ছোট সাঁকো পেরোলেই কাশফুলের মেলা – Sarabangla

ছোট সাঁকো পেরোলেই কাশফুলের মেলা – Sarabangla

গল্প, কবিতা, গান কিংবা পৌরাণিক নাটকে ‘বৃন্দাবন’ নামটি শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। স্মৃতির অ্যালবামে নামটি যেন ভালোবাসার কোনো এক দূর আকাশের ছবি আঁকে। কিন্তু ব্যস্ত ইট-কাঠের ইট-পাথরের রাজধানী ঢাকাতেই যে বাস্তবের এক ‘বৃন্দাবন’ লুকিয়ে আছে, তা অনেকেরই অজানা! শহরের একঘেয়ে জীবন থেকে একটু মুক্তি পেতে, গ্রামীণ হাওয়া আর প্রকৃতির স্বাদ নিতে ঘুরতে আসা ভ্রমণপিপাসুদের নতুন গন্তব্য এখন এই স্থানটি।

মিরপুর ১২ নম্বর ডিওএইচএস-এর ঠিক পাশেই এবং উত্তরা-দিয়াবাড়ীর সংযোগস্থলে অবস্থিত এই বৃন্দাবন মাঠ। তবে সেখানে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতাটাও কম রোমাঞ্চকর নয়! মূল রাস্তা থেকে সরু ঢালু পথ ধরে হেঁটে পার হতে হয় একটি ছোট বাঁশের সাঁকো। কাঠ-বাঁশের কাঁপুনির সেই সাঁকোটি পার হতেই যেন বদলে যায় দৃশ্যপট। ইট-কাঠের কোলাহল একনিমেষে উধাও, চোখের সামনে ভেসে ওঠে দিগন্ত বিস্তৃত খোলা সবুজ প্রান্তর। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে গ্রামীণ আবহের টিনের চালের ঘর, যা ঢাকার ব্যস্ত জীবনে এক টুকরো অজপাড়াগাঁয়ের অনাবিল আনন্দ ছড়িয়ে দেয়।

মাঠের ঠিক পাশেই রয়েছে ছোট্ট একটি শান্ত পুকুর। টলটলে জলের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে কাশফুল আর সবুজ ঘাসের সার। বিশেষ করে শরতের এই দিনগুলোতে বৃন্দাবনের রূপ নেয় এক রূপকথার মতো। মাঠে ফুটে আছে ধবধবে সাদা কাশফুল। হাওয়ায় দোল খাওয়া সেই শুভ্র কাশবন দেখলে মনে হয়, যেন নীল আকাশের নরম মেঘেদের দল নেমে এসেছে এই ধূলিমাখা পৃথিবীতে!

ছোট সাঁকো পেরোলেই কাশফুলের মেলা – Sarabangla

বিকেলের সোনাঝরা রোদে কাশবনে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে ছবি তুলতে এসেছিলেন ধানমন্ডির বাসিন্দা তানজিল ও তার স্ত্রী। মুগ্ধতা লুকিয়ে না রেখে তিনি বললেন, ‘নাটক-সিনেমায় বৃন্দাবনের কথা কত শুনেছি! কিন্তু ঢাকার বুকেই এমন একটা নাম আর এত চমৎকার প্রকৃতির মেলবন্ধন পাব, ভাবিনি। ছোট সাঁকোটা পার হওয়ার পরেই মনে হলো হঠাৎ কোনো গ্রামে চলে এলাম। আর শরতের কাশফুলগুলো তো মনটাই ভালো করে দিল!’

প্রথমবার এই বৃন্দাবনে ঘুরতে আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অনন্যা রহমান বলেন, ‘বন্ধুদের মুখে শুনে আজ প্রথম এলাম। সত্যি বলতে সাঁকোটা পার হওয়ার সময় একটু ভয় পাচ্ছিলাম, কিন্তু মাঠে পা রাখতেই সব ভয় আর ক্লান্তি উবে গেছে। ঢাকার এত কাছে যে এমন বিশাল খোলা মাঠ আর কাশফুল পাওয়া যায়, না দেখলে বিশ্বাসই হতো না!’

এখানে আসার অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো সূর্যাস্তের ছোঁয়া। বিকেল গড়িয়ে দিনমণি যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, তখন রক্তিম সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ে পুকুরের জল ও দিগন্তজোড়া কাশবনে। সূর্য ডুব দেওয়ার মুহূর্তটিতে চারপাশের প্রকৃতি যেন এক মোহনীয় ক্যানভাসে রূপ নেয়। আর সূর্য ডোবার পর যখন মিষ্টি গোধূলির আলো পেরিয়ে আলতো সন্ধ্যা নামে, তখন বাতাসের গুঞ্জন আর ধীরগতির নিস্তব্ধতায় চারপাশ এক অদ্ভুত মায়াবী রূপ ধারণ করে। শহরের কোলাহল দূরে রেখে সন্ধ্যার এই ছায়াময় স্নিগ্ধতা মনের সব ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে যায়।

শুধু বড়দের জন্যই নয়, শিশুদের জন্যও এলাকাটি এক স্বপ্নের জগৎ। বিনোদনের জন্য এখানে বসানো হয়েছে নাগরদোলা, রকিং হর্স বা সাম্পান দোলনা এবং সাধারণ দোলনা। শিশুরা যখন আনন্দে মেতে ওঠে, তখন মাঠের চারপাশে জমে ওঠে মেলাপ্রাঙ্গণের আবহ। রয়েছে ফুচকা, চটপটি, পানিপুরি, আর ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের পসরা। বন্ধুদের আড্ডায় মেতে ওঠার পাশাপাশি বিশেষ এই মুহূর্তগুলোকে স্মৃতি ফ্রেমে বন্দি করতে দেখা যায় ভ্রাম্যমাণ আলোকচিত্রীদের। মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকায় একেকটি তাজা ছবি তুলে হাতে পাওয়ার সুযোগটা ছাড়েন না অনেকেই।

একটু এগিয়ে গেলে বৃন্দাবনের আরেক রূপ চোখে পড়ে। উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরের ই-ব্লকে অবস্থিত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অত্যন্ত পবিত্র ও শান্ত উপাসনালয় ‘শ্রী শ্রী রাধারমণ মন্দির (ইসকন)’। স্থানীয়দের কাছে মন্দিরটি বৃন্দাবন মন্দির নামেই পরিচিত। প্রতিদিন সকাল ৭:৩০ থেকে দুপুর ১:০০ এবং বিকেল ৪:০০ থেকে সন্ধ্যা ৭:৩০ পর্যন্ত মন্দিরটি খোলা থাকে। মন শান্ত করতে ও প্রার্থনা জানাতে প্রতিদিনই বহু ভক্ত ও দর্শনার্থীর আগমন ঘটে এই মন্দিরে।

এছাড়া ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত কোরবানির ঈদেও এই এলাকার রূপ ভিন্ন মাত্রা পায়। প্রতি বছর ঈদ উপলক্ষে উদয়ন থেকে বিজিএমইএ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ খালি জায়গায় প্রাকৃতিক পরিবেশে বসে ঐতিহ্যবাহী ‘উত্তরা বৃন্দাবন পশুর হাট’।

যাতায়াত ও রোমাঞ্চকর অটোরিকশা সফর: নিজস্ব গাড়ি বা মোটরসাইকেল না থাকলেও চিন্তার কিছু নেই। এখানে রয়েছে প্রচুর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। অটোরিকশায় চেপে যখন দু’পাশের ঘন কাশবনের ঝাড় পার হয়ে মাঝখানের সরু পাকা পথ ধরে এগিয়ে যাবেন, তখন বাতাস এসে দোলা দেবে চুলে। দুই পাশে দোল খাওয়া সাদা কাশফুলের মাঝে দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে অটোরিকশায় ঘুরে বেড়ানো সত্যি এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। মিরপুর ১২ নম্বর ডিওএইচএস গেইট কিংবা উত্তরা দিয়াবাড়ি—যেকোনো দিক থেকেই সহজে অটোরিকশা পেয়ে যাবেন।

তবে এলাকাটি বেশ নিবিড় ও প্রাকৃতিক হওয়ায় এবং সন্ধ্যার পর চারপাশ নিরিবিলি হয়ে যাওয়ায়, বিকেলের মিষ্টি রোদ ও সূর্যাস্তের সৌন্দর্য উপভোগ করে সন্ধ্যার পরপরই ফিরে আসা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

যান্ত্রিক শহরের ক্লান্তিকর ব্যস্ততা ভুলে বিকেলের স্নিগ্ধ বাতাসে মন ভাসাতে চাইলে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন ঢাকার এই অনন্য ‘বৃন্দাবন’ থেকে।

Scroll to Top