যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতিতে সক্রিয় নারীদের পরিবার ও ক্যারিয়ার সামলানো নিয়ে নতুন আলোচনা | চ্যানেল আই অনলাইন








যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতিতে সক্রিয় নারীদের পরিবার ও ক্যারিয়ার সামলানো নিয়ে নতুন আলোচনা | চ্যানেল আই অনলাইন





















যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সক্রিয় নারীদের মধ্যে পরিবার ও পেশাগত দায়িত্বের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা যায়, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সন্তান নেওয়া, ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়া এবং মাতৃত্বের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন দেশটির কয়েকজন নারী রাজনীতিক ও পেশাজীবী।

বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

গত গ্রীষ্মে মার্কিন প্রতিনিধি সারা জ্যাকবসকে কংগ্রেসে অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে নিজের কার্যালয়ে দ্রুত ছুটে গিয়ে হরমোনের ইনজেকশন নিতে হতো। সন্তান নেওয়ার সুযোগ কিছুটা পিছিয়ে দিতে ডিম্বাণু সংরক্ষণের দ্বিতীয় ধাপের চিকিৎসার অংশ হিসেবে তিনি এসব ইনজেকশন নিতেন।

৩৭ বছর বয়সী জ্যাকবস বলেন, এটি ছিল এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা আমাকে ক্ষমতাবান করেছে এবং নিজের জীবনের ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ দিয়েছে। তবে চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল বলেও জানান তিনি।

তার ভাষায়, শরীরে ব্যথা হয়। হরমোনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। একই সময়ে বয়ঃসন্ধি ও মেনোপজের মধ্য দিয়ে যাওয়ার মতো মনে হয়।

২০২১ সালে ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা দিয়েছিলেন জ্যাকবস। তখন কংগ্রেসে খুব কম আইনপ্রণেতাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতেন বলে জানান তিনি। এই চিকিৎসায় ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করে ভবিষ্যতে গর্ভধারণের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। এর খরচ ১০ হাজার ডলারেরও বেশি হতে পারে এবং সাধারণত স্বাস্থ্যবিমার আওতায় এ চিকিৎসা পড়ে না।

চলতি সপ্তাহে ডেমোক্রেটিক প্রতিনিধি আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজও ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি প্রতিদিন নিজেকে হরমোনের ইনজেকশন দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন।

তার এই ঘোষণার পর মাতৃত্ব ও ব্যস্ত পেশাজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। একই সময়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলাইন লেভিট জানান, পরিবার ও শিশুসন্তানের সঙ্গে আরও সময় কাটাতে তিনি ট্রাম্প প্রশাসন থেকে সরে যাচ্ছেন।

লেভিট বলেন, সন্তান জন্মের পর হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর আমি মনে মনে অনুভব করেছি, প্রেস সচিবের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরবচ্ছিন্ন সময়, শক্তি ও মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি আমার দুই ছোট সন্তানের প্রাপ্য সেরা মা হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

বেশ কয়েকজন কর্মজীবী নারী জানিয়েছেন, সন্তান লালন-পালনের পাশাপাশি ক্যারিয়ার ধরে রাখা তাদের জন্য কতটা কঠিন।

যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র শিল্পোন্নত দেশ যেখানে জাতীয় পর্যায়ে বেতনসহ পিতামাতার ছুটি বাধ্যতামূলক নয়। দেশটির শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, নিয়োগকর্তার কাছ থেকে বেতনসহ পারিবারিক ছুটির সুবিধা পান এক-চতুর্থাংশেরও কম কর্মী। অন্যদিকে ইউরোপের সব দেশসহ বিশ্বের ১২০টির বেশি দেশে বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নারীরা তুলনামূলক বেশি বয়সে সন্তান নিচ্ছেন। একই সঙ্গে সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্তও বাড়ছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটিতে সন্তান জন্ম দেওয়া মায়েদের গড় বয়স ২৮ দশমিক ৭ বছর থেকে বেড়ে ২৯ দশমিক ৬ বছরে দাঁড়িয়েছে।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক মিশেল হেইসলার ৩০ বছর বয়সে আবার মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম সন্তানের জন্ম দেন। মেডিকেল শিক্ষার তৃতীয় বর্ষে থাকাকালে তিনি গর্ভধারণ করেন।

মানবাধিকারবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা ‘ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস’-এর মেডিকেল পরিচালক হেইসলার বলেন, সন্তান লালন-পালনের পাশাপাশি ক্যারিয়ারে যথেষ্ট সময় দিতে পেরেছেন মূলত বিভিন্ন সহায়তা, বিশেষ করে ন্যানির সুবিধা এবং সন্তান পালনে সমান দায়িত্ব নেওয়া স্বামীর কারণে।

তিনি বলেন, দুজনই সমানভাবে সন্তানের দায়িত্ব নেবেন, এটি স্পষ্ট না হলে সন্তান পালনের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নারীর ওপরই পড়ে। তখন কোনো না কোনোভাবে তাকে ক্যারিয়ারে পিছিয়ে যেতে হয়।

হেইসলারের মতে, নমনীয় কর্মসূচিই তাকে ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে। সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাতে দিনের কাজ শেষ করার পর রাত জেগে গবেষণা করেছেন। কখনো কখনো ভোর ৫টায় উঠে কাজও করেছেন।

ইউসি ল স্কুল সান ফ্রান্সিসকোর সহযোগী অধ্যাপক সীমা প্যাটেলও সন্তানদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো মিস না করতে রাতে জেগে কাজ শেষ করার চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, সন্তানদের জীবনের এই বছরগুলো খুব দ্রুত চলে যায়। সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে আমি খুব সচেতন।

প্যাটেল সান ফ্রান্সিসকোর শ্রমমান বাস্তবায়ন দপ্তরে কাজ করেছিলেন। ওই দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম স্থানীয় সরকারি সংস্থা হিসেবে নিয়োগকর্তাদের বেতনসহ পিতামাতার ছুটি দেওয়ার আইন পাস করেছিল।

তবে শ্রমিক অধিকারবিষয়ক আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবনে তিনি দেখেছেন, অনেক কম আয়ের কর্মী ও অভিভাবক বেতনসহ ছুটির সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এমন সুযোগ পান না।

ফেডারেল আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরুর সময় তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার প্রয়োজন হলে ছুটি নেওয়ার জন্য আগেভাগে বার্ষিক ছুটির দিনগুলো জমিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই পরামর্শ মেনেছিলেন প্যাটেল।

তিনি বলেন, আমি তখন একেবারে নতুন ও তরুণ আইনজীবী। জীবনের ওই পর্যায় নিয়ে তখনো ভাবিনি। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমাকে ভাবতে হয়েছিল, আমার ছুটির দিনগুলো জমিয়ে রাখা দরকার।

তবে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও দায়িত্বশীল সঙ্গী থাকার পরও সন্তানরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ ও পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য রাখা তার জন্য কঠিনই রয়ে গেছে। তার সন্তানদের বয়স এখন ১৩, ১১ ও ৭ বছর।

প্যাটেল বলেন, আমার চাকরিতে অনেক বেশি কাজ করতে হয়। একই সঙ্গে সন্তানদের পাশে থাকা ও তাদের প্রতি মনোযোগী হওয়া কীভাবে সম্ভব, তার কোনো উত্তর আমার কাছে নেই।

দুই দফা ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন সারা জ্যাকবস। তবে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ওয়াশিংটনে নিয়মিত যাতায়াত করতে হয় এমন চাকরির কারণে আপাতত সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিয়েছেন তিনি।

জ্যাকবস বলেন, আমি যখন দেশের অর্ধেকটা সময়জুড়ে বাইরে থাকি, তখন কীভাবে মা হব, সেটি বাস্তব দিক থেকে বেশ জটিল।

কংগ্রেসে দায়িত্ব পালন করেও যারা সন্তান ও পেশা দুটোই সামলাতে পেরেছেন, তাদের প্রশংসা করেছেন তিনি। কংগ্রেসে দায়িত্ব পালনকালে এখন পর্যন্ত অল্পসংখ্যক নারী সন্তান জন্ম দিয়েছেন। আর কয়েক ডজন নারী আইনপ্রণেতার ১৮ বছরের কম বয়সী সন্তান রয়েছে।

জ্যাকবস উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারও অন্যান্য অনেক মার্কিন নিয়োগকর্তার মতো বেতনসহ পিতামাতার ছুটির সুবিধা দেয় না।

তার ভাষায়, কংগ্রেস এবং আমেরিকার সাধারণ কর্মক্ষেত্র দুটোই এমন পুরুষদের দ্বারা এবং পুরুষদের জন্য তৈরি হয়েছিল, যাদের অনেকের ঘরে এমন সঙ্গী ছিলেন, যারা ঘরের সব কাজ সামলাতেন। নারী ও পুরুষের মধ্যে গৃহস্থালির কাজ সত্যিকার অর্থে সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া যায় এমন সমাজ তৈরি করতে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে।

তবে ভবিষ্যতে ব্যস্ত ক্যারিয়ারের মধ্যে সন্তান নেওয়ার সময় এলে ডিম্বাণু সংরক্ষণকে একটি বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে দেখছেন জ্যাকবস।

তিনি বলেন, আমি আশা করি একদিন সেটা করতে পারব। তবে এখনো মনে হয়নি যে সময়টা ঠিক হয়েছে।

Scroll to Top