৪ আগস্ট। হলিউডের সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা মেরিলিন মনরোর প্রয়াণ দিবস। আজও তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্ল্যাটিনাম স্বর্ণালী চুল, দুষ্টু হাসি আর সাদা পোশাকে সেই বিখ্যাত দৃশ্য। কিন্তু এই ঝলমলে এই গ্ল্যামার জীবনের আড়ালে তিনি ছিলেন এক ভীষণ সংবেদনশীল, সংগ্রামী এবং নিজেকে বারবার নতুন করে গড়ে তোলা এক নারী।
বিশ্বজুড়ে তিনি ছিলেন গ্ল্যামারের প্রতীক। অথচ তাঁর জীবনের গল্প ছিল নিরাপত্তাহীনতা, স্বপ্ন, ভালোবাসা, প্রত্যাখ্যান এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার এক দীর্ঘ যাত্রা।
নর্মা জিন থেকে মেরিলিন
১৯২৬ সালের ১ জুন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্ম নেন নর্মা জিন মর্টেনসন। তাঁর শৈশব ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। মা গ্ল্যাডিস মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ায় ছোটবেলা কেটেছে পালক পরিবার ও এতিমখানায়। স্থায়ী ঠিকানা বলতে কিছুই ছিল না।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে আবারও এতিমখানায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্তি পেতে প্রতিবেশী জেমস ডগার্টিকে বিয়ে করেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্বামী সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে নর্মা জিন একটি বিমান তৈরির কারখানায় কাজ শুরু করেন। সেখানেই এক সামরিক আলোকচিত্রীর ক্যামেরায় ধরা পড়েন তিনি। সেই একটি ছবি বদলে দেয় তাঁর জীবন।
মডেলিংয়ের দরজা খুলে যায়, আর সেখান থেকেই শুরু হয় হলিউডের পথে তাঁর যাত্রা।
নিজের হাতে গড়া এক কিংবদন্তী
১৯৪৬ সালে প্রথম স্টুডিও চুক্তি করেন তিনি। বাদামি চুল রাঙিয়ে নেন উজ্জ্বল প্ল্যাটিনাম স্বর্ণালী রঙে। নিজের নাম বদলে রাখেন মেরিলিন মনরো—যে নাম পরবর্তীতে হয়ে ওঠে বিশ্ব সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯৫০-এর দশকে নিয়াগারা, জেন্টলম্যান প্রিফার ব্লন্ডস, হাউ টু মেরি আ মিলিয়নিয়ার-এর মতো চলচ্চিত্র তাঁকে পৌঁছে দেয় বিশ্বখ্যাতির শীর্ষে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন হলিউডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের একজন।
পর্দার হাসি, ব্যক্তিগত জীবনের কান্না
বিশ্ব তাঁকে দেখেছে হাসিখুশি, প্রাণবন্ত ও আবেদনময়ী এক তারকা হিসেবে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন ছিল একেবারেই ভিন্ন।
বেসবল কিংবদন্তী জো ডিম্যাজিওর সঙ্গে তাঁর বিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও সেই সম্পর্ক এক বছরও টেকেনি। পরে নাট্যকার আর্থার মিলারকে বিয়ে করে তিনি নতুন জীবন শুরু করতে চেয়েছিলেন। মিলারের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে তিনি আশ্রয় খুঁজেছিলেন, কিন্তু সেই সম্পর্কও ভেঙে যায়।
বারবার ভালোবাসা হারিয়েছেন, আবার নিজেকেও নতুনভাবে গড়ার চেষ্টা করেছেন।
শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নন
অনেকের ধারণা, মেরিলিন মনরো ছিলেন কেবল স্টুডিও-নির্ভর এক গ্ল্যামার আইকন। বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
হলিউড স্টুডিওর কম পারিশ্রমিক ও একঘেয়ে চরিত্রের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মেরিলিন মনরো প্রডাকশনস প্রতিষ্ঠা করে তিনি হলিউডে নারীর ক্ষমতায়নের এক নতুন দিগন্ত খুলে দেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে নিজস্ব চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়া নারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য।
বাস স্টপ এবং দ্য প্রিন্স এন্ড দ্য শোগার্ল তাঁর অভিনয়ের নতুন দিক তুলে ধরে। পরে ‘সাম লাইক ইট হট’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার অর্জন করেন।
আলোয় থেকেও অন্ধকারে
সাফল্যের চূড়ায় থেকেও তিনি লড়েছেন তীব্র মানসিক চাপ, অনিদ্রা, মঞ্চভীতি এবং নিঃসঙ্গতার সঙ্গে। পৃথিবী তাঁকে চেয়েছিল সবসময় নিখুঁত, আকর্ষণীয় ‘মেরিলিন’ হিসেবে। কিন্তু সেই মুখোশের আড়ালে থাকা নর্মা জিন ছিলেন ভীষণ ক্লান্ত, ভঙ্গুর এবং ভালোবাসার খোঁজে থাকা একজন মানুষ।
কিংবদন্তীর অকাল প্রয়াণ
১৯৬২ সালের ৪ আগস্ট, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলেসের ব্রেন্টউডে নিজের বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন মেরিলিন মনরো। সরকারি তদন্তে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রা উল্লেখ করা হলেও, মৃত্যুকে ঘিরে নানা রহস্য ও বিতর্ক আজও মানুষের কৌতূহলের বিষয়। তবে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবন শেষ হলেও, তাঁর প্রভাব শেষ হয়নি।
কেন আজও মেরিলিন প্রাসঙ্গিক?
মেরিলিন মনরো শুধু একজন অভিনেত্রী নন। তিনি এমন এক নারীর প্রতীক, যিনি নিজের পরিচয় নিজেই নির্মাণ করেছিলেন। যার সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবিক দুর্বলতা, স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং আত্মমর্যাদার গল্প আজও পৃথিবীকে ভাবায়।
তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়- কিংবদন্তীদেরও ব্যক্তিগত বেদনা থাকে, আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষও নিঃসঙ্গ হতে পারেন। মৃত্যুর ছয় দশকেরও বেশি সময় পরও তাই মেরিলিন মনরো কেবল হলিউডের এক আইকন নন; তিনি এক চিরন্তন সাংস্কৃতিক প্রতীক, যার জীবন আলো-অন্ধকারের এক অবিস্মরণীয় উপাখ্যান। লেটমেট




