হয়েছে সল্টেড চিকেন স্কিন বা মুরগির চামড়া। বিটরুট দিয়ে মোড়ানো কোয়েল ডিমও আছে। আর অবশ্যই পাশে আছে মুড়ি ও কারিপাতা আর সেই সঙ্গে কনফি গার্লিক ও শর্ষের তেলের ড্রেসিং।

বিচারকদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল আর তাঁরা আপনার এই ব্যতিক্রমী ধারনাটিকে কীভাবে গ্রহণ করেছেন?

আমি বেশ নার্ভাস ছিলাম। এমনিতেই বাঙালি হিসেবে আবেগী বলে চোখের কোণে পানি জমে ছিল৷ যখন আমার মায়ের খুব পছন্দের বিচারক ও ফুড ক্রিটিক জে রেইনার বললেন ‘দিস ইজ অ্যান অ্যামেজিং সালাদ’, আমি কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

ফুড ক্রিটিক জে রেইনারের প্রশংসা পাওয়া সহজ নয়

এরপর বিচারক ও রেস্তোরাঁ ক্রিটিক গ্রেস ডেন্ট বললেন,  কোয়েলের ডিমগুলোকে এত সুন্দর, নরম ও কুসুম লিকুইড রাখা সহজ কাজ নয়। তুমি প্রচুর রসুন ব্যবহার করে একটি স্ট্রং ড্রেসিং তৈরি করেছ, যা পুরো খাবারটিকে দারুণভাবে একীভূত  করেছে। তাঁর মতে, এটি ছিল একটি অসাধারণ সমন্বয়।

মাস্টারশেফ ইউকে-তে গ্রেস ডেন্ট ও অ্যানা হফ

অন্যদিকে আরেক বিচারক, শেফ ও রেস্তোরাঁ মালিক অ্যানা হফ অনেক প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ব্ল্যাক ছোলার ঝাঁঝ, ডালিমের ছোট ছোট মিষ্টি একটা পাঞ্চ আর ফ্যালাফেলের (পেঁয়াজু) সুন্দর সোনালি-বাদামি টেক্সচার মিলিয়ে খাবারটি দারুণ ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাঁরা সবাই মনে করেছেন, আমি সত্যিই অসাধারণ কিছু তৈরি করতে পেরেছি। তবে আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল বাংলাদেশি স্বাদ তাঁরা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন। এখান থেকেই আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে যে, আমাদের যেকোনো খাবারই বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা সম্ভব।

আপনার কালিনারি জার্নি সম্পর্কে জানতে চাই। কীভাবে শুরু আর কোথা থেকে অনুপ্রেরণা  পেলেন? 

ছোটবেলা থেকেই রান্নার প্রতি ভালোবাসা ছিল। আমার মা ও দাদি ছিলেন অসাধারণ রাঁধুনি।খাবারের প্রতি আমার ভালোবাসা শুরু হয় ছোটবেলা থেকেই। আমরা খুব একটা বাইরে খেতে যেতাম না, তাই আমার মা বাসায়ই করতেন তাঁর হাতের রান্নার জাদু।

মায়ের হাতের রান্নাই সাবিনার সবচেয়ে বড় প্রেরণা

কোনো কিছুই তার কাছে অসাধ্য ছিল না। পিৎজা, বার্গার, কাবাব, বিরিয়ানি, এমনকি কেক, কুকিজ, ডোনাট সবকিছুই তিনি নিজ হাতে বানাতেন। আমি আমার মা ও দাদির রান্না দেখতাম এবং বুঝতে পারতাম, প্রতিটি খাবারের পেছনে কত যত্ন ও ভালোবাসা থাকে। স্কুল থেকে ফিরে পরিবার নিয়ে একসঙ্গে বসে খাওয়ার স্মৃতিগুলোই আমার ভালো খাবারের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করেছে। আমি নিয়মিত রান্নার শো দেখতাম ছোটবেলায়৷ ‘খানা-খাজানা’ পরে ‘আয়রন শেফ’ আমার খুব ভালো লাগতো আমি মানিকগঞ্জের মেয়ে। কিন্তু জীবনের অনেকটা সময় আমি অন্য পেশায় কাটিয়েছি৷ কখনো কনসালট্যান্ট, কখনো রিসার্চার কিন্তু প্রায় ৫০ বছর বয়সে এসে বুঝেছি রান্নাই আমার আসল প্যাশন। ২০ বছর ধরে আমি পরিবার ও বন্ধুদের জন্য রান্না করেছি। কিন্তু এতদিনে বুঝেছি—আমি আসলে সবসময়ই আমার স্বপ্নের কাজটাই করে আসছিলাম। রান্না করা, নতুন কিছু চেষ্টা করা, মানুষকে একত্র করা—সবসময়ই এগুলো করেছি। এখন রান্না ছাড়া জীবন কল্পনাই করতে পারি না। 

আপনি এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি বড় প্ল্যাটফর্মে আছেন। এ পর্যায়ে এসে আপনার স্বপ্ন কী আর কীভাবে আপনি আমাদের খাঁটি, ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি খাবারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান? 

আমি চাই না বাংলাদেশি খাবার শুধু বাংলাদেশিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। অথেনটিক খাবারের সঙ্গে অন্য উপাদান যোগ করা ফিউশন বলে সাধারণত কিন্তু আমি “ফিউশন” শব্দটা ব্যবহার করতে চাই না। আমি বলি ফ্লেভারের সমন্বয়। যেমন— বাংলাদেশি স্ট্রিট ফুড + মেক্সিকান টাকো কিংবা বাংলাদেশি মসলা + আন্তর্জাতিক টেকনিক। আমি একটি “ফ্লেভার কুকবুক” লিখতে চাই।

নিজের রান্নাঘরকে ফ্লেভার ল্যাব বলেন তিনি
সাবিনার ফ্লেভার ল্যাবে বানানো মেক্সিকান স্টাইল ভর্তার সমাহার

আমি আমার রান্নাঘরকে “ফ্লেভার ল্যাব” বলি। কারণ আমি কৌতূহল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শেখার ইচ্ছা নিয়ে রান্না করি। আমি আমার বাংলাদেশি ও মধ্যপ্রাচ্যের রন্ধন শৈলী থেকে অনুপ্রেরণা নিই মসলা, কৌশল ও স্বাদের মাধ্যমে। আমার কাছে এটা ফিউশন নয়, এটা স্বাদের অনুসন্ধান। আমি চাই বিভিন্ন সংস্কৃতির খাবার একসঙ্গে থাকুক, কিন্তু তাদের নিজস্ব পরিচয় বজায় রেখে। আমার কাছে মূল বিষয় হলো স্বাদ। সবুজ মরিচের ঝাঁজ, সরিষার টক, পাঁচফোড়নের মিশ্রণের মতো নতুন ফ্লেভার। 

পরিবারে আপনার সবচেয়ে বড় সাপোর্ট ও অনুপ্রেরণা কে?  

আমার মা ও দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তারা আমাকে শিখিয়েছেন ভালো রান্না আসে ভালোবাসা, যত্ন এবং উপলব্ধি থেকে। সবকিছুর উর্ধ্বে আমি এমন খাবার রান্না করতে চাই যা মানুষকে একত্র করে হোক সেটা কারি, টাকো বা অন্য কিছু। আমি যতটা সম্ভব একদম শুরু থেকে রান্না করি, নতুন চ্যালেঞ্জ নিই এবং সবসময় শিখতে থাকি। আমার রান্নাঘরে সবসময় গান বাজে কারণ আমার কাছে ভালো খাবার আর ভালো সঙ্গীত একইরকম প্রিয়। 

সাবিনার বয়ানে, তিনি একজন “গ্লোবাল ফ্লেভার এক্সপ্লোরার” যিনি বিভিন্ন দেশের স্বাদ নিয়ে কাজ করেন

একজন কালিনারি আর্টিস্ট হিসেবে আপনার বিশেষত্ব কী? আপনার শক্তি ও দক্ষতার জায়গাগুলো কোথায়? একজন বাংলাদেশি প্রতিযোগী হিসেবে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?

আমি আসলে নিজেকে কালিনারি আর্টিস্ট বলতে চাই না। নিজেকে “ফ্লেভার এক্সপ্লোরার” বলতে ভালো লাগে আমার। আমি কেবল রান্নাঘরে রান্না করতে চাইনা। আমি বাংলাদেশে এসে প্রতিটি জেলায় ঘুরতে চাই। কী কী উপাদান দিয়ে তাঁরা রান্না করেন, তাঁদের রন্ধন কৌশল কেমন সেটা নিয়ে ডকুমেন্টারি করতে চাই। দারুণ কিছু ইউটিউব চ্যানেল আছে যাদের কাজ আমার খুব ভালো লাগে আমি তেমন কিছু করতে চাই। আমি বিশেষভাবে ব্রিটেনে অবস্থান করা বাংলাদেশি নারীদের নিয়ে কাজ করতে চাই যাঁরা দারুণ রান্না করেন কিন্তু সুযোগ পান না। রান্নাটা তাঁরা খুব ভালো পারেন। তাঁদের জন্য ক্যাটারিং সার্ভিস, ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে চাই। আমি চাই তাঁরা পেশাদার রান্নাঘরে কাজ করুক। নিজের ক্যাটারিং ব্যবসা শুরু করুক। বাংলাদেশেও একটি শেফ ট্রেনিং স্কুল করার স্বপ্ন আছে। আমি নিজেকে শুধু বাংলাদেশি শেফ বলতে চাই না। আমি একজন “গ্লোবাল ফ্লেভার এক্সপ্লোরার” যিনি বিভিন্ন দেশের স্বাদ নিয়ে কাজ করেন। বাংলাদেশি খাবার অনেকের কাছে অচেনা।যেমন  মুড়িঘণ্ট (মাছের মাথা) শুনলেই সবাই ভাববে মাছের মাথা কীভাবে খায়!  কিন্তু সেটাকে অন্যভাবে পরিবেশন করতে হবে, যাতে কেউ সেটা এড়িয়ে যেতে না পারে। 

এ পর্যায়ে কাঁচা কাঁঠালের তরকারি যেমন অনেকের কাছে অদ্ভুত লাগে কিন্তু খেতে খুবই দারুণ এই কথা বলায় সাবিনা খুশি হয়ে বললেন,  অনেক ধন্যবাদ! দেখি এটা দিয়ে কিছু করা যায় কিনা। জানালেন তিনি সবসময় ভাবেন, এই খাবারগুলোকে যেন এমনভাবে উপস্থাপন করা যায় যাতে সবাই গ্রহণ করে। এটাই তাঁর কাজ।

বিশ্বের কোন শেফ আপনার প্রিয়? কার কাছ থেকে আপনি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত? এবং কাদের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছে আছে?

আমার সবচেয়ে প্রিয় শেফ মাধুর জেফরি। তিনি ধীর রান্নার বা স্লো কুকিংয়ের গুরুত্ব শিখিয়েছেন, যা আজকাল হারিয়ে যাচ্ছে। ২০ মিনিটে চিকেন, ৩০ মিনিটে বিরিয়ানি এই কনসেপ্টে আমি বিশ্বাসী নই। চিকেন অন্তত তিন ঘণ্টা ম্যারিনেট করতে হবে,রান্না করতে হবে ধীরে আঁচে।।তবেই না স্বাদ পাওয়া যাবে। যদিও মাধুর জেফরির বয়স এখন ৯০ এর কোঠায়, তাও যদি জীবদ্দশায় তাঁর সঙ্গে রান্না করতে পারতাম কিংবা তাঁর হাত ছুঁতে পারতাম তাহলে আমার একটা ইচ্ছে পূরণ হতো। 

সাবিনার সবচেয়ে প্রিয় শেফ মাধুর জেফরি

আপনার প্রিয় খাবার কী?

আমার মায়ের হাতের কাচ্চি বিরিয়ানি আমার সবচেয়ে প্রিয়।আমি নিজে এখনো পারিনা। কিন্তু আমি পৃথিবীর যেখানেই এই পদ খেয়েছি, মায়ের রান্না করা কাচ্চি বিরিয়ানির মতো এমন স্বাদ কোথাও পাইনি। 

আপনি নিজের তৈরি কোন ডিশটিকে আপনার সেরা মনে করেন? 

অবশ্যই হারমনি সালাদ, কারণ এতে আমার দেশ, চিন্তা ও আবেগ সবকিছু আছে।

রান্নার বাইরে আপনার অন্যান্য শখ কী কী?

আমি ফিটনেস ফ্রিক। রান্নার পর আমি যেটা করি সেটা ব্যায়াম আর দৌড়ানো। অনেকের ধারনা, যাঁরা রান্না করে তাঁরা ফিট না৷ কিন্তু এটা একেবারেই ভুল।আপনি রান্না করবেন, খাবেন আর সঙ্গে ব্যায়াম চালিয়ে যাবেন। দেখবেন মনও স্বাস্থ্য দুটাই ভালো থাকবে। আমি গান শুনতে খুব ভালোবাসি। আমি রান্নার সময় গান শুনি।  আমার হারমনি সালাদের সঙ্গে বব মার্লের ‘ওয়ান লাভ’ গানটা মনে হয় দারুণ যায়। বলেই হাসতে লাগলেন সাবিনা। 

সাবিনা ফিটনেস ফ্রিক। রান্নার পর তিনি যেটা করেন, সেটা হলো ব্যায়াম আর দৌড়ানো।

মাস্টারশেফের এই জার্নিতে আপনার কাছ থেকে পরবর্তী কী আসছে, তা দেখার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। আপনার ভক্তদের জন্য যারা আপনাকে ভালোবাসে, সমর্থন করে এবং আপনার সাফল্য কামনা করে, তাদের জন্য আপনার বার্তা কী? 

আমার লক্ষ্য একটাই। মানুষ যেন বাংলাদেশি খাবারকে নতুনভাবে দেখে, আমাদের খাবারের গভীরতা ও সৌন্দর্য বুঝতে পারে। আমি হয়তো ছোট একটি পদক্ষেপ নিচ্ছি, কিন্তু এই জার্নি একদিন অনেক দূর যাবে এই বিশ্বাস রাখি আমি দৃঢ়ভাবে।

ছবি: সাবিনা খান ও ইন্সটাগ্রাম

Scroll to Top