যেভাবে স্পেনের অভিবাসন সংকটক রাজনৈতিক ঝড়ে পরিণত হয়! | চ্যানেল আই অনলাইন

যেভাবে স্পেনের অভিবাসন সংকটক রাজনৈতিক ঝড়ে পরিণত হয়! | চ্যানেল আই অনলাইন

স্পেনের উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতায় বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সাঁতরে প্রবেশ করা কয়েক হাজার অভিবাসীর বেশিরভাগই ইতোমধ্যে মরক্কোতে ফিরে গেছেন। স্পেনের সেনা ও পুলিশ তাদের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

তবে এই নজিরবিহীন অভিবাসন প্রবাহের মর্মান্তিক মূল্যও দিতে হয়েছে। সমুদ্রে ভেসে থাকা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে অন্তত ৬৭ জনের। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পাশে পরিত্যক্ত রাবারের টিউব ও সাঁতারের ফ্লিপারও পাওয়া গেছে।

এই ঘটনায় শুধু মানবিক সংকটই তৈরি হয়নি, ইউরোপের রাজনীতিতেও নতুন করে অভিবাসন ইস্যুতে বিভক্তি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, কী কারণে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ হঠাৎ সেউতার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর বার্তার প্রভাব ছিল, নাকি এর পেছনে আরও পরিকল্পিত কোনো উদ্যোগ কাজ করেছে?

স্পেন-ইতালি রাজনৈতিক উত্তেজনা

সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কিছু সদস্য দেশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তার অভিযোগ, সংকটের সময় স্পেনকে সহযোগিতা করার পরিবর্তে কিছু দেশ রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছে।

বিশেষ করে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী দল ব্রাদার্স অফ ইতালি সেউতার রাস্তায় ছুটে চলা অভিবাসীদের ছবি প্রকাশ করে স্পেন সরকারের সমালোচনা করে। দলটি দাবি করে, ‘এটাই সেই সানচেজ মডেল, যা ইতালির বামপন্থীরা সমর্থন করে।’

এরপর মেলোনি নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে স্পেনের সঙ্গে ইতালির শেনজেন সহযোগিতা সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেন।

তবে স্পেনের দাবি, সেউতা শেনজেন অঞ্চলের অংশ নয়। ফলে সেখানে প্রবেশ করা মরক্কোর অভিবাসীদের ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে অবাধে চলে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। মাদ্রিদের মতে, ইতালি বিষয়টি জানার পরও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঘটনাটি ব্যবহার করেছে।

কেন ‘নরম’ ভাবা হচ্ছে স্পেনকে?

ইতালি একা নয়, ইউরোপের আরও অনেক দেশ মনে করে স্পেন অভিবাসন নীতিতে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিয়েছে।

মেলোনির আহ্বানে আগামী মঙ্গলবার ইইউর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। এতে প্রায় দুই ডজন সদস্য দেশের সমর্থন রয়েছে। বৈঠকে এমন সব নীতি বাতিলের দাবি উঠেছে, যেগুলো ইউরোপে অভিবাসনকে উৎসাহিত করতে পারে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো স্পেনের সেই উদ্যোগ, যার আওতায় দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধ বসবাস ও কাজের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

স্পেন সরকারের যুক্তি, দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে এবং শ্রমবাজারে নতুন কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে।

তবে সেউতায় পৌঁছানো অভিবাসীরা এই কর্মসূচির সুবিধা নিতে যাচ্ছিলেন না, কারণ আবেদন গ্রহণের সময়সীমা ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা

প্রধানমন্ত্রী সানচেজের মতে, স্পেনের সর্বোচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক এক রায়কে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওই রায়ে বলা হয়, সমুদ্রপথে প্রবেশকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। এই তথ্যকে মানবপাচারকারী ও বিভিন্ন অনলাইন প্রচারকারীরা এমনভাবে ছড়িয়েছে যেন স্পেনে প্রবেশ করলেই ইউরোপে থেকে যাওয়ার সুযোগ মিলবে।

তবে সেউতার ক্ষেত্রে অধিকাংশ অভিবাসী ছিলেন মরক্কোর নাগরিক। তারা মানবপাচারকারীর সাহায্য ছাড়াই পরিচিত পথ ব্যবহার করে সীমান্তে পৌঁছান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পেন উন্মুক্ত লেখা ভিডিও ও পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ভিডিওতে তরুণদের ডাইভিং পোশাক পরে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে কিংবা সেউতার ভেতর থেকে ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়।

এসব অ্যাকাউন্টের অনেকগুলো নতুন হলেও কয়েকটির পোস্টে হাজার হাজার লাইক পড়েছে।

কিন্তু বাস্তবে সেউতায় পৌঁছানোর পর অভিবাসীরা কোনো সহায়তা পাননি। খাবার, আশ্রয় কিংবা ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার কোনো সুযোগ না থাকায় বেশিরভাগ মানুষ দ্রুত মরক্কোতে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

কারা লাভবান হলো?

এই সংকট পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ঘটনাটি থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

স্পেনের দৈনিক এল পাইস-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সাংবাদিক আন্দ্রেয়া রিজ্জি লিখেছেন, বিশ্বজুড়ে কট্টর ডানপন্থীরা এই পরিস্থিতিতে ‘অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত’।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেনের পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়’ ও ‘আক্রমণ’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে রাশিয়াও ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে স্বাগত জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে মরক্কো পুরো ঘটনার জন্য ‘অপরাধী চক্রকে’ দায়ী করেছে। যদিও এত বড় জনসমাগম সীমান্তরক্ষীদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সামনে কী?

নতুন করে এমন ঘটনা ঠেকাতে সেউতার সমুদ্রসীমায় সীমান্ত অবকাঠামো আরও জোরদার করছে স্পেন। জেটির পাশে ভাসমান কমলা রঙের বয়া বসানো হচ্ছে এবং এলাকায় নিয়মিত টহল বাড়ানো হবে।

আগামী সপ্তাহে ইইউর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে বহির্সীমান্তের নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে সাময়িকভাবে স্পেন থেকে ইতালিতে যাওয়া যাত্রীদের নথিপত্র এলোমেলোভাবে পরীক্ষা করছে ইতালীয় পুলিশ।

তবে সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছেন সেই তরুণরা, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা ইউরোপে সহজে পৌঁছানোর স্বপ্নে সমুদ্রে নেমেছিলেন। তাদের অনেকেই আর জীবিত ফিরে যেতে পারেননি; ফিরেছেন কফিনবন্দি হয়ে।

Scroll to Top