গালি কি কেবল অশ্লীলতা, নাকি ক্ষমতার ভাষা

গালি কি কেবল অশ্লীলতা, নাকি ক্ষমতার ভাষা

এই যুক্তি ভাষার প্রতিটি স্তরেই প্রযোজ্য। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যে শব্দ বৈজ্ঞানিক পরিভাষা, রাস্তার ভাষায় সেই একই শব্দ গালি হয়ে উঠতে পারে। আদালতে যে ভাষা গ্রহণযোগ্য, শ্রমজীবী মানুষের মুখে তা অসভ্যতা হিসেবে গণ্য হতে পারে। অর্থাৎ শব্দের অর্থের চেয়ে তার সামাজিক অবস্থান ও ব্যবহারকারী ব্যক্তির ক্ষমতার অবস্থান অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ফুকোর ভাষায়, ভাষা কখনোই নিরপেক্ষ নয়; এটি সর্বদাই ক্ষমতার বণ্টনের সঙ্গে জড়িত।

ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ গ্রন্থে ফুকো দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্র প্রকাশ্য শাস্তির পরিবর্তে মানুষের মধ্যে স্বনিয়ন্ত্রণ (সেলফ-রেগুলেশন) গড়ে তোলে। পরিবার, বিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষ শৈশব থেকেই শিখে ফেলে কোন ভাষা ‘ভদ্র’ এবং কোন ভাষা ‘অভদ্র’। এই শিক্ষা ধীরে ধীরে এমনভাবে অন্তর্গত হয় যে বাহ্যিক নজরদারি ছাড়াও মানুষ নিজেই নিজের ভাষা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। ফলে ভাষার শৃঙ্খলা কেবল আইনের মাধ্যমে নয়; সামাজিক অভ্যাসের মধ্য দিয়েও প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে ফুকোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি হলো—যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানে প্রতিরোধও আছে। ভাষার ক্ষেত্রেও এই সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য। ক্ষমতা যখন কিছু শব্দকে নিষিদ্ধ করে, তখন সেই নিষিদ্ধ শব্দই অনেক সময় প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত হয়। ইতিহাসে শ্রমিক আন্দোলন, প্রতিসংস্কৃতি, পাংক সংগীত কিংবা হিপ-হপ সংস্কৃতিতে গালিগালাজের সচেতন ব্যবহার কেবল অশালীনতার প্রকাশ নয়; বরং প্রতিষ্ঠিত ভদ্রতার রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতীকী বিদ্রোহ। নিষিদ্ধ শব্দ এখানে ভাষাগত সহিংসতা নয়; বরং ভাষাগত স্বাধীনতার দাবি।

ধর্মনিন্দার ইতিহাসও এই বিশ্লেষণকে সমর্থন করে। মধ্যযুগীয় ইউরোপে ঈশ্বর বা গির্জাকে অবমাননাকর ভাষায় উল্লেখ করা ছিল গুরুতর অপরাধ, কারণ তা ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়ে বেশি আঘাত করত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাকে। একইভাবে আধুনিক রাষ্ট্রেও সেন্সরশিপ, সম্প্রচার নীতি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষা-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নতুন ধরনের ভাষাগত শাসন প্রতিষ্ঠা করে। প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আজও কোন শব্দ গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি নিষিদ্ধ—তার সিদ্ধান্ত মূলত ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই থাকে।

ফুকোর বিশ্লেষণ তাই আমাদের একটি মৌলিক সত্যের সামনে দাঁড় করায়—গালিগালাজের ইতিহাস মূলত ক্ষমতার ইতিহাস। একটি সমাজ যে শব্দকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, সেই ঘোষণার মধ্যেই তার নৈতিক আদর্শ, সাংস্কৃতিক শ্রেণিবিন্যাস এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বের রূপরেখা লুকিয়ে থাকে। কিন্তু ভাষার ইতিহাস এখানেই শেষ হয় না। কারণ, মানুষ কেবল ক্ষমতার নিয়ম মেনে চলে না; সে হাসে, ব্যঙ্গ করে, উল্টে দেয় এবং নিষিদ্ধ ভাষাকেও উৎসবে পরিণত করে। এই প্রতিরোধের সাংস্কৃতিক রূপই মিখাইল বাখতিনের কার্নিভালেস্ক তত্ত্বের কেন্দ্রীয় বিষয়, যা আমাদের আলোচনার পরবর্তী ধাপ।

তৃতীয় পর্ব: কার্নিভালের হাসি—বাখতিন ও লোকজ প্রতিরোধের ভাষা

ফুকো যেখানে ভাষার ওপর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ বিশ্লেষণ করেন, সেখানে মিখাইল বাখতিন দেখান ভাষার সেই ক্ষেত্র, যেখানে ক্ষমতা সাময়িকভাবে ভেঙে পড়ে। তাঁর কার্নিভালেস্ক তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো—মানুষের ইতিহাসে এমন কিছু সাংস্কৃতিক মুহূর্ত রয়েছে, যখন রাষ্ট্র, ধর্ম ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের আনুষ্ঠানিক কাঠামো সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ হাসি, ব্যঙ্গ ও অশ্লীল ভাষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাকে প্রতীকীভাবে উল্টে দেয়। এই অর্থে গালিগালাজ কেবল অপমানের ভাষা নয়; এটি প্রতিরোধেরও ভাষা।

বাখতিন তাঁর বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন ফ্রঁসোয়া রাবলের গার্গান্তুয়া অ্যান্ড পান্তাগ্রুয়েল। তাঁর মতে, রাবলের দেহ, খাদ্য, যৌনতা, মলমূত্র ও অতিভোজনকেন্দ্রিক ভাষা অশ্লীলতার উদ্‌যাপন নয়; বরং মধ্যযুগীয় ধর্মীয় গাম্ভীর্য ও সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। যে ক্ষমতা নিজেকে পবিত্র, মহিমান্বিত ও দূরবর্তী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কার্নিভাল সেই ক্ষমতাকে দৈহিক, হাস্যকর এবং সাধারণ মানবিক অস্তিত্বে নামিয়ে আনে। রাজা, যাজক কিংবা অভিজাত—সবাই সেখানে একই দেহধারী মানুষ।

এই কারণেই বাখতিন ‘গ্রোটেস্ক রিয়ালিজম’-এর কথা বলেন। এখানে মানবদেহের নিম্নাংশ, জন্ম, মৃত্যু, খাদ্য, যৌনতা কিংবা মলত্যাগ লজ্জার বিষয় নয়; বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। ক্ষমতার ভাষা যেখানে দেহকে আড়াল করতে চায়, কার্নিভালের ভাষা সেখানে দেহকেই সত্যের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ফলে অশ্লীলতা এখানে নৈতিক অবক্ষয় নয়; বরং ক্ষমতার কৃত্রিম পবিত্রতার বিরুদ্ধে বাস্তব মানবজীবনের প্রত্যাবর্তন।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে গালিগালাজের সামাজিক তাৎপর্য নতুনভাবে ধরা পড়ে। লোকজ উৎসব, বাজার, মেলা কিংবা জনসমাবেশে ব্যবহৃত রসিক, অশালীন ও ব্যঙ্গাত্মক ভাষা কেবল বিনোদন সৃষ্টি করে না; তা সমাজে এমন একটি সাময়িক ক্ষেত্র নির্মাণ করে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ভয় কিছুক্ষণের জন্য বিলুপ্ত হয়। মানুষ ভাষার মাধ্যমে সেই ক্ষমতাকেই প্রশ্ন করে, যাকে দৈনন্দিন জীবনে প্রশ্ন করার সাহস তার থাকে না। ফলে গালি অনেক সময় ক্রোধের ভাষা নয়; মুক্তির ভাষা।

তবে বাখতিনের তত্ত্বের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। পরবর্তী গবেষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, কার্নিভাল কি সত্যিই বিপ্লব ঘটায়, নাকি এটি ক্ষমতাব্যবস্থার অনুমোদিত এক সাময়িক চাপমুক্তির ভাল্‌ভ (সেফটি ভাল্‌ভ)? ইতিহাস বলছে, উৎসব শেষে সমাজ আবার আগের নিয়মেই ফিরে যায়। তাই কার্নিভালকে স্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিবর্তে প্রতীকী প্রতিরোধের ক্ষেত্র হিসেবে বোঝাই অধিক যুক্তিসংগত। তবু এই সাময়িক স্বাধীনতার অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি সৃষ্টি করে—ক্ষমতা অপরিবর্তনীয় নয়; তাকে হাসির বিষয়েও পরিণত করা যায়।

আধুনিক সংস্কৃতিতেও এই কার্নিভালেস্ক চেতনার উপস্থিতি লক্ষণীয়। রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র, স্ট্যান্ড-আপ কমেডি, প্রতিসংস্কৃতি, পাংক সংগীত কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যঙ্গাত্মক ভাষা—সবখানেই প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বিরুদ্ধে হাসি ও অশালীনতার ব্যবহার দেখা যায়। এই ভাষা কখনো ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করলেও তার সামাজিক তাৎপর্য কেবল অশ্লীলতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিরোধের একটি সাংস্কৃতিক কৌশল।

Scroll to Top