পাঠ্যবই ছাপায় ২৫০ কোটি টাকা লুটের অভিযোগ, সময়মতো বই দিতে পারবে না ২৬ ছাপাখানা

আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিনা মূল্যের প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে ২৫০ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই সরবরাহ করতে পারবে না ২৬টি ছাপাখানা। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

পাঠ্যবই ছাপায়

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর ই-টেন্ডারে প্রাক্কলিত দর ফাঁস, সমঝোতার মাধ্যমে দরপত্র জমা এবং কাজ ভাগাভাগিতে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী মো. জাহাঙ্গীর আলমের মালিকানাধীন স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেডের এক ব্যবসায়িক অংশীদার এবং একটি ছাপাখানার মালিকের বিরুদ্ধে এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। ওই ব্যবসায়িক অংশীদারের পরিবারের চারটি ছাপাখানা এবারও সর্বোচ্চ কাজ পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ১০টি ছাপাখানার মালিককে ডেকে সতর্ক করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তাঁদের মধ্যে জাহাঙ্গীর আলমের আলোচিত ব্যবসায়িক অংশীদারও ছিলেন।

মন্ত্রী বলেন, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মানসম্মত সব পাঠ্যবই সরবরাহ করতে হবে। যারা তা পারবে না, তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে ডিসেম্বরে চীন থেকে বই ছাপিয়ে আনার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।

বৈঠকে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী মো. কাউসার-উজ-জামান রুবেলের কাছে বই ছাপানোর অগ্রগতি জানতে চান শিক্ষামন্ত্রী। জবাবে রুবেল বলেন, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৯৫ শতাংশ বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বাকি ৫ শতাংশ বই ছাপানোর জন্য তিনি সমিতির পক্ষ থেকে বাড়তি সময় চান।

তখন শিক্ষামন্ত্রী জানতে চান, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ বই সরবরাহ করা যাবে না কেন এবং এর যৌক্তিক কারণ কী। তবে রুবেল এ প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। বৈঠকে উপস্থিত আরেক ছাপাখানার মালিককে নিম্নমানের বই সরবরাহের কারণও জানতে চান মন্ত্রী। ওই মালিক ভবিষ্যতে এমনটি আর হবে না বলে অঙ্গীকার করেন। নভেম্বরের মধ্যে সব বই ছাপানো শেষ করতে মুদ্রণ সমিতিকেও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

গত বুধবারের মধ্যে ৫০ শতাংশ বই ছাপানোর লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে ছাপা হয়েছে ৩০ শতাংশের কম। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি বই ছাপানো সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিলম্বে বই ছাপানোর পেছনে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে বেশি মুনাফা করার প্রবণতা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শেষ পর্যায়ে বই যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ কম থাকায় এমনটি করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ করতে আগ্রহী চীন। এ জন্য এক বছরের সব পাঠ্যবই বিনা মূল্যে ছাপিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে দেশটি। পাঁচটি ছাপাখানার মালিকের আশঙ্কা, এক শ্রেণির ছাপাখানার অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতায় এ খাত বিদেশিদের হাতে চলে যেতে পারে। বর্তমানে এ খাতে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে।

দরপত্রে সিন্ডিকেট ও প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর অভিযোগ

অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, জাহাঙ্গীর আলমের ব্যবসায়িক অংশীদার শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি ও ছাপাখানার মালিকদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। দরপত্র কার্যক্রম চলাকালে প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর মতো বিধিবহির্ভূত ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, শুরুতে সরকার একটি প্রাক্কলিত দর নির্ধারণ করেছিল। সেই দর ফাঁস হওয়ার পর তা বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার চাপ দেন। পরে এনসিটিবি প্রাক্কলিত দর বাড়িয়ে দেয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীরব থাকে। এরপর ঠিকাদারেরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে দরপত্র জমা দেন এবং কাজ ভাগাভাগি করেন। এ প্রক্রিয়ায় ২৫০ কোটি টাকার বেশি অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করছেন, সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরির উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এসব করা হয়েছে। প্রতিযোগিতাহীন উচ্চমূল্যের দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০২৫ অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য সংগ্রহে এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দরপত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির আটটি, ষষ্ঠ শ্রেণির ১২টি, সপ্তম শ্রেণির ১০টি, অষ্টম শ্রেণির চারটি এবং নবম-দশম শ্রেণির ১১টিসহ মোট ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতে একক দরপত্র জমা পড়েছে, যা মোট দরপত্রের ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ১৩টিতে দুটি করে দরপত্র জমা পড়ে, যা ২৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ। বাকি দুটি দরপত্রে তিনটি করে প্রস্তাব জমা পড়ে, যা ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অথচ দেশে সহস্রাধিক ছাপাখানা রয়েছে।

জাহাঙ্গীরের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকা পাচারের মামলা

২০১০ সালে স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করে বিকাশের ডিস্ট্রিবিউশন ফ্র্যাঞ্চাইজি নেন জাহাঙ্গীর আলম। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির আড়ালে তিনি একাধিক সন্দেহজনক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করেন। কোম্পানির নামে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক পরিমাণ অর্থ জমা হয়, যার বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি এবং যা ব্যবসার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি ও জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিদেশে প্রায় ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রতিষ্ঠান গঠনের চার বছর পর সব সরকারের আমলে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত এক ছাপাখানার মালিক জাহাঙ্গীরের ব্যবসায়িক অংশীদার হন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জাহাঙ্গীর আলম যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। এরপর কোম্পানিটির ব্যাংক হিসাবের নিয়ন্ত্রণ পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ করা ওই ছাপাখানার মালিকের হাতে চলে যায় বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি অনুকূলে নেই বুঝতে পেরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেড থেকে সবকিছু গুটিয়ে নেন।

পিপিআর ২০২৫ লঙ্ঘনের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, দরপত্র কার্যক্রম চলমান অবস্থায় প্রাক্কলিত দর বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ নেই। বাজার যাচাই করে প্রাক্কলন কমিটি দর নির্ধারণ করে এবং তা অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়।

তাঁদের মতে, দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পর কোনো দরদাতা না পাওয়া গেলে নতুন করে দাপ্তরিক প্রাক্কলন তৈরি করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করতে হয়। অন্যদিকে, দরদাতারা প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দর দিলে বাজেটের সংস্থান সাপেক্ষে বাজার যাচাই করে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বেশি দরে কার্যাদেশ দেওয়া যেতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, এ ক্ষেত্রে দুটি প্রক্রিয়ার কোনোটিই অনুসরণ করা হয়নি।

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি ৪৪(২)-এ বলা হয়েছে, দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় বাস্তবসম্মত হওয়া সত্ত্বেও সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরপত্রের মূল্য প্রাক্কলিত ব্যয়ের বেশি হলে অথবা ক্রয় প্রক্রিয়ায় কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাবের প্রমাণ পাওয়া গেলে সব দরপত্র, প্রস্তাব বা কোটেশন বাতিল করা যেতে পারে।

দুদকের অভিযানের পর ব্যাকডেটে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ

দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগে গত মঙ্গলবার এনসিটিবিতে অভিযান চালায় দুদক। এ সময় সংস্থাটি দরপত্রের বেশ কিছু নথি সংগ্রহ করে। এরপর গত বুধবার এনসিটিবি অনানুষ্ঠানিকভাবে অধিকাংশ ছাপাখানার মালিককে ডেকে নেয়। তাঁদের কাছ থেকে প্রথম পর্যায়ের প্রাক্কলিত দর বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না—এমন বক্তব্য প্যাডে আগের তারিখ দেখিয়ে লিখিতভাবে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিষয়টির সত্যতা জানতে গতকাল রাতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফখরুল মাওলাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। অন্য কর্মকর্তারা ফোন ধরলেও এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

দরপত্র বিক্রি ও জমা দেওয়ার তথ্যেও বড় ব্যবধান দেখা গেছে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৩৪১ নম্বর লটে ২৪টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়ে দুটি। ৩৫৯ নম্বর লটে ২২টি বিক্রি হলেও জমা পড়ে দুটি এবং ৩৮৮ নম্বর লটে ১৭টি বিক্রি হলেও জমা পড়ে একটি।

ষষ্ঠ শ্রেণির ৬৫২ নম্বর লটে ১৯টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়ে একটি। ৬২১ নম্বর লটে ১৮টি বিক্রি হলেও জমা পড়ে একটি এবং ৬৩৪ নম্বর লটে ১৭টি বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র একটি।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিকের প্রতি ফর্মা মুদ্রণের গড় দর ৩ টাকা ৩২ পয়সা এবং প্রাথমিকের ক্ষেত্রে ৩ টাকা ৫৪ পয়সা। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিকের প্রতি ফর্মার গড় দর ছিল ২ টাকা ৩১ পয়সা এবং প্রাথমিকের ক্ষেত্রে ৩ টাকা ৪৪ পয়সা। ওই বছর কোনো একক দরপত্র জমা পড়েনি। বরং প্রতিটি দরপত্রের বিপরীতে ১০ থেকে ২৫টি পর্যন্ত দরপত্র জমা পড়েছিল।

২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিকের প্রতি ফর্মার প্রাক্কলিত দর ছিল ৩ টাকা ১৭ পয়সা। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ছাপাখানাগুলো গড়ে ২ টাকা ৩১ পয়সায় কাজ পেয়েছিল। এনসিটিবির প্রাক্কলিত দর ছাপাখানার মালিকেরা জানতে পারেননি এবং নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করতে পারেননি বলেই তখন প্রতিযোগিতামূলক দর পাওয়া সম্ভব হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজে বই ছাপানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র কার্যক্রম চলাকালে প্রাক্কলিত দর পরিবর্তনের মাধ্যমে ২৫০ কোটি টাকার বেশি অর্থের অনিয়ম করা হয়েছে।

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, দরপত্র কার্যক্রম চলার পর নতুন করে প্রাক্কলিত দর নির্ধারণের সুযোগ নেই। তাঁর মতে, এনসিটিবি আইনবহির্ভূত কাজ করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি জেনেও নীরব ছিল কেন, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তোফায়েল খান বলেন, দুদক এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়েছে। তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশা করেন। শিক্ষার্থীরা যেন বছরের প্রথম দিন মানসম্মত বই পায় এবং সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে না হয়, সেই প্রত্যাশাও জানান তিনি।

Scroll to Top