তুরস্ক-ইসরায়েল সামরিক উত্তেজনা: নিরাপত্তাজনিত কারণ নাকি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশল? – DesheBideshe



তেল আবিব, ২৫ আগস্ট – তেল আবিবের ব্যস্ত সড়কে টাঙানো বিশালাকার এক বিলবোর্ডে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান, ইরান, হিজবুল্লাহ এবং নিউইয়র্কের মেয়রের ছবি প্রদর্শনের পর থেকেই ইসরায়েলের রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়। বিলবোর্ডের স্পষ্ট বার্তা ছিল—তারা সবাই আগামী নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে পরাজিত করতে চান।

এর কিছুদিন পরেই সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের আবু আল-দাহার বিমানঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। তেল আবিবের দাবি, সেখানে তুর্কি সামরিক উপস্থিতি তৈরির তোড়জোড় চলছিল। এই দুই ঘটনা ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: তুরস্ককে কেন্দ্র করে নেতানিয়াহুর এই কঠোর অবস্থান কি কেবলই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে, নাকি আসন্ন নির্বাচনের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ?

নেতানিয়াহুর ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ ভাবমূর্তি ও নির্বাচনী সমীকরণ

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রধান রক্ষক বা ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে সমালোচকদের মতে, তিনি সামরিক সংকটকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে অত্যন্ত পারদর্শী।

জরিপে পিছিয়ে জোট: সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহু ও তার ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোট কিছুটা ব্যাকফুটে রয়েছে।

প্রচারণার গতিপথ পরিবর্তন: বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন কোনো নিরাপত্তা বা সামরিক সংকট তৈরি হলে দেশের অর্থনীতি বা সরকারের ভেতরের নানা বিতর্ক থেকে ভোটারদের দৃষ্টি সরানো সম্ভব হবে, যা নির্বাচনী মাঠে নেতানিয়াহুকে বাড়তি সুবিধা দেবে।

ইসরায়েলের সামরিক উদ্বেগ ও যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তুরস্ক সিরিয়ার ওই বিমানঘাঁটিতে সেনাসদস্য, ড্রোন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এতে সিরিয়ার আকাশসীমায় ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

তবে এই সামরিক পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। সিরিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত ও তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক এই হামলাকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নেতানিয়াহু হয়তো রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ইচ্ছা করেই তুরস্ককে উস্কানি দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তুরস্ক ও ইসরায়েলি বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া

তুরস্কের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সম্প্রসারণবাদী নীতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আঙ্কারা সাফ জানিয়েছে, সিরিয়ার নতুন প্রেক্ষাপটে তারা সেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাজ করে যাবে।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের ভেতরের বিরোধীরাও বিষয়টিকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন:

  • ইয়ার লাপিদ (বিরোধী দলীয় নেতা): সামরিক অভিযানকে পুরোপুরি অযৌক্তিক না বললেও, হামলার পর সরকারের এমন ফলাও করে প্রচার করার সমালোচনা করেন।
  • ইয়ার গোলান (ডেমোক্র্যাটস পার্টি): অভিযানটিকে ‘উসকানিমূলক ও বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দেন।
  • এহুদ বারাক (সাবেক প্রধানমন্ত্রী): তিনি স্পষ্ট বলেন, এই সামরিক উত্তেজনার পেছনে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমোস হ্যারেলের মতে, সামরিক উদ্বেগ এবং নির্বাচনী কৌশল—দুটি বিষয়ই এখানে সত্য হতে পারে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে নেতানিয়াহুর মূল নীতিই হলো সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে আগেভাগে আঘাত হানা। তবে এটাও সত্য যে, দেশের ভেতরে একটি জরুরি সামরিক পরিস্থিতি তৈরি হলে তা নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি বদলে দিতে সক্ষম।

ফলে, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েলের জন্য বাস্তব নিরাপত্তা উদ্বেগ হলেও, ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের সময়ের সাথে এই সংঘাতের সংযোগকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এনএন/ ২৫ আগস্ট ২০২৬



Scroll to Top