আসমা আল-আসাদ। ক্ষমতাচ্যুত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ব্রিটিশ স্ত্রী। একসময় ছিলেন লন্ডনের এক স্কুলছাত্রী ও পরে ব্যাংকার। সময়ের হাত ধরে লন্ডনের অভিজাত পরিবেশে বেড়ে ওঠা সেই আসমা ই এক সময় পরিণত হয়েছিলেন স্বামীর নৃশংস শাসনযন্ত্রের অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে।
ডয়েচে ব্যাংক ও জেপি মরগানের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এই তরুণীকে অনেকে দেখেছিলেন আধুনিক, শিক্ষিত ও পশ্চিমা মূল্যবোধে গড়া এক নারী হিসেবে। কিন্তু বাশার আল-আসাদের সঙ্গে বিয়ের পর তাঁর জীবন বদলে যায়। লন্ডনের করপোরেট দুনিয়া ছেড়ে তিনি চলে যান দামেস্কে, সিরিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে।

সেখানে তিনি শুধু প্রেসিডেন্টের স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হননি; ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আসাদ শাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। রাজনীতি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের অন্দরমহলে যাঁর কথাই ছিলো শেষ কথা।
বাশার আল-আসাদ শুরুতেই রক্তাক্ত সিরিয়ার রাজনীতির উত্তরাধিকারী ছিলেন না। ছিলেন লন্ডনে চক্ষুরোগবিদ্যা (অফথ্যালমোলজি) নিয়ে পড়াশোনা করা এক ছাত্র। যিনি কিনা চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু ১৯৯৪ সালে তাঁর বড় ভাই বাসেল আল-আসাদের আকস্মিক মৃত্যুর পর বদলে যায় উত্তরসূরির সব পরিকল্পনা। বাবার শাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে বাশারকে ফিরতে হয় সিরিয়ায়।

দেশটির সামরিক প্রশিক্ষণ ও রাজনৈতিক প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে ক্ষমতার জন্য তৈরি করা হয় বাশার আল আসাদকে। ২০০০ সালে বাবা হাফেজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর মাত্র ৩৪ বছর বয়সে বাশার আল-আসাদ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। শুরুতে তাঁকে সংস্কারের প্রতিশ্রুতিশীল নেতা হিসেবে দেখা হলেও, পরে তাঁর শাসন কঠোর দমন-পীড়ন ও দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে পরিনত হন বিশ্বের অন্যতম বিতর্কিত ব্যক্তিতে।
আর সেই রক্তাক্ত ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন আসমা। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় আসাদ পরিবারের দমন পীড়নের ইতিহাস একদিনের নয়। যার শুরু বাশার আল-আসাদের বাবা হাফেজ আল-আসাদের শাসনামলে।

১৯৮২ সালে হাফেজ আল আসাদ মুসলিম ব্রাদারহুডের বিদ্রোহ দমনে ভয়াবহ সামরিক অভিযান চালান হামা শহরে। অসংখ্য মানুষ নিহত হন, অসংখ্য পরিবার হারায় স্বজন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এটিকে সিরিয়ার ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞ হিসেবে বর্ণনা করে।
দুই দশক পর, ২০০০ সালে বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন বাশার আল-আসাদ। শুরুতে তাঁকে অনেকে ভিন্ন এক ভবিষ্যতের আশা হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু ২০১১ সালে আরব বসন্ত সিরিয়ায় পৌঁছালে সেই আশার মৃত্যু হয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জবাব আসে গুলি, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায়।
১৩ বছরের গৃহযুদ্ধে সিরিয়া পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। লাখো মানুষ নিহত হন, কোটি মানুষ ঘর হারান। হাসপাতাল, স্কুল, শহর—সবকিছুর ওপর নেমে আসে যুদ্ধের ছায়া। বাশার আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে রাসায়নিক হামলা, বেসামরিক মানুষ হত্যাসহ গুরুতর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ওঠে।
এই রক্তাক্ত অধ্যায়ের মাঝেই আসমা আল-আসাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

দ্য অবজারভার-এর অনুসন্ধানে অভিযোগ করা হয়, আসমা শুধু একজন প্রেসিডেন্টের স্ত্রী ছিলেন না; তিনি ধীরে ধীরে শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে ওঠেন।
যুদ্ধের কারণে যখন সিরিয়ার অর্থনীতি ধসে পড়ছিল, তখন অভিযোগ রয়েছে—আসমা অর্থনৈতিক ক্ষমতার একটি নতুন কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। ব্যবসা, সম্পদ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব বাড়তে থাকে।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত সিরিয়া ট্রাস্ট ফর ডেভেলপমেন্ট শুরুতে শিক্ষা, উন্নয়ন ও মানুষের সহায়তার উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু পরে অভিযোগ ওঠে, এই সংস্থা ও এর সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, আসমার নেতৃত্বাধীন একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক পরিষদ ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করত। যারা সরকারের ইচ্ছার বাইরে যেতেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কর তদন্ত, প্রতিষ্ঠান বন্ধ, সম্পদ নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতো।
একসময় আসাদ পরিবারের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী রামি মাখলুফ ছিলেন সিরিয়ার অর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক। কিন্তু পরে তাঁর ক্ষমতা কমে যায় এবং আসমার ঘনিষ্ঠদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চলে আসে বলে অভিযোগ করা হয়।
তবে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিযোগগুলো আসে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে।
অভিযোগ রয়েছে, আসমার প্রভাবাধীন এতিমখানাগুলোতে সরকারবিরোধীদের সন্তানদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের ব্যবহার করা হয়েছিল রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে।
যেসব মা তাঁদের সন্তান হারিয়েছেন, যেসব পরিবার বছরের পর বছর কারাগারের দরজায় অপেক্ষা করেছে—তাদের কাছে এই অভিযোগ শুধু রাজনীতির গল্প নয়; এটি হারানো জীবনের গল্প।
যুদ্ধের শুরুতে অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, লন্ডনে বেড়ে ওঠা আসমা হয়তো স্বামীর কঠোর শাসনে মানবিকতার জায়গা তৈরি করবেন। কিন্তু যখন সিরিয়ার রাস্তায় মানুষের রক্ত ঝরছিল, তখন তাঁর নীরবতা আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
হামজা আল-খাতিবের মতো শিশুদের নির্যাতনের ঘটনা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। একটি শিশুর মৃত্যু পুরো পৃথিবীকে প্রশ্ন করেছিল—একটি রাষ্ট্র কতটা নির্মম হতে পারে? আর সেই সময় ক্ষমতার ভেতরে থাকা মানুষগুলো কোথায় ছিলেন?
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বাশার আল-আসাদের বড় সিদ্ধান্তগুলোর পেছনেও আসমার মতামত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তাঁর নির্দেশকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হতো।

শাসনের ভেতরে তাঁর নিজস্ব প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি রাশিয়ার নীতিনির্ধারণী মহলের একটি অংশ একসময় তাঁকে বাশারের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবেও বিবেচনা করেছিল বলে দাবি করা হয়।
তবে আসমা ও তাঁর পরিবার সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাঁদের দাবি, তাঁকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একটি নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যখন আসাদ সরকারের পতন ঘটে, তখন কয়েক দশকের এক শাসনের অবসান হয়। বাশার আল-আসাদ পরিবারসহ সিরিয়া ছেড়ে চলে যান। আসমা তখন চিকিৎসার জন্য মস্কোতে ছিলেন বলে জানা যায়।
কিন্তু ইতিহাসের কিছু প্রশ্নের উত্তর সহজে হারিয়ে যায় না।
একদিকে আছে লন্ডনের এক মেধাবী তরুণীর গল্প—যিনি একসময় স্বপ্ন দেখেছিলেন নিজের ক্যারিয়ারের। অন্যদিকে আছে একটি দেশের গল্প—যেখানে লাখো মানুষ যুদ্ধ, ভয় আর হারানোর স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে।
আজ আসমা আল-আসাদের নামের সঙ্গে শুধু প্রাসাদ, ক্ষমতা আর বিলাসিতার গল্প জড়িয়ে নেই। জড়িয়ে আছে ধ্বংস হওয়া শহর, নিখোঁজ মানুষ, সন্তান হারানো মায়েদের কান্না এবং বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা অসংখ্য পরিবারের দীর্ঘশ্বাস।
সময়ই বলবে, ইতিহাস তাঁকে কীভাবে মনে রাখবে। একজন ক্ষমতাবান নারী হিসেবে, নাকি এমন এক শাসনের অংশ হিসেবে—যে শাসনের ছায়ায় একটি দেশের প্রজন্ম হারিয়েছে তাদের স্বপ্ন।




