এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত ছিল ‘মোদি-দিদি গোপন সমঝোতা’ তত্ত্ব। এই তত্ত্বের সমর্থকদের দাবি ছিল, বিজেপি কখনোই সত্যিকারের অর্থে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আন্তরিক ছিল না; বরং রাজনৈতিক নাটকীয়তার অংশ হিসেবেই বিরোধিতা করেছে।
কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজেপি ২০৭টি আসন জিতে টিএমসিকে ৮০ আসনে নামিয়ে আনার পর সেই ধারণা কার্যত ভেঙে পড়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল এই জয়ের পরও বিজেপি হয়তো চাইবে না টিএমসি পুরোপুরি ভেঙে পড়ুক। কারণ দলটির সম্পূর্ণ পতন পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের নতুন করে রাজনৈতিক জায়গা করে দিতে পারে, যে আদর্শের বিরুদ্ধে বিজেপি ও সংঘ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে আদর্শিক লড়াই চালিয়ে এসেছে।
একসময় পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচিত টিএমসি এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলটির বহু জনপ্রতিনিধি দল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও গুঞ্জন ছড়িয়েছে।
বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খান দেশটির সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, প্রায় ৫০ জন টিএমসি বিধায়ক এবং ২০ জন সাংসদ বিজেপিতে যোগ দিতে আগ্রহী। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনুমোদন দিলে তারা দল পরিবর্তন করবেন। তার দাবি, এসব নেতাকে দলে নিলে টিএমসি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কার্যত বিলীন হয়ে যেতে পারে।
একই সময়ে বিভিন্ন পৌরসভা থেকে প্রায় ১০০ জন টিএমসি কাউন্সিলর পদত্যাগ করেছেন বলেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এতে পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় সরকার কাঠামোয় বিজেপির প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলকাতা হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়দীপ সেনের মতে, টিএমসি কখনোই সুসংগঠিত রাজনৈতিক আদর্শভিত্তিক দল হয়ে উঠতে পারেনি।
তার ভাষায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে কংগ্রেসের বিরোধিতা করে দল গঠন করেন এবং পরে নিজেদের বামবিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে দলটি বিজেপিবিরোধী পরিচয়ে নিজেদের দাঁড় করায়। কিন্তু কোন স্পষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ ছাড়া শুধুই বিরোধিতার রাজনীতিতে দাঁড়িয়ে থাকা দল শেষ পর্যন্ত ভাঙনের মুখে পড়তে বাধ্য।
বর্তমানে দলত্যাগের প্রবণতা, মামলা-মোকদ্দমা এবং গ্রেপ্তারের চাপের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলকে একত্রে ধরে রাখা এবং বিরোধী রাজনীতির জায়গা বামদের হাতে চলে যেতে না দেওয়া।
বামপন্থীদের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা
প্রথম দৃষ্টিতে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা খুব শক্তিশালী মনে না হলেও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট জোট মাত্র দুটি আসন পেয়েছে-একটি সিপিএম এবং অন্যটি অল ইন্ডিয়া সেক্যুলার ফ্রন্টের দখলে যায়। এর আগে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন, ২০২১ সালের বিধানসভা এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট কার্যত শূন্য ছিল।
তবে ২৪ মে ফলতা উপনির্বাচনের ফল নতুন রাজনৈতিক ইঙ্গিত দিয়েছে। সেখানে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পান্ডা এক লাখের বেশি ভোটে জয় পেলেও সিপিএম সমর্থিত প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মি দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসেন। অন্যদিকে টিএমসি চতুর্থ স্থানে নেমে যায়।
এই ফলাফলের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, টিএমসিবিরোধী ভোটের একটি অংশ এবার বামদের দিকে সরে গেছে।
দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি মূলত বিজেপি বনাম টিএমসির দ্বিমুখী লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে ফলতা উপনির্বাচনের ফল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতি বিশ্লেষক অয়ন গুহর মতে, শুধু ফলতা নয়, বিধানসভা নির্বাচনে টিএমসির বড় পরাজয়ও সিপিএমের জন্য নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তার মতে, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে, ফলে একটি সুস্পষ্ট বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক পরিসর সবসময় থাকবে। টিএমসির দুর্বলতা ও জনঅসন্তোষের কারণে এই বিরোধী জায়গা ভবিষ্যতে সিপিএম বা সিপিএম-কংগ্রেস জোটের দিকে ঝুঁকতে পারে।
অয়ন গুহ আরও বলেন, ডানপন্থী রাজনীতির বিস্তার অনেক সময় বাম রাজনীতির প্রতিক্রিয়াশীল উত্থানের ক্ষেত্রও তৈরি করে। টিএমসি বাম রাজনীতির ভাষা ও আন্দোলনের কৌশল আংশিকভাবে গ্রহণ করলেও প্রকৃত বামপন্থী রাজনীতির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখেনি। একই সঙ্গে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিকে উৎসাহ দেওয়াও ঐতিহ্যগত বাম রাজনীতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি করেছে।
বিজেপি-আরএসএসের জন্য অস্বস্তিকর সমীকরণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বামদের প্রত্যাবর্তন বিজেপির জন্য আদর্শিকভাবে অস্বস্তিকর হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থী রাজনীতিকে নিজেদের প্রধান মতাদর্শিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে বিজেপি ও সংঘ পরিবার।
আরএসএস ঘনিষ্ঠ লেখক রতন শারদা এক লেখায় দাবি করেছিলেন, কমিউনিস্টরা ভারতের ঐতিহ্য, শাসনব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বহু ইতিবাচক দিককে দুর্বল করেছে, বিপরীতে আরএসএস ভারতীয় সভ্যতার মূল্যবোধ রক্ষায় কাজ করেছে।
এক জ্যেষ্ঠ আরএসএস নেতাও অতীতে মন্তব্য করেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হলেও বামপন্থীরাই প্রকৃত শত্রু। তার মতে, টিএমসির শাসন যতই বিতর্কিত হোক না কেন, বামপন্থীরা ক্ষমতায় ফিরলে তার প্রভাব শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশের ওপর পড়তে পারে।
ফলে পশ্চিমবঙ্গে টিএমসির দুর্বলতা বিজেপির রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করলেও দলটির সম্পূর্ণ পতন বিজেপির জন্য নতুন আদর্শিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, যেখানে বহু বছর পর আবারও আলোচনায় ফিরতে পারে বাম রাজনীতি।





