ডলারের দাম কমাতে প্রথমবার নিলামে রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোকে ডলার বিক্রি করল বাংলাদেশ ব্যাংক – DesheBideshe



বাংলাদেশ ব্যাংক

ঢাকা, ১৫ সেপ্টেম্বর- ডলারের বাড়তি দামের লাগাম টানতে এবার নতুন কৌশলে বাজারে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমবারের মতো নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সোমবার ২ কোটি ডলার বিক্রির লক্ষ্যে নিলাম আয়োজন করা হলেও ছয়টি ব্যাংকের কাছে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এসব ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সার মধ্যে। অর্থাৎ নিলামে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫৮ শতাংশ ডলার বিক্রি হয়েছে। ব্যাংকারদের মতে, প্রথমবারের মতো এমন নিলাম হওয়া এবং অল্প সময়ের নোটিশে আয়োজন না যায়, সে কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে বাজারকে একটি বার্তাও দেওয়া হয়েছে—চাহিদার চাপের কারণে ডলারের দাম বাড়তে থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে পারে। আবার বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়লে কেন্দ্রীয় করায় অনেক ব্যাংক এতে পুরোপুরি অংশ নিতে পারেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ডলারের বিনিময় হার যাতে আরও বেড়ে না যায়, সে কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে বাজারকে একটি বার্তাও দেওয়া হয়েছে—চাহিদার চাপের কারণে ডলারের দাম বাড়তে থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে পারে। আবার বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনতেও পারে।

আগের পদ্ধতি ছিল সরাসরি বিক্রি

২০২২ সালের মাঝামাঝি বৈদেশিক মুদ্রার সংকট শুরু হওয়ার পরও রিজার্ভ থেকে বাজারে ডলার সরবরাহ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে তখন উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে নয়, নির্দিষ্ট গ্রাহকের প্রয়োজন মেটাতে বাছাই করা ব্যাংকের কাছে সরাসরি ডলার বিক্রি করা হতো। একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ওই পদ্ধতিকে ‘অযৌক্তিক, অদক্ষ ও অপেশাদার’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, কোন ব্যাংক ডলার পাবে, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারণ করায় সেখানে বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতার সুযোগ ছিল না। এবারের পদ্ধতিতে অবশ্য সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য নিলাম উন্মুক্ত রাখা হয়। সর্বোচ্চ দর প্রস্তাব করা ব্যাংকগুলোর কাছেই ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

যে কারণে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছিল

ডলারের দর ঊর্ধ্বমুখী থাকার সময়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই নিলামের উদ্যোগ নেয়। এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রতি ডলারের বিনিময় হার বেড়ে গতকাল ১২৩ টাকা ৪৫ পয়সায় উঠেছে। এর আগের বৃহস্পতিবার এ হার ছিল ১২৩ টাকা ১০ পয়সা। তার আগের সপ্তাহে ডলারের দর ছিল ১২৩ টাকার নিচে।

একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নিলামটি প্রথমবারের মতো হওয়ায় এবং প্রক্রিয়াটি নতুন হওয়ায় অনেক ব্যাংক হয়তো পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে অংশ নিতে পারেনি। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক দুপুর ১টার পর ব্যাংকগুলোকে নিলামের বিষয়ে জানায়। এর মধ্যে অনেক ব্যাংক তাদের দৈনন্দিন লেনদেন ও বিভিন্ন পরিশোধের প্রয়োজন মেটাতে প্রয়োজনীয় ডলারের ব্যবস্থা করে ফেলেছিল। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের নিলামে ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ আরও বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।

রেমিট্যান্স হাউসের বাড়তি দরেও চাপ

গতকাল সকালে কয়েকটি রেমিট্যান্স হাউস বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৪০ পয়সা দরে বিক্রির প্রস্তাব দেয়। পরে তারা সেই দর আরও ২০ পয়সা বাড়িয়ে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা করে। তবে কয়েকটি ব্যাংক বাড়তি এই দরে ডলার কিনতে রাজি হয়নি।

ব্যাংকারদের ভাষ্য, রেমিট্যান্স হাউসগুলো বেশি দাম চাওয়ায় বাজারে ডলারের বিনিময় হারের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছিল। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছে, গতকাল এলসি নিষ্পত্তির জন্য ব্যাংকগুলো তাদের প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৪৫ পয়সা দরের প্রস্তাব দেয়। এর বিপরীতে গতকালের নিলামে বাংলাদেশ ব্যাংক ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সা দরে ডলার সরবরাহ করেছে। ফলে আজ এলসি নিষ্পত্তি এবং রেমিট্যান্স হাউস—দুই বাজারেই ডলারের দর কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করছেন ব্যাংকাররা।

তাঁদের ধারণা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে তুলনামূলক কম দরে ডলার সরবরাহ করায় রেমিট্যান্স হাউসগুলোর পক্ষে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা দর ধরে রাখা কঠিন হবে। এর ফলে বাজারে ডলারের দামের ওপর আরও নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।

এবার বিক্রেতার ভূমিকায় বাংলাদেশ ব্যাংক

চলতি মাসের শুরুতেও বাংলাদেশ ব্যাংক চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে মোট ৫ কোটি ডলার কিনেছিল। এতদিন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকেই ডলার কিনে আসছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এবার প্রথমবারের মতো উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে সেই রিজার্ভ থেকেই ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করল বাংলাদেশ ব্যাংক। বাজারে ডলারের বাড়তি চাহিদা ও ঊর্ধ্বমুখী বিনিময় হার ঠেকাতে এই পদক্ষেপকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি বাজার হস্তক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন ব্যাংকাররা।

এস এম/ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Scroll to Top