কলমাকান্দায় এনআইডি জালিয়াতির অভিযোগে ইউপি চেয়ারম্যানসহ সাতজনের নামে মামলা

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে ভুয়া কাগজপত্রে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অভিযোগে দায়ের করা এজাহারে রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান পাঠান বাবুলসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এনআইডি জালিয়াতির অভিযোগে

এজাহারে অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান।

এজাহারে নাম থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে গত ২০ জুলাই চাকরিচ্যুত তিনজন, ইউপি চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল, কথিত নূর হালিমার পরিচয়দানকারী পিতা ওমর আলী এবং উপজেলা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মঞ্জুরুল মিয়া রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এর আগে গত ৭ অক্টোবর দৈনিক সংবাদ পত্র সমূহে কলমাকান্দায় তদন্তাধীন কয়েকটি এনআইডির নথিপত্র গায়েবের অভিযোগ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে কয়েকটি এনআইডির নথি খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। এর পর নতুন করে আলোচনায় আসে উপজেলা নির্বাচন অফিসের নথি সংরক্ষণ ও ভোটার নিবন্ধনপ্রক্রিয়া।

নির্বাচন অফিস-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত ১১ আগস্ট রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে অফিসের আইডি ব্যবহার করে নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমানের এনআইডি তৈরির কাগজপত্র সার্ভারে আপলোড করা হয়। ওই রাতে শুধু তাঁদের দুজনের তথ্যই আপলোড করা হয়েছিল বলে সূত্রটি জানিয়েছে। মুজিবুর রহমানের ফাইল নম্বর ১২১১৫০৭৯১। তাঁর ঠিকানা হিসেবে রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অফিসের আইডি ব্যবহার করে রাতে তথ্য আপলোড করেছিলেন কে, ওই আইডিতে কার কার প্রবেশাধিকার ছিল এবং আবেদনকারীদের পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করেছিলেন কারা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সংশ্লিষ্টরা। সার্ভার লগ, সিসিটিভি ফুটেজ ও নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করলে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমানের অভিযোগে পরিচ্ছন্নতাকর্মী মঞ্জুরুল মিয়ার নাম এসেছে। অভিযোগে তাঁর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহের পাশাপাশি অফিসের সিসিটিভি নষ্ট হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন। একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কীভাবে এনআইডি নিবন্ধনের কারিগরি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেলেন, নাকি অন্য কেউ তাঁর পরিচয় বা অফিসের আইডি ব্যবহার করেছেন—তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।

এজাহারভুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে দলটির সদস্য বলে জানা গেছে। অভিযোগের বিষয়ে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, “আমাদের ওয়েবসাইটে এসব তথ্য নেই। বাইরে থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন ও নাগরিকত্ব সনদ তৈরি করে নিতে পারে তারা।”

তবে সংশ্লিষ্ট সনদ কীভাবে তৈরি ও ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেগুলো ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ইস্যু করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ জুলাই তিনজন আউটসোর্সিং কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়। অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান ২ মার্চ বদলির সূত্রে কলমাকান্দায় যোগ দেন। তাঁর যোগদানের আগের সময়ের কিছু ভোটার নিবন্ধন নিয়েও তদন্ত চলছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। ফলে অনিয়মের সময়কাল, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব এবং চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্তের ভিত্তি খতিয়ে দেখা জরুরি।

কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল রানা দুজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা হলেন নেত্রকোনা সদর উপজেলার ধারিয়া গ্রামের আনিছ মিয়ার ছেলে কাঞ্চন মিয়া (২৯) এবং শেরপুর সদর উপজেলার দড়িপাড়া গ্রামের লাল মিয়ার ছেলে মঞ্জুরুল মিয়া।

এজাহারে নাম থাকা বা গ্রেপ্তার হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। এনআইডি নিবন্ধনের প্রতিটি ধাপে কার কী ভূমিকা ছিল, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা জরুরি।

Scroll to Top