বিসিআইসিতে সিন্ডিকেট ও বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ, শরীফুল আলমকে ঘিরে তদন্ত দাবি

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কর্মচারী প্রধান (সিওপি) আ ন ম শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গঠন, নিয়োগ ও বদলি-বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার এবং অনিয়মে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের রক্ষার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের একাধিক বিভাগ ও কারখানায় তাঁর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশাসন, বিপণন, হিসাব বিভাগ এবং বিভিন্ন কারখানার কিছু কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে। বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও পরে কিছু ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়োগ ও পদায়নের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যেসব পদে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী থাকার কথা, সেখানেও অনভিজ্ঞ বা অন্য বিভাগের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বদলি ও পদায়ন নিয়েও তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন পর্যায় থেকে আসা বদলি ও পদায়নের তদবিরের সঙ্গে নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তও যুক্ত করেন তিনি। এ কাজে সিইউএফএলে কর্মরত আরিফ নামের এক কর্মচারীকে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব আর্থিক লেনদেনের পক্ষে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট ব্যাংক নথি বা অর্থপ্রদানের প্রমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

শরীফুল আলমকে ঘিরে তদন্ত দাবি

বিসিআইসির প্রধান কার্যালয়ে নিজের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগও রয়েছে শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে। বিপরীতে তাঁর বলয়ের বাইরে থাকা কর্মকর্তাদের বদলি, চাপ এবং প্রশাসনিক হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাঁর বিরুদ্ধে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার দাবি, কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চলের কর্মকর্তাদের বিষয়ে শরীফুল আলম নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে কুমিল্লা অঞ্চলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

শরীফুল আলমের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে সিওপি পদে আসার অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’-এর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল এবং ‘হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু’ নামে একটি বইয়ের প্রকাশনা কার্যক্রমের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব রাজনৈতিক অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদনে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরামের সহসভাপতির পদ নিয়েও তাঁকে ঘিরে বিরোধ তৈরি হয়। ফোরামের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাঁর বিরুদ্ধে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগপত্র দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ফোরামের নেতাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক চাপ তৈরির অভিযোগও ওঠে।

প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কারখানাগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে প্রকৌশলীদের পরিবর্তে প্রশাসন ও হিসাব বিভাগের কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে টিএসপিসিএল, ডিএপিএফসিএল এবং সিইউএফএলের কয়েকটি পদায়নের পেছনে শরীফুল আলমের ভূমিকার অভিযোগ তোলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাঁর সিন্ডিকেটের অংশ বলেও দাবি করা হয়েছে।

আইসিটি বিভাগের নেতৃত্বেও প্রশাসন বিভাগের একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞ মুহাম্মদ সোলায়মানকে নিয়োগ শাখা থেকে সরিয়ে আইসিটিতে দেওয়ার মাধ্যমে নিয়োগ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ অন্যভাবে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

বিভিন্ন তদন্ত কমিটি গঠনেও শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের রক্ষায় তাঁর প্রতি নমনীয় কর্মকর্তাদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। আবার তাঁর সঙ্গে বিরোধ থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উড়ো চিঠি এবং প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে হয়রানির অভিযোগও করা হয়েছে।

বিসিআইসির মতো বৃহৎ রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, তদন্ত কমিটি এবং কারখানা ব্যবস্থাপনায় একই কর্মকর্তার প্রভাব নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নথিভিত্তিক তদন্তের দাবি রাখে। বিশেষ করে পদায়ন আদেশ, আর্থিক লেনদেন, তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

প্রতিবেদনটিতে আ ন ম শরীফুল আলমের এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো সরাসরি বক্তব্য উল্লেখ করা হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর সঙ্গে সেটিও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

Scroll to Top