প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বিএনপি নেতার খোলা চিঠি

দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা, জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করে রাজপথে থাকা বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীরা আজ অবহেলিত ও অসহায় এমন অভিযোগ তুলে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বদরুল খায়ের চৌধুরী। তার দাবি, দলের দুঃসময়ে ত্যাগ স্বীকার করা নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ এখন সাংগঠনিকভাবে উপেক্ষিত। অন্যদিকে, সুবিধাজনক সময়ে দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া একটি অংশের প্রভাব বাড়ছে বলে তৃণমূলের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে নিজের ভেরিফাইড ফেইসবুক পেইজে তারেক রহমানের উদ্দেশে লেখা এক খোলা চিঠিতে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বদরুল খায়ের চৌধুরী। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য।

চিঠিতে তিনি তারেক রহমানকে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের আস্থার ঠিকানা ও আশার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নেতা-কর্মীরা তার নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাস রেখে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করেছেন।

‘তারেক রহমান মানেই আগামীর বাংলাদেশ’ এই প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বহু নেতা-কর্মী দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। তবে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার মিল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বদরুল খায়ের চৌধুরী বলেন, দলের দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন অবহেলা ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দল ক্ষমতার কাছাকাছি কিংবা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলে যাদের গুরুত্ব পাওয়ার কথা, তাদেরই অনেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে উপেক্ষিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

খোলা চিঠিতে বদরুল খায়ের চৌধুরীর সবচেয়ে জোরালো প্রশ্ন ছিল দলের চেয়ারম্যান কি তৃণমূলের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত? তার অভিযোগ, বিএনপির তৃণমূল সংগঠন সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়া নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন না করা হলে দল সাংগঠনিক ভিত্তি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

জেলা বিএনপির এ নেতা মনে করেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশপ্রেম, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রত্যয় এবং দলকে শক্তিশালী করার চিন্তাভাবনা মাঠপর্যায়ের সব নেতা সমানভাবে অনুসরণ করছেন না। ফলে দলের ঘোষিত আদর্শ ও সাংগঠনিক বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।

চিঠিতে তিনি লেখেন, তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা তারেক রহমানের ওপর আস্থা রেখেই দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন।

তাদের প্রত্যাশা ছিল, তার নেতৃত্বে দলের ভেতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে, ত্যাগী নেতা-কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন হবে এবং সাংগঠনিক অব্যবস্থাপনার অবসান ঘটবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় তৃণমূলের অনেকের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে বলে দাবি তার।

শুধু তৃণমূলের অবহেলার অভিযোগ নয়, দল ও সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন বদরুল খায়ের চৌধুরী। তিনি লিখেছেন, বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ, বিভিন্ন মহল এবং সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে বিএনপি ও সরকারকে ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠছে, সেগুলোর সবই এক কথায় উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

চিঠিতে তিনি অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা আমলা যে পর্যায়েরই হোন না কেন, তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন। দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থেই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এ বক্তব্যের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দলের সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখতে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন, নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তারেক রহমানের কাছে নিজের বক্তব্য সরাসরি তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেছেন বদরুল খায়ের চৌধুরী। তার আশঙ্কা, দলের একজন অবহেলিত কর্মী হিসেবে চেয়ারম্যানের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়া কঠিন হতে পারে। তারপরও তিনি হাল ছাড়তে রাজি নন।

চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, সুযোগ পেলে বাস্তব পরিস্থিতির তথ্য-প্রমাণ এবং দলের ভেতরে সংঘটিত বলে তার দাবি করা বিভিন্ন অনিয়মের বিবরণ তারেক রহমানের সামনে তুলে ধরবেন। তার প্রত্যাশা, এসব বিষয় দলীয় নেতৃত্বের নজরে এলে তৃণমূলের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।

জেলা বিএনপি নেতা বদরুল খায়ের চৌধুরীর এই খোলা চিঠি বিএনপির তৃণমূলের মূল্যায়ন, নেতৃত্বের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের দূরত্ব এবং দলীয় জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। তার বক্তব্যে একদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রয়েছে, অন্যদিকে দলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভ ও হতাশাও স্পষ্ট।

Scroll to Top