ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝঝিয়ায় রাশিয়ার হামলা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সামনের যুদ্ধরেখা থেকে মাত্র ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শহরে এখন নিয়মিতভাবে গ্লাইড বোমা ও ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে স্কুল, সরকারি ভবন, গণপরিবহন, জ্বালানি স্টেশন এবং আবাসিক এলাকা। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়েছে এবং প্রতিটি দিনই আতঙ্কে কাটছে।

শহরের বাসিন্দা আন্না হলোভচেঙ্কো জানান, ভোর পাঁচটার দিকে রুশ বাহিনীর গ্লাইড বোমার বিস্ফোরণের শব্দে তার ঘুম ভাঙে। শহরের উপকণ্ঠে একের পর এক বিস্ফোরণের পর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হয় নতুন দফার ড্রোন হামলা। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী ড্রোনগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা চালালেও বিস্ফোরণের শব্দে পুরো শহর কেঁপে ওঠে।
তিনি বলেন, এরপর আর ঘুমানোর সুযোগ ছিল না। কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কিছুক্ষণ পরই একটি ইরানি নকশার শাহেদ ড্রোন তার কর্মস্থলের কাছাকাছি বিস্ফোরিত হয়। আরেকটি ড্রোন বিদ্যুতের তারে আঘাত করলে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আন্নার ভাষায়, এখন জাপোরিঝঝিয়ায় এ ধরনের ঘটনাই দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শহরের বিভিন্ন স্কুল, সরকারি দপ্তর, জ্বালানি স্টেশন, গণপরিবহনের বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং অসংখ্য আবাসিক ভবনে হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী।
জাপোরিঝঝিয়ার ভারপ্রাপ্ত মেয়র রেজিনা খারচেঙ্কো জানান, একদিনের তীব্র হামলার সময় আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর সুযোগ না পেয়ে তিনি নিজের বাসার বাথরুমেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার অভিযোগ, রুশ বাহিনী এখন বেসামরিক মানুষ, পৌর পরিবহন, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস, আবাসিক ভবন, এমনকি শিশুদেরও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।
ক্রমবর্ধমান হামলার কারণে সম্প্রতি জাপোরিঝঝিয়া সিটি কাউন্সিলকে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে বৈঠক করতে হয়েছে। সেখানে নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন প্রতিরোধী জাল স্থাপন এবং স্কুল, হাসপাতাল ও সরকারি ভবনের জানালায় বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী বিশেষ সুরক্ষা ফিল্ম লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মেয়র খারচেঙ্কো বলেন, তিনিও প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। অনেক সময় রাতে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের করিডরের মেঝেতেই ঘুমাতে হয়। তার কোনো ব্যক্তিগত বাঙ্কার বা দেহরক্ষী নেই।
ইউক্রেনীয় বাহিনী কিছু এলাকায় রুশ সেনাদের কয়েক কিলোমিটার পিছিয়ে দিতে সক্ষম হলেও হামলার তীব্রতা কমেনি। বরং আগের তুলনায় আরও বেড়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো রাশিয়ার উন্নত প্রযুক্তির ফার্স্ট-পার্সন-ভিউ (এফপিভি) ড্রোনের ব্যবহার বৃদ্ধি। এসব ড্রোন এখন আগের চেয়ে অনেক দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সামরিক বিশ্লেষক স্যাম ক্র্যানি-ইভানস জানান, রুশ বাহিনী বর্তমানে দীর্ঘপাল্লার ‘মাদারশিপ’ ড্রোন ব্যবহার করছে। এসব ড্রোন একাধিক ছোট ড্রোন বহন করে নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে দেয়। পরে ছোট ড্রোনগুলো আলাদা হয়ে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
তিনি আরও জানান, রাশিয়া এখন ‘মেশ নেটওয়ার্কিং’ প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি ড্রোন অন্য ড্রোনের মাধ্যমে রেডিও সংকেত আদান-প্রদান করতে পারে। ফলে ইলেকট্রনিক জ্যামিং এড়িয়ে আরও দূরের লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে হামলা চালানো সম্ভব হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইউক্রেনের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতার একটি অংশ অন্য ফ্রন্টে স্থানান্তর করাও জাপোরিঝঝিয়ায় রুশ হামলা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের শেষ সপ্তাহে জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে রাশিয়ার ৮৮৪টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনী।
দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় রুশ বাহিনী পিছিয়ে গেলেও ইউক্রেনের অন্যান্য ফ্রন্টে তারা ধীরগতিতে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং দখলকৃত অঞ্চলের সরবরাহ ব্যবস্থায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে রুশ সেনাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করার চেষ্টা করছে।
দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যেও জাপোরিঝঝিয়ার কয়েক লাখ মানুষ এখনো শহর ছেড়ে যাননি। বাসিন্দা আন্না হলোভচেঙ্কো বলেন, খাবার ও জ্বালানির অভাব নেই, তাই এখনই শহর ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন না। তবে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ যে নেই, তা নয়।



