নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে জমি রেজিস্ট্রি, দলিলের নকল উত্তোলন, দানপত্র, বণ্টনপত্র ও চুক্তিপত্র সম্পাদনের নামে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্য ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের কেন্দ্রে রয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার সিরাজুল হক। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি চক্র সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। প্রতি হাজার টাকায় গড়ে ৬ টাকা হারে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দলিলের বিভিন্ন জটিলতা দেখিয়ে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সোনাইমুড়ী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে জমি রেজিস্ট্রিসহ বিভিন্ন সেবা নিতে আসা মানুষকে নির্ধারিত সরকারি ফি ও কর পরিশোধের পরও অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। স্থানীয় কয়েকজন দলিল লেখকের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দলিলের কাগজপত্রে ত্রুটি দেখিয়ে কাজ আটকে রাখা হয়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার সিরাজুল হকের নেতৃত্বে কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘুষ আদায়ের একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। জমির দলিল সম্পাদন থেকে শুরু করে নকল উত্তোলন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে সেবাগ্রহীতাদের। এসব অর্থের ভাগ কার্যালয়ের পিয়ন থেকে শুরু করে জেলা রেজিস্ট্রার ও নিবন্ধন অধিদপ্তরের (আইজিআর) কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছেও পৌঁছায় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগে অফিস সহকারী আলিমুল ইসলামের নামও উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, স্থানীয় দলিল লেখকদের মাধ্যমে আদায় করা টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রতিদিনের লেনদেন শেষে রাতে কার্যালয়ে বসেই সংগৃহীত অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দলিলে সামান্য ভুল কিংবা কাগজপত্রে জটিলতা থাকলেই অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে টাকা না দিলে মাসের পর মাস দলিল খোঁজার অজুহাতে সেবাগ্রহীতাদের ঘোরানো হয়। অথচ চাহিদামতো অর্থ দেওয়ার পর দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয় বলে তাঁদের দাবি।
অভিযোগ অনুযায়ী, দলিলের জটিলতা সমাধানের নামে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিশেষ চুক্তি করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের দলিল ও কাগজপত্রের জন্য আলাদা হারে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, দলিলের সঙ্গে ফটোকপি করা কাগজপত্র থাকলে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। একই দাতার একাধিক দলিল কিংবা হেবা দলিলের ক্ষেত্রে নেওয়া হয় ৩ হাজার টাকা। আয়কর বা টিআইএন সনদ না থাকা এবং জমির পর্চায় বাবা-মায়ের নাম উল্লেখ থাকার ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানির নামে জমির পর্চা থাকলে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। দলিলে নামের পাশে ডাকনাম থাকা, বণ্টননামা কিংবা বায়না দলিলের ক্ষেত্রেও ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব অর্থ সরকারি নির্ধারিত ফি কিংবা করের অংশ নয়। বিভিন্ন অজুহাতে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। ফলে জমি কেনাবেচা ও দলিল সম্পাদনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধেও ঘুষের লেনদেন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের একজন অফিস সহকারী জাকির হোসেন এবং অন্যজন কেরানি আলিমুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের দাবি, দলিলের পে-অর্ডার ও অতিরিক্ত অর্থের লেনদেন নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁরা সাব-রেজিস্ট্রারকে সংকেত দেন। সেই সংকেত পাওয়ার পর দলিলে স্বাক্ষর করেন সিরাজুল হক বলে অভিযোগ রয়েছে।
এভাবে দলিল সম্পাদনের প্রক্রিয়ায় ঘুষের লেনদেনকে নিয়মিত কার্যক্রমের অংশে পরিণত করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের অভিযোগ, অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দলিল সম্পাদন করতে গেলে নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়।
এদিকে সাব-রেজিস্ট্রার সিরাজুল হকের সোনাইমুড়ীতে পদায়ন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। এর আগে তিনি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, আইন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে তিনি নিজ জেলা নোয়াখালীতে পদায়ন নিয়েছেন। তবে এই পদায়নে কোনো বিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে যাচাইকৃত প্রশাসনিক নথি পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমি রেজিস্ট্রি ও দলিলসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশেষ করে যাঁরা জমির কাগজপত্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না, তাঁদের বিভিন্ন জটিলতার কথা বলে হয়রানি করা হচ্ছে।
অভিযোগকারীরা সাব-রেজিস্ট্রার সিরাজুল হক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক লেনদেন, দলিল সম্পাদনের হিসাব ও অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে জেলা রেজিস্ট্রার ও আইজিআর কার্যালয়ের যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ অর্থের ভাগ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাব-রেজিস্ট্রার সিরাজুল হকের কার্যালয়ে সরাসরি গিয়ে এবং তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
সোনাইমুড়ী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে ঘুষ আদায়, দলিল আটকে রেখে হয়রানি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অবৈধ অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁরা এসব অভিযোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।


