জুলাই গণঅভ্যুত্থান: পরিবর্তনের দুই বছর, সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ | চ্যানেল আই অনলাইন

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: পরিবর্তনের দুই বছর, সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ | চ্যানেল আই অনলাইন

বাংলাদেশ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী এমন এক সময়ে পালন করছে, যখন রাজনৈতিক আন্দোলনের চিত্র ও চরিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় জনসমুদ্রভরা মিছিল বা সমাবেশ ছিল রাজনৈতিক শক্তির প্রধান প্রতীক।

এখন সেই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি স্মার্টফোন। কারণ একটি ভিডিও, লাইভ সম্প্রচার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো পোস্ট মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও মানুষ আন্দোলনের অংশীদার হয়ে ওঠে।

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাত্র ও তরুণদের নেতৃত্বে বিভিন্ন আন্দোলনে এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ভারতে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কিংবা নেপালে দুর্নীতিবিরোধী তরুণদের আন্দোলন—সবকিছুর পেছনে ছিল বাস্তব সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ। তবে এসব আন্দোলনের বিস্তার ও প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সেগুলোর অ্যালগরিদম।

বাংলাদেশে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে। সময়ের সঙ্গে সহিংসতা, জনঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক সংকটের কারণে তা বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়। একই ধরনের চিত্র দক্ষিণ এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশেও দেখা গেছে, যেখানে সুশাসনের অভাব, জবাবদিহির সংকট এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা তরুণদের রাজপথে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এসব ক্ষোভের জন্ম দেয়নি, কিন্তু ঘটনাগুলোকে দ্রুত দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিয়ে এর প্রভাব অনেক বাড়িয়েছে।

আজকের রাজনীতিতে তথ্যের গতি অভূতপূর্ব। আগে একটি আন্দোলন জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগলেও এখন একটি ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য বা একটি ভাইরাল হ্যাশট্যাগ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ অ্যালগরিদম এমন কনটেন্টকে বেশি ছড়িয়ে দেয়, যা মানুষের আবেগ—বিশেষ করে ক্ষোভ, ভয় বা আশার অনুভূতি—তীব্রভাবে উসকে দেয়। ফলে বিশ্লেষণধর্মী বা প্রেক্ষাপটসমৃদ্ধ তথ্যের তুলনায় আবেগনির্ভর বিষয়বস্তু দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এই বাস্তবতার দুই দিকই সামনে এনেছে। একদিকে সাধারণ মানুষ ঘটনাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে নথিবদ্ধ ও প্রচারের সুযোগ পেয়েছে, অন্যদিকে তথ্যের পাশাপাশি অপতথ্যও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে জনমত গঠনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। অ্যালগরিদম কি রাজনৈতিক সংগঠিতকরণকে ত্বরান্বিত করছে? অনলাইনে কোনো ইস্যুর ব্যাপক উপস্থিতি কি সত্যিকারের জনসমর্থনের প্রতিফলন, নাকি প্ল্যাটফর্মের নকশা কিছু বিষয়কে অন্যগুলোর তুলনায় বেশি দৃশ্যমান করে তোলে? এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই; বরং প্রয়োজন তথ্যনির্ভর, গভীর ও দায়িত্বশীল আলোচনা।

ইতিহাসও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—কোনো পুরোনো ব্যবস্থা বদলে দেওয়া যতটা সহজ, তার পরিবর্তে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা ততটাই কঠিন। আন্দোলন মানুষকে পরিবর্তনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কার্যকর প্রশাসন এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহি। আন্দোলনের নেতৃত্ব যখন রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ হয়, তখন তাদের অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা, নীতিগত অগ্রাধিকার ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। এই মানদণ্ড সব রাজনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

অ্যালগরিদমনির্ভর রাজনৈতিক বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশের নয়; এটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। আজকের বিশ্বের বড় অংশের রাজনৈতিক বিতর্ক পরিচালিত হচ্ছে এমন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে, যেগুলোর নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে। এসব প্ল্যাটফর্ম নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ালেও একই সঙ্গে কোন তথ্য মানুষের সামনে আসবে আর কোনটি আড়ালে থাকবে, সে সিদ্ধান্তেও বড় ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রও এখন তথ্যপ্রবাহকে কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে।

তবে এই বাস্তবতা স্বীকার করার অর্থ কোনো গণআন্দোলনের বৈধতা অস্বীকার করা নয় কিংবা প্রতিটি আন্দোলনকে বিদেশি প্রভাব বা অ্যালগরিদমের ফল বলে ব্যাখ্যা করা নয়। এমন সরলীকরণ প্রকৃত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণগুলোকে আড়াল করে। বরং ডিজিটাল যুগে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অ্যালগরিদম ও সুপারিশব্যবস্থায় অধিক স্বচ্ছতা, বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর স্বাধীন নজরদারি, নাগরিকদের গণমাধ্যম-সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং এমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যা প্রকৃত গণআন্দোলন ও সমন্বিত তথ্য-প্রভাব—উভয়ের প্রতিই কার্যকরভাবে সাড়া দিতে সক্ষম।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা একটি বৃহত্তর শিক্ষা সামনে আনে। এই আন্দোলন একটি প্রজন্মের ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও জনমুখী শাসনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর, যা দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা অর্জন ও ধরে রাখতে পারে। অ্যালগরিদমের এই যুগে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ শুধু রাজনীতিক বা আন্দোলনকারীদের হাতে নয়; বরং এমন একটি ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর নির্ভর করবে, যেখানে তথ্যপ্রবাহ হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

Scroll to Top