ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাশিয়া এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে রাশিয়ায় প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত জ্বালানি পৌঁছানোর কথা রয়েছে। জাহাজ চলাচলের প্রাথমিক তথ্য ও বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এসব তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
স্বাভাবিক সময়ে রাশিয়া পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের বড় রপ্তানিকারক। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটির তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।
আমদানির এক-তৃতীয়াংশ ভারত থেকে
শিপিং তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে রাশিয়ায় আসা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানির এক-তৃতীয়াংশের উৎস ভারত। বাকি জ্বালানি দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের উপকূলীয় এলাকা থেকে জাহাজে তোলা হয়েছে।
এসব জ্বালানি মূল উৎস ও পরিবহনপথ আড়াল করতে ‘শিপ-টু-শিপ’ পদ্ধতিতে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থাকায় পণ্যগুলোর উৎস গোপন রাখতেই এমন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জুলাইয়ে রাশিয়ায় এ ধরনের জ্বালানি আমদানির উল্লেখযোগ্য কোনো চালান পাওয়া যায়নি।
জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, দুটি ট্যাংকার এ সপ্তাহেই রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর একটি ট্যাংকারে অন্তত ৪০ হাজার টন জেট ফুয়েল রয়েছে। মালয়েশিয়ার জোহর প্রণালির কাছে শিপ-টু-শিপ স্থানান্তরের মাধ্যমে জ্বালানিটি জাহাজে তোলা হয়েছে। একটি বাণিজ্যিক সূত্র জানিয়েছে, ওই চালানের উৎস ভারত।
অন্য ট্যাংকারে প্রায় ৩০ হাজার টন পেট্রোল রয়েছে। আগস্টের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়োসু এলাকায় শিপ-টু-শিপ স্থানান্তরের মাধ্যমে এটি জাহাজে তোলা হয়। এর আগে জুলাইয়ের শেষ দিকেও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রায় ৩০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।
এদিকে জি-৭ দেশ ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সমন্বয় করে জাপান রাশিয়ায় জেট ফুয়েল রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে বা সমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে স্থানান্তরের মাধ্যমেও এই নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সুযোগ নেই।
নিজস্ব জ্বালানি রপ্তানিতেও বিধিনিষেধ
দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় রাশিয়া নিজস্ব জ্বালানি রপ্তানিতেও কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
এপ্রিল থেকে পেট্রোল রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর জুনে জেট ফুয়েল এবং জুলাইয়ের শুরুতে ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরে পেট্রোল ও ডিজেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ আগামী বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বড় পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিকারক রাশিয়াকে এখন উল্টো এশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি করতে হওয়ায় দেশটির শোধনাগারগুলোর ওপর ইউক্রেনীয় হামলার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যে ভারতের ভূমিকা বাড়ছে
রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানিও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রয়টার্সের উদ্ধৃত বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির ৫০ দশমিক ৮৩ শতাংশই এসেছে রাশিয়া থেকে। এর পরিমাণ ছিল প্রতিদিন প্রায় ২৪ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল।
এক বছর আগের তুলনায় ভারতীয় শোধনাগারগুলোর রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে জুনের রেকর্ড পরিমাণের তুলনায় জুলাইয়ে আমদানি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে।
এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৪৩ দশমিক ২৫ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে। এ সময়ে দৈনিক গড় আমদানির পরিমাণ ছিল ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি। আগের বছরের একই সময়ে এই হার ছিল প্রায় ৩৭ শতাংশ।
তবে রাশিয়ার তেল কেনা কমাতে ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপও রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে রাশিয়ার তেল ক্রয়কারী দেশগুলোর পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। তবে এটি কার্যকর হতে প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন।
রাশিয়ার জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শোধনাগারগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মধ্যেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। অন্যদিকে এশিয়ার ব্যবসায়ীদের জন্য রাশিয়ামুখী এসব জ্বালানি সরবরাহ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জটিল হয়ে ওঠা পথগুলোর একটি নতুন দিক তুলে ধরছে।


