সেপ্টেম্বরে ১৫ দিনে মৃত্যু ৬৭

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও দ্রুত বাড়ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নির্ধারিত শয্যার বাইরে মেঝে ও বারান্দায় রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও একটি শয্যায় একাধিক রোগীকে রাখার ঘটনাও ঘটছে। এর মধ্যেই এক দিনে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তির সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৩ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৪ জনে। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৫ দিনেই মারা গেছেন ৬৭ জন।
একই সময়ে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৫৬৬ জন। চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৫ হাজার ১৬৩ জন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৫০ হাজার ৯৪১ জন।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৭১ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১৩২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৮৩ জন।
ঢাকার বাইরে বরিশালে ১৫৯, চট্টগ্রামে ১৬৫, খুলনায় ২৯০, ময়মনসিংহে ৮২, রাজশাহীতে ১৩৭, রংপুরে ৬৫ এবং সিলেটে ৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
অর্থাৎ রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিভাগেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে শুধু ঢাকার হাসপাতাল নয়, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতেও বাড়ছে চাপ।
রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, নির্ধারিত শয্যার বাইরে মেঝে ও বারান্দায় রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ৬০টি নির্ধারিত শয্যার বিপরীতে সোমবার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১৮৭ জন।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি শয্যায় একাধিক রোগীকেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এতে রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ওষুধ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নূরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর চাপ বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত শয্যা, চিকিৎসক ও নার্স প্রয়োজন।
শুধু মুগদা নয়, রাজধানীর আরও কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালেও নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ায় শয্যা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। গুরুতর রোগীদের নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন স্বজনরা।
মাতুয়াইলের বাসিন্দা নুরজাহান বেগমের ২০ বছর বয়সী নাতনি জাহিন এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গুতে ভুগছেন। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার চেষ্টা করেন স্বজনরা।
নুরজাহান বেগম বলেন, তিন-চারটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ঘুরেও শয্যা পাননি। শেষ পর্যন্ত মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় জাহিনকে। তবে শয্যা না থাকায় মেঝেতেই তার চিকিৎসা চলছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় দুদিন আগের পরিসংখ্যানে। সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আটজনের মৃত্যু হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি হন ১ হাজার ৭৩৩ জন। চলতি বছর এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর হিসাবে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর আগস্টে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই মাসে ২০ হাজার ৫৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ৪৩ জন।
তবে সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধেই ৬৭ জনের মৃত্যু হওয়ায় মাসের শুরুতেই মৃত্যুর সংখ্যা আগস্টের পুরো মাসের মৃত্যুকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ডেঙ্গুর বর্তমান প্রবণতার মধ্যে অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার।
রাজধানীর একটি হোটেলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক সেমিনারে তিনি বলেন, তাদের পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
এডিস মশার আচরণ নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, বিভিন্ন সময় পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এডিস মশা রাতেও কামড়ায়। শীতকালে কিউলেক্স মশা বেশি চোখে পড়লেও এডিস মশা তুলনামূলক কম দেখা যায়। এতে মানুষ এডিস মশাকে অবহেলা করতে পারে।
তার মতে, মশার আচরণ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশে ১২৬ প্রজাতির মশা রয়েছে এবং এর মধ্যে সাত থেকে আট প্রজাতির মশার কলোনি রয়েছে বলেও জানান তিনি।
রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় সরকারি হাসপাতালগুলোর শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালেও রোগী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় শয্যা বা সুযোগ-সুবিধার সংকট হলে প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালে রোগী পাঠিয়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। সক্ষমতা অনুযায়ী হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু রাজধানী নয়, ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি এমন এলাকাগুলোতে উপজেলা পর্যায়েও চিকিৎসাব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়েই ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চায় স্বাস্থ্য বিভাগ।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে রোগী সামলানোর পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে চলছে, তা নিয়েও। কারণ হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
একই সেমিনারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই সহজ নয়। তার ভাষ্য, রোগটি পুরোনো হলেও এর বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করা বাস্তবে কঠিন।
এখন ডেঙ্গু মোকাবিলায় একদিকে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, অন্যদিকে এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৫ দিনে ৬৭ মৃত্যু এবং হাসপাতালে ভর্তির দ্রুত ঊর্ধ্বগতি পরিস্থিতির চাপের মাত্রা দেখাচ্ছে। এর মধ্যে অক্টোবরে সংক্রমণ আরও বাড়ার পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে হাসপাতালগুলোর বর্তমান সক্ষমতা কতটা চাপ সামলাতে পারবে, সেটিই সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…