পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের যে গল্পগুলো অনেকেই জানেন না | চ্যানেল আই অনলাইন

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের যে গল্পগুলো অনেকেই জানেন না | চ্যানেল আই অনলাইন

ব্রাজিলকে সবাই চেনে। হলুদ জার্সির বুকে পাঁচটা তারা, আর পেলে, রোনাল্ডো, রোনালদিনহো, নেইমারদের নাম সবারই জানা। কিন্তু এই চেনা ব্রাজিলের পেছনে এমন কিছু গল্প আছে, যা অনেকেই জানেন না।

আপনি কি জানেন, এক সময় ব্রাজিল সাদা জার্সি পরে মাঠে নামত? কিংবা একটা বিশ্বকাপ ফাইনালের দিন দুপুরে দলের সবচেয়ে বড় তারকা হঠাৎ হাসপাতালে চলে গিয়েছিলেন, আর সেই রহস্য আজও মেলেনি? অথবা বিশ্বকাপ জেতার পর সতেরো বছরের একটা ছেলে মাঠেই শিশুর মতো কেঁদে ফেলেছিল, যাকে পরে দুনিয়া ফুটবলের রাজা বলে ডেকেছে?

১৪ জুন রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন ব্রাজিল মরক্কোর বিপক্ষে ষষ্ঠ শিরোপার অভিযান শুরু করবে, গ্যালারির হলুদ সমুদ্রের আড়ালে আসলে লুকিয়ে থাকবে এই গল্পগুলোই। ম্যাচ দেখতে বসার আগে চলুন, একটু ঘুরে আসি সেই গল্পের ভেতর।

যে হার ব্রাজিলকে হলুদ জার্সি পরতে বাধ্য করল

১৯৫০ সাল, রিও ডি জেনেইরো। সদ্য বানানো মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় দুই লাখ মানুষ। সেদিন ব্রাজিল সাদা জার্সি পরে নেমেছিল, কারণ তখন সাদা-নীলই ছিল তাদের রং। উরুগুয়ের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে ড্র করলেই শিরোপা। পুরো দেশ ধরেই নিয়েছিল কাপ জেতা হয়ে গেছে, পরদিনের পত্রিকা ছাপা হয়ে গিয়েছিল ‘ব্রাজিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’, উদযাপনের গানও তৈরি।

তারপর ব্রাজিল এগিয়ে গেল ১-০ গোলে, গ্যালারি ফেটে পড়ল। কিন্তু উরুগুয়ের শিয়াফিনোর গোলে সমতা, আর শেষ দিকে গিগিয়ার সেই গোল মারাকানার দুই লাখ মানুষকে বোবা করে দিল। স্টেডিয়াম এত নীরব হয়ে গেল যে, মাঠের নাকি নিঃশ্বাসও শোনা যাচ্ছিল! সেই দিনটার নাম ‘মারাকানাজো’। মারাকানায় সেদিন ২-১ গোলে শুধু একটা ম্যাচ হারেনি ব্রাজিল, হারিয়েছিল একটা দেশের আত্মবিশ্বাস।

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের যে গল্পগুলো অনেকেই জানেন না | চ্যানেল আই অনলাইনক্ষতটা এত গভীর ছিল যে গোটা জাতি দোষ খুঁজতে গিয়ে দোষ চাপাল সাদা জার্সির ঘাড়ে, এ জার্সি নাকি অশুভ। তিন বছর পর এক পত্রিকা নতুন জার্সির প্রতিযোগিতা ডাকল, যেখানে থাকবে পতাকার চারটি রং। জিতলেন উনিশ বছরের এক তরুণ ডিজাইনার, ‘আলদির গার্সিয়া শ্লে’। তার আঁকা সেই হলুদ জার্সি, সবুজ পাইপিং, নীল হাফপ্যান্ট। মজার কথা, ছেলেটি থাকতেন উরুগুয়ের সীমান্ত ঘেঁষা শহরে আর মনে মনে নাকি উরুগুয়েকেই পছন্দ করতেন। অর্থাৎ ব্রাজিলের সবচেয়ে দামী জার্সি ডিজাইন হয়েছিল এমন একজনের হাতে, প্রতিপক্ষের জন্য যার মনে একটু জায়গা ছিল। আজকের যে হলুদ দেখে প্রতিপক্ষের বুক কাঁপে, তার জন্ম হয়েছিল এক ঐতিহাসিক পরাজয় থেকে।

সতেরো বছরের যে ছেলেটি কেঁদেছিল

১৯৫৮, সুইডেন। ব্রাজিল তখনো বিশ্বকাপ জেতেনি, ঘাড়ের ওপর মারাকানার ভূত। সেই দলে ছিল সতেরো বছরের এক রোগা ছেলে, যাকে কোচরা প্রথমে খেলাতেই চাননি, ভেবেছিলেন বয়স বড্ড কম। ছেলেটার নাম এদসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো, দুনিয়া তাকে চিনবে পেলে নামে।

বাকিটা রূপকথা। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিতে হ্যাটট্রিক, সুইডেনের বিপক্ষে ফাইনালে দুই গোল, যার একটায় বুক দিয়ে বল নামিয়ে ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে তুলে ভলি। ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ডে ব্রাজিল ৫, সুইডেন ২, আর ছেলেটা সতীর্থের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদছে শিশুর মতো। সেদিন কেউ ভাবেনি, কাঁদতে থাকা এই ছেলেটাকেই একদিন গোটা পৃথিবী ‘ফুটবলের রাজা’ বলে ডাকবে।

ইতিহাস কি এর চেয়ে সুন্দর দল দেখেছে

কেউ কেউ বলেন, এত সুন্দর দল ফুটবল মাঠে আর কখনো নামেনি। ১৯৭০-এর মেক্সিকো, ব্রাজিলের সেই দল। হলুদ জার্সির দল এমন আয়েশে খেলছে যেন এ ফাইনাল নয়, কোনো সাধারণ ম্যাচ। বল যেন তাদের পায়ে আঠার মতো লেগে থাকত, আর একেকটা পাস আর ড্রিবলিংয়ে গ্যালারি গর্জে উঠত যেন গোলই হয়ে গেছে।

পেলে তখন আর কাঁদতে থাকা কিশোর নন, পরিণত এক বিশ্ব তারকা। সেবার তিনি এমন দুটো জিনিস করার চেষ্টা করেছিলেন, যা গোল না হয়েও আজও মানুষ মনে রেখেছে, মাঝমাঠ থেকে গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে শট আর ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে বল না ছুঁয়ে অন্য পাশ দিয়ে ঘুরে আসা। দুটোই অল্পের জন্য বাইরে। আর ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে দলগত সেই গোল, প্রায় গোটা দল বল ছুঁয়ে শেষে পেলের পাস, আর ঝড়ের বেগে ছুটে এসে অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তোর বুলেট শট, যাকে অনেকে আজও বলেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের নিখুঁততম গোল। এই দল একটা ম্যাচও হারেনি, জিতেছিল এমন ভঙ্গিতে যে হারলেও বোধহয় কেউ অভিযোগ করত না।

যে দল না জিতেও অমর

ফুটবলে কিছু দল আছে, যারা ট্রফি জেতেনি অথচ মানুষের মনে গেঁথে আছে চ্যাম্পিয়নদের চেয়েও গভীরে। ১৯৮২-র স্পেনে ব্রাজিল ছিল ঠিক তেমন। অধিনায়ক সক্রেটিস পেশায় ডাক্তার, রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেন, দার্শনিকের মতো ভাবতেন, আর মাঠে খেলতেন এক অলস সৌন্দর্যে। সঙ্গে জিকো, ফালকাও, এদের। এদের বল নিয়ে কারুকাজ দেখতে মানুষ টিভির সামনে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে থাকত।

কিন্তু এই দলের একটাই সমস্যা, এরা শুধু জিততে চাইত না, সুন্দর খেলতে চাইত। দ্বিতীয় রাউন্ডে ইতালির বিপক্ষে ড্র করলেই চলত, অথচ তারা আক্রমণ করেই গেল। আর ওপাশে পাওলো রোসি নামের এক স্ট্রাইকার, কিছুদিন আগেও নিষেধাজ্ঞায় ছিলেন, হঠাৎ জ্বলে উঠে করলেন হ্যাটট্রিক। ব্রাজিল হারল ৩-২ গোলে। মজার কথা, এই হার ব্রাজিলিয়ানরা আজও যত আবেগ নিয়ে বলে, কিছু শিরোপার কথাও বোধহয় তত নিয়ে বলে না। কারণ ওই দলটা ফুটবলটাকে ভালোবেসেছিল ফল ভোলার মতো করে।

একটা গোল, একটা সদ্যোজাত আর একটা দোলনা

আরেকটি বিজয়ের গল্প, ১৯৯৪ সালে আমেরিকা। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গোল করে বেবেতো দৌড়ে গিয়ে শুরু করলেন এক অদ্ভুত উদযাপন, দুই হাত সামনে এনে যেন কোলে শিশু দোলাচ্ছেন, সঙ্গে যোগ দিলেন রোমারিও আর মাজিনহো। কারণটা কী? ম্যাচের কদিন আগেই বেবেতোর ঘরে ছেলে এসেছে। সেই সদ্যোজাতকেই গোটা দুনিয়ার সামনে শুভেচ্ছা জানালেন তিনি।

একটা গোলের উদযাপন কীভাবে তিন দশক টিকে থাকে, এই দোলনাই তার প্রমাণ। সেবার চব্বিশ বছরের খরা কাটিয়ে ব্রাজিল শিরোপাও জিতেছিল।

ফাইনালের সকালে রোনাল্ডোর রহস্য

এবার সেই গল্প, যা নিয়ে তর্ক আজও থামেনি। ১৯৯৮, ফ্রান্স। ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় তারকা তখন একুশ বছরের রোনাল্ডো। ফাইনালে স্বাগতিকদের বিপক্ষে নামার কয়েক ঘণ্টা আগে দলের জমা দেওয়া তালিকায় তার নামই ছিল না। তারপর হঠাৎ নতুন তালিকা, রোনাল্ডো খেলছেন।

পেছনের গল্পটা ভয়ংকর। শোনা যায়, দুপুরে হোটেল রুমে রোনাল্ডোর শরীরে কিছু একটা হয়েছিল, কেউ বলেন খিঁচুনি, কেউ বলেন ভয়াবহ চাপ। তাকে হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা করা হলো, তারপর সেই অসুস্থ ছেলেটাই মাঠে নামলেন। মাঠে নামলেন বটে, কিন্তু তিনি যেন তিনি ছিলেন না, ছায়ার মতো ঘুরলেন।

ব্রাজিল হারল ৩-০ গোলে, জিদান একাই দুই হেডে শেষ করে দিলেন। সেই দুপুরে রোনাল্ডোর আসলে কী হয়েছিল, তার পুরো সত্যি বোধহয় কোনোদিনই জানা যাবে না।

দুই দাঁতওয়ালা ছেলেটার প্রত্যাবর্তন

রোনাল্ডোর গল্প অবশ্য ওই হারে শেষ হয়নি। এরপর তার দুই হাঁটুতে এমন চোট যে ডাক্তাররাই সন্দেহ করছিলেন, তিনি আর কোনোদিন স্বাভাবিকভাবে দৌড়াতে পারবেন কিনা। বছরের পর বছর অপারেশন, পুনর্বাসন, মানুষের করুণা মেশানো চাহনি।

তারপর ২০০২, কোরিয়া-জাপান। সেই ভাঙা হাঁটুর, খরগোশের মতো সামনের দুই দাঁতের হাসিমুখ ছেলেটা ফিরলেন আগুন হয়ে। গোটা টুর্নামেন্টে আট গোল, ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে দুই গোল, যে অলিভার কান গোটা আসরে দুর্ভেদ্য ছিলেন, তাকেই দুবার পরাস্ত করলেন। চার বছর আগে ফাইনালে ছায়া হয়ে ঘোরা ছেলেটাই এবার গোটা দেশের কান্না হাসিতে বদলে দিলেন।

সেবার মাথায় একটা হাস্যকর ছাঁটও দিয়েছিলেন, সামনে একগোছা চুল রেখে বাকিটা ফাঁকা। পরে স্বীকার করেছিলেন, ওই ছাঁট দিয়ে তিনি ইচ্ছে করেই সবার মনোযোগ চোটের দুশ্চিন্তা থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, মানুষ চুল নিয়ে হাসুক, তার শরীর নিয়ে যেন প্রশ্ন না তোলে।

সাত আর এক (সেভেন আপ)

এবার সেই গল্প, যা ব্রাজিলিয়ানরা আজও পুরোটা বলতে চায় না। ২০১৪, ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ, গোটা দেশ ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্নে বিভোর। সেমিফাইনালে বেলো হরিজন্তেতে জার্মানির বিপক্ষে নামল ব্রাজিল, চোটের কারণে নেইমার নেই, নিষেধাজ্ঞায় অধিনায়ক থিয়াগো সিলভাও নেই।

তারপর যা হলো, তা ম্যাচ ছিল না, ছিল একটা জাতির সামনে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়া। মাত্র এগারো মিনিটে জার্মানি দিল চার গোল। গ্যালারিতে হলুদ জার্সি পরা মানুষ মুখে হাত দিয়ে কাঁদছিলেন, বাচ্চারা বাবার কোলে মুখ লুকাচ্ছিল। রোবটের মতো গোল করেই যাচ্ছিল জার্মানরা, ম্যাচ শেষ হলো ৭-১ গোলে। ১৯৫০-এর ‘মারাকানাজো’-র মতো এই দিনটারও নাম হয়ে গেল ‘মিনেইরাজো’। আজও কোনো ব্রাজিলিয়ানের সামনে ‘৭-১’ বললে তার মুখটা কুঁচকে যায়।

কিছু হার স্কোরলাইন থাকে না, ইতিহাস হয়ে যায়। আর বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কোমল পানীয় ‘সেভেন আপ’ এর আদলে ট্রলের শিকার হন ব্রাজিল ফ্যানরা।

লাকি জার্সি আর কিছু বিস্ময়কর রেকর্ড

এত আবেগের ফাঁকে একটু মজা। বিশ্বকাপে ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের কুসংস্কার নিয়ে আস্ত বই লেখা যায়, কেউ সবসময় ডান পা আগে দিয়ে মাঠে ঢোকেন, কেউ লাকি ভেবে গোটা টুর্নামেন্ট একই মোজা না ধুয়ে পরেন, কেউ মাঠে ঢুকে ঘাস ছুঁয়ে চুমু খান। দুনিয়ার সেরা ফুটবলাররাও তাই ভাগ্যের প্রশ্নে আমাদের মতোই অসহায়।

আর রেকর্ডের কথা যদি বলি, ১৯৩০ সালের প্রথম আসর থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বকাপে খেলেছে একমাত্র ব্রাজিলই, একটাও বাদ যায়নি। পাঁচটা শিরোপা, যা সবচেয়ে বেশি। আর পেলে একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি তিনটি বিশ্বকাপজয়ী দলের অংশ। এসব শুধু সংখ্যা নয়, এ এক দেশের সঙ্গে ফুটবলের গাঁটছড়া, যেখানে ফুটবল প্রায় একটা ধর্ম।

আর বাংলাদেশে কেন এত ব্রাজিল

এবার ঘরের কথা। সাও পাওলো থেকে প্রায় পনেরো হাজার কিলোমিটার দূরের একটা দেশে, যেখানে ফুটবল মাঠের চেয়ে ধানক্ষেত বেশি, সেখানে বিশ্বকাপের সময় ছাদে ছাদে হলুদ-সবুজ পতাকা ওড়ে কেন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে একটা প্রজন্মের ছেলেবেলায়। ১৯৯৪-এ রোমারিও, ১৯৯৮-এ রোনালদোর উত্থান আর রহস্যময় ফাইনাল, ২০০২-এ ভাঙা হাঁটুর রোনালদোর ফিরে এসে শিরোপা জেতা, এসব দেখে দেখেই বাংলাদেশের মানুষ ব্রাজিলের প্রেমে পড়ে। যে কিশোরটি ২০০২-এ টিভির সামনে চিৎকার করেছিল, সে আজ বাবা, তার ছেলেও এখন হলুদ জার্সি পরে। এর মাঝে রোনালদিনহো এসে আগুনে ঘি ঢাললেন, তার দুই গাল ভরা হাসি আর পায়ের জাদু দেখে গোটা একটা প্রজন্ম ব্রাজিলের প্রেমে পড়ল চিরতরে।

এই ভালোবাসা কতটা গভীর, তা টের পাওয়া যায় প্রতি বিশ্বকাপেই। ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা, এই এক প্রশ্নে কত পরিবার যে দুই ভাগ হয়ে যায়। এক ভাই হলুদ, আরেক ভাই আকাশি-সাদা, হারলে কয়েকদিন কথা বন্ধ। কোনো গ্রামে আবার কেউ জমি বা গরু বেচা টাকায় কয়েক কিলোমিটার লম্বা পতাকা বানিয়ে ফেলেন, পুরো রাস্তা ঢেকে যায় হলুদ-সবুজে, সেই ছবি ছাপা হয় খোদ ব্রাজিলের পত্রিকায়। সাও পাওলোর মানুষ অবাক হয়ে ভাবে, ভাষা মেলে না, আবহাওয়া মেলে না, এমন একটা দূরের দেশের মানুষ আমাদের জন্য পাগল কেন। আসলে ব্রাজিলের সৌন্দর্যের প্রতি দুর্বলতাটাই বাঙালির মনের সঙ্গে মিলে যায়, তাই এখানে ব্রাজিল প্রায় দ্বিতীয় জাতীয় দল।

রাতে নতুন স্বপ্নের শুরু

আর সেই গল্পের ধারাবাহিকতাতেই ১৪ জুনের রাত। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শক্তিশালী মরক্কোর বিপক্ষে শুরু হচ্ছে ষষ্ঠ শিরোপার অভিযান। কিন্তু এবারের গল্পটা একটু অন্যরকম, কারণ ২০০২ সালের পর ব্রাজিল আর বিশ্বকাপ জেতেনি। চব্বিশ বছর। এই সময়ে একটা গোটা প্রজন্ম বড় হয়ে গেছে, যারা ব্রাজিলকে কখনো বিশ্বকাপ জিততে দেখেনি। পাঁচ তারার দেশে এই খরা তাই শুধু একটা পরিসংখ্যান নয়, এ এক জাতির বুকে জমে থাকা অপেক্ষা, যা প্রতি চার বছরে নতুন করে জ্বলে ওঠে।

এবারের দলও ইতিহাস গড়েই মাঠে নামছে, তবে অন্যভাবে। কার্লো আনচেলত্তি হতে চলেছেন বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম বিদেশি কোচ। বাছাইপর্বটাও সহজ ছিল না, এই ফরম্যাট চালুর পর এবারই সবচেয়ে বাজে, পঞ্চম হয়ে শেষ করেছে তারা। তার ওপর প্রথম ম্যাচেই কঠিন পরীক্ষা, মরক্কো বর্তমান আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন আর গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট। মাঠের এক কোণে আবার দারুণ লড়াই, মরক্কোর হাকিমির সঙ্গে ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুসের বাঁ প্রান্তের দ্বৈরথ।

তবু এই দলে ভিনিসিয়ুস, রাফিনিয়ার মতো আক্রমণভাগ আছে, অভিজ্ঞ নেইমার দলে থাকলেও তাকে পাওয়া যাবে না এ ম্যাচে। গায়ে আছে সেই হলুদ জার্সি, যার জন্ম এক পরাজয় থেকে, যা পরে পেলেকে কাঁদিয়েছে, রোনাল্ডোকে ফিরিয়েছে, গোটা প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। তাই মাঠে শুধু এগারোজন থাকবে না, থাকবে মারাকানার নীরবতা, ৭০-এর সেই গোল, সক্রেটিসের অলস সৌন্দর্য, রোনাল্ডোর ভাঙা হাঁটু আর ৭-১ গোলে হারের ক্ষত, গোটা একটা ইতিহাস। নতুন গল্পটা কেমন হবে জানতে অপেক্ষা করতেই হবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, ব্রাজিল মাঠে থাকা মানেই গল্প তৈরি হওয়া, জয় হোক বা পরাজয়।

Scroll to Top