বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনে (বিএসএফআইসি) কৃষি বিভাগ ও কেন্দ্রীয় এস্টেট দপ্তরের দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন প্রশাসনিক অস্থিরতায় রূপ নিয়েছে। সংস্থার সচিব মো. মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে এস্টেট বিভাগের প্রতি পক্ষপাত দেখানো, জুনিয়র কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি ও পদায়নে সুবিধা দেওয়া এবং কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক অবস্থান দুর্বল করার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়ছে আখ চাষ, খামার ব্যবস্থাপনা, জমি পুনরুদ্ধার এবং চিনিকলগুলোর সামগ্রিক কার্যক্রমে।
বিএসএফআইসির অধীন চালু ও বন্ধ ১৫টি চিনিকলের হাজার হাজার একর জমির ব্যবস্থাপনা নিয়ে কৃষি ও এস্টেট বিভাগের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলছে। কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি, আখ চাষ ও খামার পরিচালনার পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতা তাঁদের হাতে থাকা উচিত। অন্যদিকে, এস্টেট বিভাগ জমির লিজ, দখলমুক্তকরণ এবং আইনি মালিকানা রক্ষার দায়িত্ব নিজেদের বলে মনে করে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এই বিরোধ নিরসনের পরিবর্তে সচিব মো. মুজিবুর রহমান এস্টেট বিভাগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। প্রশাসনিক ও এস্টেট শাখায় তুলনামূলক জুনিয়র কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার কারণেও অসন্তোষ বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিএসএফআইসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, কৃষি ক্যাডার ও চিফ এস্টেট অফিসারের পদমর্যাদা, জ্যেষ্ঠতা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগে একাধিক রিট এবং প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালে মামলা চলছে। করপোরেশন গত ২১ জুলাই একটি চূড়ান্ত জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশ করে। ওই তালিকা নিয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয় এবং কয়েকজন কর্মকর্তা আদালতের শরণাপন্ন হন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশনার পরও পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তারা সুবিধা পেয়েছেন। গত ১৮ জানুয়ারি পদোন্নতি এবং ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর বদলি ও নতুন পদায়নসংক্রান্ত কয়েকটি অফিস আদেশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব আদেশে সচিবের প্রভাব ছিল এবং এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তারা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেয়েছেন। খামার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়ে কৃষি ক্যাডারের আপত্তির পর কয়েকটি পদায়ন বর্তমানে মন্ত্রণালয় ও বিএসএফআইসি কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের প্রধান অভিযোগ পদোন্নতিতে বৈষম্য। তাঁদের দাবি, মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করেও কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ধীরগতির। বিপরীতে প্রশাসনিক ও এস্টেট শাখার কিছু জুনিয়র কর্মকর্তা দ্রুত উচ্চতর দায়িত্ব পাচ্ছেন।
চিফ এস্টেট অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আইনগত জ্ঞান বা নির্দিষ্ট প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার শর্ত থাকলেও কৃষি ক্যাডারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে অন্য বিভাগের তুলনামূলক জুনিয়র কর্মকর্তাদের চলতি বা অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই প্রশাসনিক বিরোধের প্রভাব এখন মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। চিনিকলের জমিতে সময়মতো আখ রোপণ, বিকল্প ফসল চাষ, খামার ব্যবস্থাপনা এবং অবৈধ দখলমুক্ত রাখার কার্যক্রমে ধীরগতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা আখ চাষ ও বীজ খামার তদারকি করেন। এস্টেট বিভাগ জমি লিজ, দখলদার উচ্ছেদ এবং আইনি নথি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে। দুই বিভাগের কাজের সীমারেখা স্পষ্ট না হওয়ায় একই জমিকে ঘিরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সংঘাত তৈরি হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সমন্বয়হীনতার কারণে সরকারের মূল্যবান জমি বেদখলের ঝুঁকিতে পড়ছে। একই সঙ্গে খামারের উৎপাদনশীলতাও কমছে। দীর্ঘদিন ধরে চলতি ও অতিরিক্ত দায়িত্বের সংস্কৃতির কারণে জ্যেষ্ঠতার কাঠামো দুর্বল হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তও আইনি জটিলতায় আটকে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কৃষি কর্মকর্তাদের একটি অংশ মাঠপর্যায়ের উৎপাদন বৃদ্ধির পরিবর্তে নিজেদের প্রশাসনিক অধিকার রক্ষায় সময় ব্যয় করছেন। অন্যদিকে, কৃষি খামার পরিচালনায় পর্যাপ্ত কারিগরি অভিজ্ঞতা না থাকা কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই বিরোধের কারণে চিনি উৎপাদন কমছে এবং করপোরেশনের লোকসান বাড়ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে উৎপাদন কমার নির্দিষ্ট পরিমাণ, আর্থিক ক্ষতি বা কোন সিদ্ধান্তের কারণে কতটা ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
সচিব মো. মুজিবুর রহমান তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তিনি কোনো পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন না। কৃষি ও এস্টেট বিভাগের কাজ আলাদা হলেও জমিকেন্দ্রিক কার্যক্রমে কিছু সমন্বয়হীনতা ও মতপার্থক্য রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দুই বিভাগের মধ্যে কোনো স্থায়ী প্রশাসনিক বিরোধ থাকতে দেওয়া হবে না এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে।
বিএসএফআইসির চলমান বিরোধ নিরসনে জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি, পদায়ন, খামার ব্যবস্থাপনা এবং এস্টেট প্রশাসনের দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি, আদালতের আদেশ, পদায়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ সম্ভব।


