বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এক সর্বগ্রাসী আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে: আল জাজিরাকে মাহফুজ আনাম – DesheBideshe

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এক সর্বগ্রাসী আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে: আল জাজিরাকে মাহফুজ আনাম – DesheBideshe

ঢাকা, ১ ফেব্রুয়ারি – দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম মন্তব্য করেছেন যে বাংলাদেশে সাংবাদিকতা বর্তমানে এক ধরনের সর্বগ্রাসী আতঙ্কের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন যে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া মনোভাব থেকে সামান্যতম ভিন্ন মত প্রকাশ করলেই এখন আক্রমণের শিকার হওয়ার প্রবল আশঙ্কা কাজ করছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ‘দ্য লিসেনিং পোস্ট’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। মাহফুজ আনাম জানান বর্তমানে দেশের মূলধারার গণমাধ্যম অনেক বেশি স্বাধীন এবং এখানে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও বেশি হচ্ছে। গণমাধ্যমের স্বাধীন চিন্তাভাবনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান হলেও একইসঙ্গে সেই সর্বগ্রাসী আতঙ্কও বিরাজ করছে কারণ কোনো গোষ্ঠীর মতের বাইরে গেলেই হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়। তিনি স্বীকার করেন যে অনেক সময় শব্দচয়নেও তাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয় এবং ভাবতে হয় কোন শব্দটি ব্যবহার করা নিরাপদ হবে।

এই ভাবনাটি স্বাধীন গণমাধ্যম সংস্কৃতির পরিপন্থী হলেও পরিস্থিতির কারণে সেটাই এখন করতে হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দ্য ডেইলি স্টারের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে মাহফুজ আনাম বলেন যারা সরাসরি হামলা চালিয়ে ভবনে আগুন দিয়েছে তারা সম্ভবত এই পত্রিকার পাঠক নন। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে তাহলে তারা কেন এমনটা করেছে। তার মতে এটি ছিল সুপরিকল্পিত এবং এর পেছনে রাজনৈতিক ও আর্থিক উদ্দেশ্য ছিল। পাশাপাশি গণতন্ত্র ও বহুমতের স্বীকৃতি এবং ভিন্নমতকে সমর্থন করা উদার সাংবাদিকতার ঐতিহ্যকে বড় পরিসরে ধ্বংস করে দেওয়ার উদ্দেশ্যও হামলাকারীদের ছিল বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন প্রতিবেদনে যদি কোনো ভুল থাকে তবে সেটার সমালোচনা করা যেতে পারে কিন্তু পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ডেইলি স্টার ভবনে হামলার রাতটিকে ‘চরম আতঙ্কের’ রাত হিসেবে বর্ণনা করে তিনি জানান ভেতরে আটকে পড়া কর্মীদের নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল এবং তারা ফোনে বিদায় জানাচ্ছিলেন। মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেন বাংলাদেশে মত প্রকাশের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ফলে বিশ্বের অন্য দেশের মতোই এখানেও বিপুল পরিমাণ ভুয়া খবর ও ঘৃণামূলক বক্তব্য তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ ও হেয় প্রতিপন্ন করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কিছু রাজনৈতিক দল আলাদা টিম গঠন করে এর সুযোগ নিচ্ছে। তিনি আরও বলেন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কিছু বললে হঠাৎ করেই শত শত মানুষ গালি দিতে শুরু করে আবার ভালো বললে প্রশংসা করে যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রাজনৈতিক ব্যবহারের একটি প্রচলিত রূপ। তিনি উল্লেখ করেন যে ডেইলি স্টার ভবনে হামলার রাতে একজন ইনফ্লুয়েন্সার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্ররোচণামূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন। মাহফুজ আনাম অভিযোগ করেন যে তারা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডেইলি স্টারকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনোটিই প্রমাণিত হয়নি।

গণমাধ্যমের রাজনীতিকরণ জনআস্থা কমিয়ে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন বছরের পর বছর ধরে সাংবাদিকরা রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত হয়েছেন যা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পাঠকের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন শেখ হাসিনার পতনের অন্যতম কারণ ছিল তার সরকারের দমনমূলক চরিত্র এবং গণমাধ্যমের প্রতি বৈরী আচরণ। তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে বিগত ১৫ বছরের শাসনের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেন যা ভিন্নমতের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ার্ত পরিবেশ তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।

তিনি জানান শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে ৮৩টি মামলা করেছিলেন এবং প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার অভিযোগ আনা হয়েছিল। এছাড়াও বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়ে তাদের আয় কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং সংসদে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়েছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে ভবিষ্যৎ সরকারগুলো এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যমের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

এস এ এস / ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬



Scroll to Top