ইমরান খানের হাসপাতাল বদল নিয়ে চরম নাটকীয়তা, আদালতের নির্দেশ না মানার অভিযোগ | চ্যানেল আই অনলাইন

প্রায় এক বছর পর ভাইকে দেখতে পেয়েছিলেন উজমা খানুম। শুক্রবার মধ্যরাতের পর পাকিস্তানের রাজধানীর সরকারি পিআইএমএস হাসপাতালে একটি ধার করা অফিসে তিনি যখন ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করেন, তখন তার ভাই বিস্মিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আশপাশের চিকিৎসকদের বলেন, “এটা আমার বোন। ১০ মাস পর তার সঙ্গে দেখা হচ্ছে।”

শুক্রবার( ২১ অগাস্ট) সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়ে আরও বলে, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বোন ও ব্যক্তিগত চিকিৎসক অভিযোগ করেছেন, তাকে কোথায় রাখা হয়েছে তা নিয়ে কর্মকর্তারা পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছেন এবং পুরো রাতজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম বিভ্রান্তি।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট মঙ্গলবার নির্দেশ দিয়েছিল, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের মধ্যে আদিয়ালা কারাগার থেকে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। বিভিন্ন মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিন বছর ধরে তিনি কারাগারে আছেন।

তবে শুক্রবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে খানুম ও ইমরান খানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফয়সাল সুলতান যে বর্ণনা দেন, তাতে পুরো ঘটনাটি ছিল বিভ্রান্তিতে ভরা। তাদের অভিযোগ, সরকার আদালতের নির্দেশ “মানতে ব্যর্থ” হয়েছে।

ইমরান খানের আইনজীবী আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ১৬ সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত খানের সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার কথা ছিল।

কিন্তু এর পরিবর্তে তাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (পিআইএমএস) হাসপাতালে রাখা হয়। শুক্রবার ভোর ৫টার মধ্যে তাকে আবার কারাগারের সেলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। শিফা হাসপাতালে তিনি কখনোই যাননি।

৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে আছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় দেওয়া সাজাকে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে। এর মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সাজাগুলো পরে স্থগিত বা আপিলে বাতিল হয়েছে।

ইমরান খানের ডান চোখের সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। এ সমস্যার জন্য কয়েক মাস ধরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা প্রয়োজন হয়েছে। তাকে মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে তার চোখের চিকিৎসা। আদালতের স্থানান্তরের নির্দেশের পেছনেও চিকিৎসা বোর্ডের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বিভ্রান্তিতে ভরা রাত

শিফা হাসপাতালের ফটকের বাইরে রাত কাটানো এক সাংবাদিক আল জাজিরাকে বলেন, পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি সেখানে ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যেন সাংবাদিকদের মনে হয় ইমরান খানকে ওই হাসপাতালেই আনা হবে।

হাসপাতালের দিকে যাওয়ার সড়কের প্রথম চেকপোস্টে শুধু ভেতরে থাকা রোগীর হাসপাতাল কার্ডধারীদের যেতে দেওয়া হচ্ছিল। ওই সাংবাদিককে এক কর্মকর্তা বলেন, “আপনি সাংবাদিক, অন্য পাশ দিয়ে চেষ্টা করুন। আমরা এখান দিয়ে কাউকে যেতে দিচ্ছি না।”

সাংবাদিকের হিসাব অনুযায়ী, সন্ধ্যার মধ্যে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ইমরান-সমর্থক সেখানে জড়ো হন। তাদের কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পাঞ্জাবের দূরের শহর থেকে এসেছিলেন। তারা বিশ্বাস করছিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওই রাতেই হাসপাতালে আসবেন।

একপর্যায়ে একটি গাড়ি এসে খালি সড়কে ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে চলে যায়।

হাসপাতালের পাশে ব্যারিকেড বসানো হয়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বারবার সাইরেন বাজিয়ে গাড়ি নিয়ে সেখান দিয়ে যান। সাঁজোয়া যানও সেখানে আসে। সাংবাদিকের ভাষায়, পুরো আয়োজনটি এমন ছিল যেন গণমাধ্যম নিশ্চিত হয় যে ইমরান খানকে এই হাসপাতালেই আনা হবে।

কয়েক ঘণ্টা ধরে পুলিশের মহাপরিদর্শকের মুখপাত্র কোনো তথ্য দেননি। ইমরান খানকে কখন হাসপাতালে আনা হবে জানতে চাইলে তিনি বারবার বলেন, “আমরা এটা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। আমরা এখনো সরকারি নির্দেশের অপেক্ষায় আছি।”

প্রায় পাঁচ ঘণ্টা হাসপাতালের ফটকের বাইরে অপেক্ষা করলেও ওই সাংবাদিককে সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়নি।

পরে বিষয়টি তার কাছে কিছুটা পরিষ্কার হয়। তার ধারণা, কর্মকর্তারা হয়তো ভেবেছিলেন, ভিড়কে সরিয়ে দিলে তারা অন্য কোথাও ইমরান খানকে খুঁজতে চলে যাবে।

পরে এক কর্মকর্তা তাকে চুপিচুপি বলেন, “এটা সেই জায়গা নয়, পিআইএমএসে যান।”

সাংবাদিক আল জাজিরাকে বলেন, “পরে বুঝতে পারি, আমাদের সঙ্গে কৌশল করা হয়েছিল।”

শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে ইমরান খানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফয়সাল সুলতানও প্রায় একই ধরনের বর্ণনা দেন।

তিনি বলেন, রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাকে আদিয়ালা কারাগার থেকে শিফা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। তার কাছে কোনো ফোন ছিল না। এ সময় কর্মকর্তারা বারবার তাকে আশ্বস্ত করেন যে ইমরান খান “অল্প সময়ের মধ্যেই আসছেন”।

ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তাকে জানানো হয়, ইমরান খান “এখানে আসছেন না”। এরপর তাকে আবার আদিয়ালা কারাগারে পাঠানো হয়। ওই রাতে তিনি তার রোগীর সঙ্গে দেখাই করতে পারেননি।

অন্যদিকে, উজমা খানুমকে পিআইএমএস হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার অভিযোগ, সেখানে ইমরান খানের যে পরীক্ষা করা হয়েছে, তা আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী যথেষ্ট ছিল না।

তিনি বলেন, কোনো রক্ত পরীক্ষা করা হয়নি। এমনকি চিকিৎসকেরা জানতেন না ইমরান খানকে কোন চোখের ড্রপ দেওয়া হয়েছে। পরে তারা তার ফাইল খুঁজে সেটি বের করেন। পুরো সময় কর্মকর্তারা তাকে বলে যাচ্ছিলেন, ইমরান খানকে শেষ পর্যন্ত শিফা হাসপাতালে নেওয়া হবে।

খানুমের ভাষ্য অনুযায়ী, ইমরান খান সারা রাত একই অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, ১০ মাস ধরে তাকে একাকী অবস্থায় রাখা হয়েছে। পড়ার মতো কোনো উপকরণ বা টেলিভিশনও ছিল না। তার রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবেই বেশি নয়—এ কথা তিনি বারবার বললেও কারাগারের চিকিৎসকেরা কয়েক মাস ধরে বিষয়টি গুরুত্ব দেননি।

খানুমের বর্ণনা অনুযায়ী, ইমরান খান এ সময় মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, “মুরসির সঙ্গেও তারা এমন করেছিল।” মুরসি দীর্ঘদিন আটক থাকার পর কায়রোর একটি আদালতে পড়ে গিয়ে মারা যান।

সরকারের বক্তব্য ও পিটিআইয়ের প্রতিক্রিয়া

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, ইমরান খানকে “যোগ্য চিকিৎসকদের একটি দল” পরীক্ষা করেছে। ওই দলে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ, একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং একজন চিকিৎসক ছিলেন। তাদের মতে, খান “চিকিৎসাগতভাবে সুস্থ”। তার বোন খানুম পুরো সময় সেখানে ছিলেন বলেও জানান তিনি।

তারার বলেন, শিফা হাসপাতালের আশপাশে পিটিআই কর্মীদের কারণে তৈরি “নিরাপত্তা পরিস্থিতির” জন্য ইমরান খানকে পিআইএমএসে নেওয়া হয়।

তবে শুক্রবার পিটিআইয়ের কেন্দ্রীয় গণমাধ্যম বিভাগ এক বিবৃতিতে এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটি বলেছে, আগের দিনই তারা কর্মীদের শিফা হাসপাতাল থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছিল। ওই রাতে হাসপাতালের আশপাশে কোনো নিরাপত্তা সমস্যা হয়েছিল—এমন স্বাধীন কোনো প্রতিবেদনও নেই বলে দাবি করেছে তারা।

আদালতের নির্দেশে ইমরান খানের চিকিৎসক ফয়সাল সুলতানকে উপস্থিত থাকার অধিকার দেওয়া হলেও তাকে কেন চিকিৎসা পরীক্ষার সময় দূরে রাখা হয়েছিল, এ বিষয়ে তারার বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

পিটিআই এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফিকার বুখারি বলেছেন, সরকার কীভাবে আদালতের নির্দেশ পালন করেছে, তা তারা চ্যালেঞ্জ করবে।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “এটি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। কোনো পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা হয়নি। চিকিৎসা বোর্ডের কী হলো? পুরো বিষয়টি একটি প্রহসন।”

ইমরান খানের সাবেক আইনজীবী ফয়সাল ফরিদ আদালতের নির্দেশে সরকারকে “অক্ষরে অক্ষরে” তা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে উল্লেখ করে পিআইএমএসে স্থানান্তরের ঘটনাকে “সম্পূর্ণ লঙ্ঘন” বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ১০ মাস ধরে ইমরান খানকে একাকী রাখা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে এমন আচরণ, যা সম্ভবত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের পর আর দেখা যায়নি।

পিটিআইয়ের তথ্যসচিব শেখ ওয়াকাস আকরাম বলেন, আদালত অবমাননার অভিযোগে দলটি সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তিনি বলেন, “আমরা আদালত অবমাননার আবেদন করছি।” বিষয়টি পাঞ্জাবের প্রাদেশিক পরিষদ এবং জাতীয় পরিষদেও তোলা হবে বলে জানান তিনি। আদিয়ালা কারাগার রাওয়ালপিন্ডিতে, যা পাঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত।

দলটির বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, ইমরান খানের চিকিৎসক সুলতানকে শিফা হাসপাতালে পাঠানোও পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল সরকার আদালতের নির্দেশ পালন করছে—এমন ধারণা তৈরি করা, যখন ইমরান খানকে অন্য একটি গাড়িবহরে পিআইএমএসে নেওয়া হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, কয়েক ঘণ্টার কথিত প্রতীকী পরীক্ষা শেষে ইমরান খানকে চিকিৎসাগতভাবে সুস্থ ঘোষণা করে ভোর হওয়ার আগেই আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করে পিটিআই।

পিটিআইয়ের বার্তায় পরিবর্তন

ইমরান খানকে ঘিরে এই ঘটনা এমন এক সপ্তাহে ঘটল, যখন পিটিআইয়ের রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়েও উত্তেজনা চলছিল।

বুধবার পিটিআইয়ের জ্যেষ্ঠ নেতা জুলফিকার বুখারি রয়টার্সকে বলেছিলেন, ইমরান খান মুক্তি পেলে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে বিরোধে যাবেন না।

তবে দলের আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে বুখারির বক্তব্য “তার ব্যক্তিগত মতামত” এবং “দল এটি সমর্থন করে না”।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই নেতা বলেন, কারাগার থেকে ইমরান খান একটি বার্তা পাঠিয়েছেন। সেখানে তিনি ঘোষণা করেছেন, পিটিআই “সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় যাবে না”। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে বোঝাতে দেশটিতে ‘এস্টাবলিশমেন্ট’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

ওই নেতা বলেন, এই অবস্থান পরিবর্তনের অনুমতি একমাত্র ইমরান খানই দিতে পারেন।

মামলাটির পরবর্তী শুনানি ১৬ সেপ্টেম্বর। তবে পিটিআইয়ের আইনজীবীরা বলছেন, শুক্রবারের ঘটনাগুলো তার আগেই আদালতে তোলা হবে।

Scroll to Top