প্রথম প্রযোজনাতেই বাজিমাত, ডালাসে দর্শক মাতাল রঙ্গমঞ্চের ‘জ্বীন কফিল’ | চ্যানেল আই অনলাইন

প্রথম প্রযোজনাতেই বাজিমাত, ডালাসে দর্শক মাতাল রঙ্গমঞ্চের ‘জ্বীন কফিল’ | চ্যানেল আই অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসভিত্তিক নবগঠিত নাট্যদল রঙ্গমঞ্চ তাদের প্রথম প্রযোজনা হিসেবে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় মিসির আলী সিরিজের গল্প অবলম্বনে নির্মিত মঞ্চনাটক ‘জ্বীন কফিল’ সফলভাবে মঞ্চস্থ করেছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলটি জানিয়েছে, প্রথম প্রযোজনাটি নিয়ে দর্শকদের ব্যাপক আগ্রহ ছিলো, প্রদর্শনীতেও প্রচুর সাড়া পেয়েছেন।

গত ২০ ও ২১ জুন ডালাস চিলড্রেনস থিয়েটারে অনুষ্ঠিত দুটি প্রদর্শনীই ছিল সম্পূর্ণ হাউসফুল। দুই দিনে প্রায় ৭৫০ জন দর্শকের উপস্থিতি প্রবাসে বাংলা নাট্যচর্চার প্রতি আগ্রহ ও সম্ভাবনার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

মনস্তাত্ত্বিক রহস্য, বিশ্বাস-অবিশ্বাস এবং অতিপ্রাকৃত ঘটনাবলির আবহে নির্মিত ‘জ্বীন কফিল’ মূলত মিসির আলীর যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যায়। নাটকটির নাট্যরূপ দিয়েছেন মঞ্জুর চৌধুরী এবং নির্দেশনা দিয়েছেন ফরহাদ হোসেন।

প্রায় দশ মাসের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও মহড়ার মধ্য দিয়ে ৩০ জনেরও বেশি নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী ও কলাকুশলীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নির্মিত দুই ঘণ্টাব্যাপী এই নাটকটিতে আধুনিক মঞ্চপ্রযুক্তি, আলোক পরিকল্পনা, ডিজিটাল ব্যাকড্রপ, আবহসঙ্গীত এবং নাটকীয় দৃশ্য বিন্যাসের সমন্বয় ঘটানো হয়। ফলে দর্শকরা শুধু একটি নাটকই দেখেননি, বরং উপভোগ করেছেন ভিন্নমাত্রার ব্যতিক্রমধর্মী একটি পূর্ণাঙ্গ নাট্য-অভিজ্ঞতা।

নাটকের প্রধান চরিত্র মিসির আলীর ভূমিকায় অভিনয় করেন সাইফুল হক রুমি। লেখক চরিত্রে ছিলেন ফরহাদ হোসেন, ইমাম ইরতাজ উদ্দিন চরিত্রে মজুর চৌধুরী, লতিফা চরিত্রে নুসরাত তিন্নি এবং লেখকের বন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করেন শাহীন সাদাত। কথকের চরিত্রে অভিনয় করেন অনিলা গুহ নোলক। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন ফয়জুল বারী অপু, সোহানা মানসুর, সাবরিনা রেইন, তাসকীর আলী খান, সাবের হোসেন, তারেক চৌধুরী, ফারজানা মুস্তাফা আবদুল মালেক এবং আরো অনেকে। তাদের সকলের অভিনয় দর্শকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। এবং নাটকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দর্শকদের আবেগ, কৌতূহল ও মুগ্ধতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

প্রথম প্রযোজনাতেই বাজিমাত, ডালাসে দর্শক মাতাল রঙ্গমঞ্চের ‘জ্বীন কফিল’ | চ্যানেল আই অনলাইন

নাটকটির নেপথ্যেও ছিল শক্তিশালী একটি সৃজনশীল দল। নির্দেশনা, পান্ডুলিপি পরিমার্জন ও দৃশ্য বিন্যাস, পোষাক ও শিল্প নির্দেশনা, দৃশ্যপট পরিকল্পনা ও ডিজাইন, সার্বিক সমন্বয় এবং প্রযোজনা অধিকর্তার দায়িত্ব পালন করেন ফরহাদ হোসেন। আবহসঙ্গীত পরিচালনা করেন দেশের খ্যাতিমান সঙ্গীত পরিচালক মকসুদ জামিল মিন্টু। সহ-নির্দেশনা ও মঞ্চ ব্যবস্থাপনায় ছিলেন মারুনা রাহী। মঞ্চসজ্জায় তাসকীর আলী খান, রূপসজ্জায় মেরী চৌধুরী, আলোক নির্দেশনায় ইকবাল আনোয়ার, আলোক নিয়ন্ত্রণে আসিফ ইকবাল খান কাঁকন, প্রেক্ষাপট প্রক্ষেপণে তাসকিরুল ইসলাম নিবিড়, শব্দ বিন্যাস, সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণে রাজিব ইউসুফজাই এবং শব্দ সংযোজনে তানভীর আহমেদ। স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্বে ছিলেন কবিতা নাজ। তাঁকে সহায়তা করেন মোয়াজ্জেম পল, জহির ইসলাম সহ ২০ জনের একটি দল। প্রযোজনাটির শুরু থেকে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেন মেহের আফরোজ শাওন এবং মোহাম্মদ জুয়েল রানা। রঙ্গমঞ্চ দল গঠনের শুরুতেই দুটি অভিনয় কর্মশালা পরিচালনা করেন বাংলাদেশের বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ।

হল ভর্তি দর্শকদের পাশাপাশি দুটি প্রদর্শনীতেই উপস্থিত ছিলেন নাটকের পৃষ্ঠপোষক, শুভানুধ্যায়ী এবং কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। নাটক শেষে দর্শকদের দাঁড়িয়ে দীর্ঘ করতালি শিল্পী ও কলাকুশলীদের আবেগাপ্লুত করে। প্রদর্শনী শেষে উপস্থিত দর্শকরা নাটকটির গল্প নির্বাচন, অভিনয়, প্রযুক্তিনির্ভর মঞ্চ উপস্থাপনা এবং সামগ্রিক নির্মাণশৈলীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। অনেকেই এটিকে উত্তর আমেরিকার বাংলা নাট্যচর্চায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে অভিহিত করেন। অনেক দর্শক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাটকটির ভূয়সী প্রশংসা করেন।

নাটকের প্রথম দিনের প্রদর্শনীতে দর্শকসারিতে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দুই সন্তান বিপাশা আহমেদ এবং নুহাশ হুমায়ুন। তাদের উপস্থিতি নাট্যপ্রেমী দর্শকদের মধ্যে বিশেষ উৎসাহ ও আবেগের সৃষ্টি করে। পিতার সৃষ্ট জনপ্রিয় গল্পের মঞ্চরূপ প্রবাসের মঞ্চে উপভোগ করতে পেরে তারা আনন্দ প্রকাশ করেন। নাটক শেষে বিপাশা ও নুহাশ শিল্পী ও কলাকুশলীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তাদের এই উপস্থিতি ও উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য রঙ্গমঞ্চের শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য ছিল একটি বিশেষ প্রাপ্তি এবং অনুপ্রেরণা।

নাটকটির সফল মঞ্চায়ন সম্পর্কে রঙ্গমঞ্চের সভাপতি ও নির্দেশক ফরহাদ হোসেন বলেন, “রঙ্গমঞ্চের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি স্বপ্ন নিয়ে-প্রবাসে বাংলা নাট্যচর্চাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন। ‘জ্বীন কফিল’-এর এই অভূতপূর্ব সাড়া আমাদের সেই স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করেছে। দর্শকদের ভালোবাসা ও সমর্থন আমাদের ভবিষ্যতের পথচলার সবচেয়ে বড় প্রেরণা।”

তিনি আরও জানান, বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে যারা নাটকটি দেখতে পারেননি, তাদের কাছ থেকে পুনঃমঞ্চায়নের অনুরোধ ইতোমধ্যেই আসতে শুরু করেছে। দর্শকদের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে ডালাসের পাশাপাশি অস্টিন, সান অ্যান্টোনিও এবং হিউস্টনে নাটকটি মঞ্চায়নের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে রঙ্গমঞ্চ। তাছাড়া শিকাগো, ভার্জিনিয়া-ওয়াশিংটন ডিসি এবং নিউ ইয়র্কেও প্রদর্শনীর ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে।

প্রথম প্রযোজনার এমন সফল ও দর্শকনন্দিত মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে রঙ্গমঞ্চ শুধু একটি নাটক উপহার দেয়নি; বরং প্রবাসে বাংলা নাট্যচর্চার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

Scroll to Top