কর্মক্ষেত্রে নারী কেবিন ক্রুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার অভিযোগে দায়ের করা এক দশক পুরোনো মামলা ৪৫ লাখ কানাডীয় ডলারে নিষ্পত্তি করতে সম্মত হয়েছে কানাডার বিমান পরিবহন সংস্থা ওয়েস্টজেট। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া আদালতের এক বিচারক গত সোমবার কয়েক মাসের দরকষাকষির পর সমঝোতার চূড়ান্ত শর্ত অনুমোদন করেন।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, মামলাটি করেছিলেন ওয়েস্টজেটের সাবেক কেবিন ক্রু ম্যান্ডালেনা লুইস। তার অভিযোগ, এক পাইলট তাকে এবং তার এক সহকর্মীকে যৌন নিপীড়ন করলেও প্রতিষ্ঠানটি ওই পাইলটকে ফ্লাইট পরিচালনার দায়িত্বে বহাল রাখে। এতে অন্যান্য কর্মীরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
আদালতের অনুমোদিত সমঝোতা অনুযায়ী, আইনি ফি ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ মামলার আওতাভুক্ত ৩ হাজার ৪৫২ জন নারী কেবিন ক্রুর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। সমঝোতার অংশ হিসেবে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি নিয়ে স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা চালাতে একটি তৃতীয় পক্ষ নিয়োগে সম্মত হয়েছে ওয়েস্টজেট।
এই পর্যালোচনায় যৌন হয়রানির ব্যাপ্তি, এ ধরনের ঘটনা গোপন রাখা বা রিপোর্ট না করার প্রবণতা এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার উপায় খতিয়ে দেখা হবে। তবে মামলাকারীদের উত্থাপিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি চূড়ান্ত সমঝোতায় স্থান পায়নি। এর মধ্যে রয়েছে পাইলটদের জন্য বাধ্যতামূলক যৌন হয়রানিবিরোধী প্রশিক্ষণ, অভিযোগের বিষয়ে ওয়েস্টজেটের অপরাধ স্বীকার এবং কর্মীদের সঙ্গে করা চুক্তি লঙ্ঘনের দায় স্বীকার।
২০১৬ সালের এপ্রিলে ওয়েস্টজেটের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করেন লুইস। যদিও সমঝোতা হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন তিনি, একই সঙ্গে এর অর্থমূল্য নিয়ে হতাশাও জানিয়েছেন। তার মতে, দুই বছর আগে ব্যাগেজ ফি-সংক্রান্ত একটি মামলায় ওয়েস্টজেটকে ১ কোটি ২৫ লাখ ডলার দিতে হয়েছিল। সেই তুলনায় যৌন হয়রানির মামলার সমঝোতার অর্থ অনেক কম।লুইস বলেন, মামলা শেষ হওয়ায় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন, তবে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে তিনি ‘ক্লান্ত ও হতবিহ্বল’। তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সমঝোতার অর্থকে ভালো ফলাফল হিসেবেই বিবেচনা করা যায়।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার আইন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওয়েস্টজেটে কর্মরত সব নারী কেবিন ক্রুকে মামলার আওতায় আনা হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল, কর্মীদের হয়রানিমুক্ত কর্মপরিবেশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে ওয়েস্টজেট চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়ার পর যথাযথ তদন্ত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
লুইসের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে ২৫ বছর বয়সে হাওয়াইয়ের মাউই এলাকায় অবস্থানকালে ওয়েস্টজেটের এক পাইলট তাঁকে যৌন নিপীড়ন করেন। আদালতে জমা দেওয়া নথিতে তিনি দাবি করেন, একই পাইলট এর আগে ২০০৮ সালে আরেক নারী কেবিন ক্রুকে যৌন হয়রানি করেছিলেন।
ঘটনাটি ওয়েস্টজেট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানান লুইস। কিন্তু অভিযোগের পরও ওই পাইলটকে দায়িত্বে বহাল রাখা হয় বলে তার দাবি। অন্যদিকে ২০১৬ সালে ‘ঔদ্ধত্য ও শৃঙ্খলাভঙ্গের’ অভিযোগে লুইসকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।লুইস আরও অভিযোগ করেন, তিনি মাউই পুলিশের কাছে যৌন নিপীড়নের ঘটনাটি জানিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে ওয়েস্টজেট কৌশলে ওই পাইলটের ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন করে বলে তার অভিযোগ।
কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির ব্যাপকতার বিষয়টিও মামলায় উঠে এসেছে। ২০১৮ সালে ইউএস অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টসের এক জরিপে ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি কেবিন ক্রুর মধ্যে ৬৮ শতাংশ কর্মী তাদের কর্মজীবনে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
লুইসের অভিযোগ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা কিংবা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত না করার বিষয়ে ওয়েস্টজেট বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেনি। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি শুধু জানিয়েছে, উভয় পক্ষের সম্মতিতে সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরে তারা সন্তুষ্ট। একই সঙ্গে কর্মীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।


