
ছবি: বিশ্ব শান্তি দিবস (সংগৃহীত)।
একটি যুদ্ধ থেমে গেলে শুধু গোলাগুলির শব্দই থামে না; থেমে যায় মানুষের ঘর হারানোর আতঙ্ক, স্বজন হারানোর কান্না, শিশুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎও। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও না কোথাও যুদ্ধ ও সংঘাত চলতেই থাকে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মানুষের স্বপ্ন, বাস্তুচ্যুত হয় পরিবার, সংকটে পড়ে খাবার ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। বিশ্বজুড়ে ‘বিশ্ব শান্তি দিবস’ নামেও পরিচিত এই দিনটির মূল বার্তা; যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।
জাতিসংঘ ঘোষিত এ দিবসের অন্যতম লক্ষ্য হলো যুদ্ধরত অঞ্চলগুলোতে সংঘাত বন্ধের পরিবেশ তৈরি করা, যাতে সেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়। শান্তি যে শুধু যুদ্ধ না থাকার নাম নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও সহাবস্থানের ভিত্তি; দিবসটি সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮১ সালে। ওই বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিহীন বিশ্বের লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। যুক্তরাজ্য ও কোস্টারিকার উদ্যোগে আনা প্রস্তাবের ভিত্তিতে সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর দিনকে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তখন নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ছিল না। পরে ২০০১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৫৫/২৮২ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ২১ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ২০০২ সাল থেকে প্রতিবছর এই দিনেই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
প্রতিবছর জাতিসংঘের নিউইয়র্ক সদর দপ্তরে ‘শান্তির ঘণ্টা’ বাজানোর মধ্য দিয়ে দিবসটির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে জাপানে জাতিসংঘের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলো ১৯৫৪ সালে ঘণ্টাটি উপহার দেয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশুদের দেওয়া ধাতব মুদ্রা গলিয়ে তৈরি করা হয়েছিল ঘণ্টাটি। এর মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশের শিশুদের মুদ্রা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ঘণ্টাটি শুধু একটি প্রতীকী বস্তু নয়; যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং শান্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও এটি মনে করিয়ে দেয়।
প্রতিবছর জাতিসংঘ মহাসচিব ঘণ্টা বাজিয়ে শান্তির পক্ষে বার্তা দেন। এরপর জাতিসংঘের বিভিন্ন সদস্যরাষ্ট্র, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং শান্তি ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচির আয়োজন করে।
শান্তি দিবসের আলোচনা শুধু যুদ্ধ বন্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সহিংসতা থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখা, মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, বৈষম্য কমানো এবং সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান করাও শান্তির অংশ।
বিশ্বের কোনো অঞ্চলে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন তার প্রভাব শুধু সেই দেশের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল, খাদ্য ও জ্বালানির সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং মানবিক বিপর্যয়ের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অন্য দেশেও। তাই শান্তি এখন কেবল কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সমাজেরও একটি যৌথ দায়িত্ব।
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস প্রতিবছর ফিরে আসে। কিন্তু যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতার বাস্তবতাও থেকে যায়। তাই ২১ সেপ্টেম্বরের গুরুত্ব শুধু একটি দিবস পালনের মধ্যে নয়; বরং যুদ্ধের বদলে সংলাপ, প্রতিশোধের বদলে সমঝোতা এবং ধ্বংসের বদলে মানুষের জীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বানে।
নিউইয়র্কে যখন ‘শান্তির ঘণ্টা’ বেজে ওঠে, তখন তার প্রতিধ্বনি যেন পৌঁছে যায় বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ প্রতিটি প্রান্তে; মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনো যুদ্ধ নয়, আর শান্তির চেয়ে জরুরি কোনো মানবিক আকাঙ্ক্ষাও নেই।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…