প্রথম আলো :
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে দুই বছর ধরে বহু ধরনের বয়ান ও ভাষ্য তৈরি হয়েছে। যেমন জুলাই অভ্যুত্থান নাকি বিপ্লব? এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
সৈয়দ নিজার: আমার মতে, এটি নিঃসন্দেহে একটি অভ্যুত্থান। কারণ, অভ্যুত্থান সব সময় শুরু হয় একটি ‘না’ বা অস্বীকারের মধ্য দিয়ে। পক্ষান্তরে বিপ্লব শুরু হয় ‘হ্যাঁ’ বা একটি ইতিবাচক বিকল্প প্রস্তাবনার মাধ্যমে।
বিপ্লবের দুটি ধরন আমরা ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে লক্ষ করি। একটি হলো ফরাসি বিপ্লবের প্যাটার্ন, যেখানে আগে থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামো ছিল না; বিভিন্ন অংশের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ ছিল। আন্দোলনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কিছুটা আদর্শিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল। এটি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অত্যন্ত প্রাণবন্ত একটি সময়। দ্বিতীয় ধরনটি হলো বলশেভিক, চীনা বা ইরানি বিপ্লবের মতো, যা একটি সুনির্দিষ্ট দল এবং আগে থেকে নির্ধারিত আদর্শিক কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তা মূলত একটি অভ্যুত্থান। তবে এই ‘না’ বা প্রত্যাখ্যান যদি ভবিষ্যতে একটি ‘হ্যাঁ’ বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হয়, তবেই তা বিপ্লবে রূপান্তরিত হবে।
এই অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতাকে জৈন দর্শনের ‘অনেকান্তবাদ’ বা ‘অন্ধের হাতি দেখা’র গল্পের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। প্রত্যেকেই এই বিশাল ঘটনাকে তার নিজের অবস্থান ও পরিচিত গণ্ডি থেকে একেকভাবে অনুভব করেছেন। কোনো ব্যক্তিকে ‘অভ্যুত্থান কারা করেছে’ প্রশ্ন করলে তিনি মূলত তাঁর সঙ্গে যাঁদের যোগাযোগ ছিল, তাঁদের কথা বলবেন। ফলে কোনো ব্যক্তি যখন কাউকে মাস্টারমাইন্ড বলেন, অথবা কোনো রাজনৈতিক দলকে কৃতিত্ব দিতে চান, তখন বুঝতে হবে কাদের সঙ্গে ওই ব্যক্তির সম্পর্ক ছিল। কারণ, গণ–অভ্যুত্থান স্বতঃস্ফূর্ত, সুপরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয় না।
তবে অভ্যুত্থান নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বড় জটিলতা হলো এর ‘মাংসপেশি’ ও ‘হাড়গোড়’-এর পার্থক্য করা। আন্দোলনের সময় যে বিশাল জনসমুদ্র বা ‘মাস’ দেখা যায়, তা হলো ‘মাংসপেশি’। অভ্যুত্থান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সাধারণ জনতা উধাও হয় বা করে ফেলা হয়, কিন্তু রয়ে যায় কেবল ‘হাড়গোড়’। এই হাড়গোড়গুলো হচ্ছে সংগঠিত শক্তি। সেটা রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিকও হতে পারে। সাধারণত এই সংগঠিত শক্তিই অভ্যুত্থানের ফসল ভোগ করে থাকে। পরবর্তী সময়ে অভ্যুত্থান নিয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে কেবল এই সংগঠিত হাড়গুলোই আমাদের নজরে আসে। ফলে আমাদের সত্যভ্রম হয়। মনে হয় কেবল বুঝি সংগঠিত শক্তিই আন্দোলনের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন করেছে! কিন্তু এর নেপথ্যে থাকা সাধারণ মানুষের বিশাল ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের দিকটি তখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা সব সময়ই আংশিক, এর প্রকৃত সত্য কেবল সাংগঠনিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
সাধারণ জনতা মূলত এসেছিল নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং সহমর্মিতা থেকে। অন্যদিকে, বিভিন্ন সংগঠনের রাজপথে নামার পেছনে কাজ করে একটি সুনির্দিষ্ট ‘আদর্শিক কাঠামো’। ফলে এখন কেবল সংগঠিত শক্তিগুলোকে দেখতে পাওয়া গেলেও সাধারণ মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল, তাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না।
প্রথম আলো :
দ্বিতীয়ত, এটাকে অনেকেই দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্বাধীনতা হিসেবে অভিহিত করেছেন। আপনি এটাকে কীভাবে দেখছেন?
সৈয়দ নিজার: আমি মনে করি, স্বাধীনতা বা ‘ইনডিপেনডেন্স’ মূলত স্বায়ত্তশাসন বা স্বরাজ অর্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৪৭ সালে এই অঞ্চলের মানুষ ইংরেজ ঔপনিবেশিক শক্তির বদলে নিজেদের শাসন কায়েম করেছিল। এটা ছিল স্বাধীনতার একটি উদাহরণ। ১৯৭১ সালেও বাঙালিরা অনুভব করেছিল যে একটি নিজস্ব রাষ্ট্রকাঠামো থাকলে তারা অনেক ভালো ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারবে। এটাও আরেক স্বাধীনতা।
কিন্তু ২০২৪ সালের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে যারা শাসন করছিল এবং যারা নিপীড়িত হয়েছে—উভয় পক্ষই এ দেশেরই মানুষ। এখানে সরাসরি কোনো বহিরাগত শাসক ছিল না। তাই একে ‘স্বাধীনতা’ না বলে অন্যভাবে দেখা প্রয়োজন।
এখানে আমাদের দুটি ধারণা বুঝতে হবে, যা নিয়ে আলোচনা কম হয়—তা হলো ‘অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব’ এবং ‘বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব’। বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব মানে হলো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বিদেশি শক্তি হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। আর অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব হলো নিজ দেশের জনগণের ওপর ক্ষমতাচর্চার আইনি ভিত্তি। এর মূল শর্ত হলো নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র সেই নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে উল্টো নাগরিকের ওপর নগ্ন দমনমূলক শক্তি প্রয়োগ করছে। এ সংকটটি কোনো সাময়িক ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রের গভীরে প্রোথিত একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। যাঁরা একে কেবল ‘সরকার পরিবর্তন’ বা ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ হিসেবে দেখতে চান, তাঁরা মূলত রাষ্ট্রের এই কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্বহীন করে তুলছেন।
সৈয়দ নিজার: আমি মনে করি, এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে বুঝতে হলে আমাদের দুটি তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যবহার করা প্রয়োজন, ‘বিমানবিকীকরণ’ এবং ‘বিরাজনৈতিকীকরণ’। বিমানবিকীকরণ বলতে বোঝাচ্ছি নাগরিকের মানবিক সত্তা ও তার অধিকারগুলোকে রাষ্ট্র কর্তৃক অস্বীকার করা। প্রচলিত মানবাধিকারের ধারণা মূলত ব্যক্তিগত অধিকার এবং নির্দিষ্ট কিছু তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করে, এটি সংকটের ‘কার্যকারণ’ অনুসন্ধান করে না। অন্যদিকে বিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে তার মানবিক মর্যাদা থেকে বিচ্যুত করে। এই নিবর্তনমূলক ব্যবস্থার ইতিহাস বেশ পুরোনো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নিয়মিত সরকারের অধীনে জুলাই মাসে নজিরবিহীন মাত্রার হত্যাযজ্ঞ দেখেছি।
পাশাপাশি বিরাজনৈতিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিকদের যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড রুদ্ধ করা হয়েছে। শুরুতে রাজনৈতিক দলগুলো এই নিপীড়নের শিকার হলেও পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইনের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকেও এর আওতাভুক্ত করা হয়েছে। বিরাজনৈতিকীকরণ প্রক্রিয়ার ফলে গত এক দশকে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে। বিগত রেজিমে ধীরে ধীরে ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রশাসন ও পুলিশ। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের ‘সংসদ সদস্যদের’ও জনপরিসরে প্রশাসনিক খবরদারি নিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে।
এই বিরাজনৈতিকীকরণের কারণেই অভ্যুত্থানে প্রচলিত বড় দলগুলোর পরিবর্তে ছোট সংগঠনগুলো নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। যখন একটি সমাজে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা রুদ্ধ করা হয়, তখন কেবল এই ধরনের ছোট গোষ্ঠীগুলোই সক্রিয় হয় না, বরং উগ্র ও চরমপন্থী মতাদর্শের বিকাশের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। গত দেড় দশকের শাসনামলে আমরা বিরাজনৈতিকীকরণের এই ভয়াবহ ফলাফলকেই স্পষ্টভাবে লক্ষ করেছি। দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পমেয়াদি—উভয় দিক থেকেই বিমানবিকীকরণ ও বিরাজনৈতিকীকরণ ছিল অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ।



