জন্মের পর একটি শিশুর প্রথম কান্না মায়ের কোলে থামে। কিন্তু সোনালী খাতুনের কোলে যে কান্না থেমেছিল গত ৫ জানুয়ারি রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজে, তার পাশে ছিলেন না শিশুর বাবা। দানেশ শেখ তখনও বন্দি ছিলেন সীমান্তের ওপারে, এক ভিনদেশের প্রশাসনিক জটিলতায়—যে জটিলতা তৈরি করেছিল তাঁরই নিজের রাষ্ট্র, ভারত। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হাসপাতালে গিয়ে সদ্যোজাতের নাম রাখেন “আপন”। কিন্তু নামের আড়ালে যে সত্যটি চাপা পড়ে যায়, তা হলো—এই শিশুটি জন্মের পর প্রায় সাত মাস তার বাবার মুখ দেখতে পায়নি। একটি রাষ্ট্র, যে নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে দাবি করে, তার প্রশাসনিক নিষ্ঠুরতার কারণে একটি নবজাতক তার বাবাকে চিনতে শিখল ফোনের স্ক্রিনে, কোলে নয়।
এই গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হলো গত বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন দিয়ে দানেশ শেখ, সুইটি বিবি এবং তাঁর দুই সন্তান কুরবান শেখ ও ইমাম হোসেনকে অবশেষে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করেছে বিজিবি। পুশ-ইনের ঠিক এক বছর পর, কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে যাদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, তাদেরই অবশেষে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় ফেরত নিতে বাধ্য হলো ভারত। কিন্তু এই একটি সংবাদের আড়ালে রয়ে গেছে একটি পরিবারের রক্তক্ষরণের ইতিহাস—যে ইতিহাস প্রশ্ন তোলে, ভারতের নিজস্ব সংবিধান তার নিজের নাগরিকদের জন্য আসলে কতটুকু সুরক্ষা দিতে পারে।
যেখানে শুরু হয়েছিল রক্তক্ষরণ
ভারতীয় সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ বলে, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া ছাড়া কারও কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া যাবে না। এই অধিকার কেবল ভারতীয় নাগরিকের জন্য নয়—ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থানরত যেকোনো মানুষের জন্যই প্রযোজ্য, এমনটাই বলেছেন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত বারবার। অথচ পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার পাইকর গ্রামের সোনালী খাতুনের জীবনের গত এক বছরের ইতিহাস প্রমাণ করে, কাগজে-কলমে লেখা এই অধিকার বাস্তবে তার জন্য কোনো সুরক্ষাই দিতে পারেনি।
২০২৫ সালের ১৭ জুন। দিল্লির রোহিণীতে একটি তাঁবুতে বাস করতেন সোনালী, তাঁর স্বামী দানেশ শেখ, আট বছরের ছেলে সাব্বির। জীবিকার তাগিদে তাঁরা এসেছিলেন বীরভূম থেকে—দানেশের বাবা ভোদু শেখ নিজেও দিল্লিতে রিকশা চালিয়েছেন, মা গৃহকর্মীর কাজ করেছেন বছরের পর বছর। সেদিন সকালে দিল্লি পুলিশ হানা দেয় তাঁদের তাঁবুতে। আধার কার্ড ও অন্যান্য পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তাঁদের কথা বিশ্বাস করা হয়নি। “পুলিশ আমাদের তাঁবুতে ঢুকে আটক করে নিয়ে যায়। আমাদের বাংলাদেশি বলা হয়, যদিও আমরা আধার কার্ড ও অন্যান্য পরিচয়পত্র দেখিয়েছিলাম,” পরবর্তীতে জানিয়েছিলেন সোনালী নিজে। একই সময় দিল্লির বিভিন্ন স্থানে বাংলাভাষী মানুষদের লক্ষ্য করে চলছিল ধরপাকড়ের অভিযান—শুধু বাংলায় কথা বলার অপরাধে মানুষকে সন্দেহভাজন ঘোষণা করার এক ভয়ংকর প্রবণতা।

ভারতের নিজস্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নাগরিকত্ব যাচাইয়ে যথেষ্ট সময় দেওয়ার বিধান থাকলেও, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দেওয়া হয়। এখানেই সংবিধানের প্রথম লঙ্ঘন—”আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া” যে ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও স্বেচ্ছাচারমুক্ত হতে হয়, ভারতের সর্বোচ্চ আদালত নিজেই যে নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে, তার কোনো ছোঁয়াই এই সিদ্ধান্তে ছিল না। একটি পরিবারের সারা জীবনের নাগরিকত্ব, তাদের শিকড়, তাদের পরিচয়—সব কিছু মুছে ফেলা হলো কয়েক দিনের এক তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে।
জঙ্গলে ঠেলে দেওয়া এক অন্তঃসত্ত্বা মা
২৫ জুন কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে এই ছয়জনকে পুশ-ইন করে বিএসএফ। তখন সোনালী প্রায় তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দিল্লি থেকে বিমানে আসামে এনে, গাড়িতে সীমান্তের কাছে নিয়ে, তাঁদের অচেনা জঙ্গলের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়—কোনো নথি নেই, কোনো আদালতি প্রক্রিয়া নেই, কোনো মানবিক বিবেচনা নেই। ভারতীয় সংবিধান যে জীবনের অধিকারকে “আইনের প্রক্রিয়া ছাড়া” কেড়ে নেওয়া যাবে না বলে ঘোষণা করে, সেই অধিকার এখানে প্রশাসনের হাতেই ভূলুণ্ঠিত হলো—কোনো আদালতের আদেশ ছাড়াই, নিছক সন্দেহের ভিত্তিতে।
একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী, তাঁর শিশুসন্তান, আর একটি আত্মীয় পরিবার—রাষ্ট্রের চোখে তাঁরা তখন নিছক পরিসংখ্যান, “অনুপ্রবেশকারী” তকমা সাঁটা কয়েকটি নাম। অথচ কিছুদিন আগেও এই মানুষগুলো দিল্লির রাস্তায় দিনমজুরি করে, ঘর ভাড়া দিয়ে, সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। একটি রাষ্ট্রীয় স্বাক্ষরের অভাবে, একটি ভাষার কারণে, তাঁদের গোটা অস্তিত্ব রাতারাতি অস্বীকার করা হলো।
যেখানে বাংলাদেশ মানবিকতার পরিচয় দিল
চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রবেশ করলে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে গ্রেপ্তার করে। বাংলাদেশ তাঁদের ডেকে আনেনি—ভারতীয় রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানবিরোধী সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হলো একটি নিরপরাধ পরিবারকেই, আর সেই মূল্য শোধ করতে হলো ভিনদেশের কারাগারে বসে। গত বছরের ২২ আগস্ট আদালতের নির্দেশে তাঁদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলহাজতে পাঠানো হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন পঁয়ত্রিশ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা সোনালী খাতুন ও তাঁর দুই নাবালক সন্তান।
তবে ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি অংশ—বিচার বিভাগ—শেষ পর্যন্ত এই ব্যর্থতার মুখোশ খুলে দেয়। সোনালীর বাবা ভোদু শেখ কলকাতা হাইকোর্টে একটি হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দাখিল করেন, যেখানে তিনি জানান, তিনি ও তাঁর পরিবার পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা এবং তাঁর মেয়ে ও তাঁর পরিবার ভারতীয় নাগরিক—দিল্লি পুলিশ তাঁদের রোহিণী থেকে তুলে নিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা হাইকোর্ট বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে চার সপ্তাহের মধ্যে তাঁদের ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন, স্পষ্ট ভাষায় বলেন—সন্দেহ যত প্রবলই হোক, তা প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। এই পর্যবেক্ষণ আসলে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদেরই প্রতিধ্বনি। ৩০ সেপ্টেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালতও নথি পর্যালোচনা করে তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের নির্দেশ দেয়।
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ, তবু দিন গোনা থামেনি একটি নিরপরাধ পরিবারের মুক্তির জন্য মামলা গড়ায় খোদ ভারতের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, মানবিক বিবেচনায় সোনালী ও তাঁর ছেলেকে ফিরিয়ে আনা হবে—যদিও কেন্দ্রীয় সরকার এই সিদ্ধান্তে রাজি হলেও তাদের নজরদারিতে রাখার অধিকার বজায় রাখে। এখানেই লুকিয়ে আছে গল্পের সবচেয়ে করুণ বিদ্রূপ—যে রাষ্ট্র নিজের সর্বোচ্চ আদালতের সামনে স্বীকার করছে যে তারা ভুল করেছে, সেই একই রাষ্ট্র “মানবিকতা”-কে একটি অনুগ্রহ হিসেবে উপস্থাপন করছে, অধিকার হিসেবে নয়।
আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পরও রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্বাহী অংশ পূর্ণ পরিবারকে ফিরিয়ে নিতে গড়িমসি করে মাসের পর মাস। গত ২ ডিসেম্বর আদালত সবাইকে স্থানীয় জিম্মায় মুক্তি দিলেও ভারত তখনও পুরো পরিবারকে নিতে প্রস্তুত ছিল না। শুধুমাত্র ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সোনামসজিদ চেকপোস্টে আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে কেবল সোনালী ও তাঁর ছেলে সাব্বিরকে গ্রহণ করে বিএসএফ। স্বামী দানেশসহ বাকি চারজনকে সীমান্তে নিয়ে গিয়েও সেদিন ভারত ফিরিয়ে নেয়নি। বিজিবি তখন স্পষ্ট ভাষায় বলেছিল, বিএসএফের এই অমানবিক পুশইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
যে সন্তান বাবাকে চিনল ফোনের পর্দায়
ভারতে ফিরে সোনালী চরম শারীরিক ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। গর্ভাবস্থার দীর্ঘ সময় তাঁকে কাটাতে হয়েছে চিকিৎসার নিশ্চয়তা ছাড়াই, বিদেশের কারাগারে, তারপর অনিশ্চিত এক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায়। অবশেষে গত ৫ জানুয়ারি ২০২৬ রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজে তিনি জন্ম দেন এক পুত্রসন্তানের। খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, শিশুর নাম রাখেন “আপন”। তিনি লেখেন, “এই ভোগান্তি কোনও নাগরিকেরই প্রাপ্য নয়। কিন্তু সোনালি যে সাহস এবং মানসিক শক্তি দেখিয়েছেন, সেটাই মানবতার জয়।”
কিন্তু এই “মানবতার জয়ধ্বনি”-র আড়ালে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—কোথায় ছিলেন শিশুটির বাবা? দানেশ শেখ তখনও বাংলাদেশের মাটিতে, তাঁর সন্তানের জন্মের খবর তিনি পেয়েছেন হয়তো একটি ফোনকলে, একটি ছবিতে। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বহুবার রায় দিয়েছে, পারিবারিক ঐক্য ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ যে পরিবারের নাগরিকত্ব আদালত নিজেই নিশ্চিত করেছিলেন, সেই পরিবারকেই মাসের পর মাস বিচ্ছিন্ন রাখা হলো একটি সন্তানের জন্মলগ্নেও। নবজাতক আপন প্রথম যে মুখ দেখেছিল, তা ছিল মায়ের, নানা-নানির, কিন্তু বাবার নয়। জন্মের প্রায় সাত মাস পর, গত ৮ জুলাই, দানেশ শেখ প্রথমবারের মতো কোলে তুলে নিতে পারলেন নিজের সন্তানকে।
ঘরে ফিরেও যে যুদ্ধ শেষ হয়নি
ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরও সোনালীর সংগ্রাম থামেনি। এ বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, স্বামীবিহীন অবস্থায় ফিরে আসা সোনালীর পরিবার চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বীরভূমের পাইকর গ্রামে দুটি জীর্ণ ঘরে গাদাগাদি করে বাস করেন তেরো জন মানুষ। সোনালীর বাবা ভোদু শেখ, বাহাত্তর বছর বয়সেও ইনহেলার নিয়ে দিন কাটান, গবাদি পশুর জন্য খড় কাটেন নিজ হাতে—অথচ বারবার আবেদন করেও তিনি বার্ধক্য ভাতা পাননি। পরিবারটি সরকারি আবাসন প্রকল্পের সুবিধাও পায়নি, যদিও তাঁরা বহুবার পঞ্চায়েতের কাছে দরখাস্ত করেছেন। সোনালী, তাঁর মা ও ভাবি—কেউই রাজ্য সরকারের নারী কল্যাণ প্রকল্প “লক্ষ্মীর ভাণ্ডার”-এর সুবিধা পান না।
“এই ভাঙাচোরা ঘরে আমরা তেরো জন মাত্র দুটি ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকি। এভাবে কি এত মানুষের বসবাস সম্ভব?” প্রশ্ন তোলেন সোনালীর বাবা। যে রাষ্ট্র তাঁর মেয়েকে ভুল করে বিদেশে ঠেলে দিয়েছিল, সেই একই রাষ্ট্রের কল্যাণ ব্যবস্থা এখনও তাঁদের নাগালের বাইরে। এটি প্রমাণ করে, সোনালী খাতুনের ট্র্যাজেডি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ভুল নয়—এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে দরিদ্র, বাংলাভাষী, প্রান্তিক মানুষ রাষ্ট্রের চোখে বারবার অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রথমে নাগরিকত্ব প্রশ্নে, তারপর কল্যাণ প্রকল্পের সুবিধা বণ্টনে।
একটি সংবিধান, যার প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি
এই পুরো ঘটনাক্রম আন্তর্জাতিক আইনের নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১৩ ও ১৪ অনুচ্ছেদ প্রতিটি মানুষের নিরাপদ চলাচল ও আশ্রয়ের অধিকার নিশ্চিত করে; আন্তর্জাতিক বেসামরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের অ-প্রত্যর্পণ নীতি স্পষ্টভাবে বলে, যাচাই ছাড়া কাউকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া যায় না। কিন্তু সোনালী খাতুনের গল্পে সবচেয়ে করুণ দিকটি হলো, এখানে বিদেশি কোনো আইন নয়—ভারতের নিজস্ব সংবিধানই তাঁকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যে অধিকার সংবিধান নিশ্চিত করে, প্রশাসনযন্ত্র নিজেই তা লঙ্ঘন করেছে; আর যখন বিচার বিভাগ, এমনকি স্বয়ং সুপ্রিম কোর্ট সেই লঙ্ঘন সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে, তখনো নির্বাহী বিভাগ তা কার্যকর করতে নিয়েছে পুরো এক বছর।
এর বিপরীতে বিজিবির ভূমিকা ছিল সংযত, স্বচ্ছ ও মানবিক। বিএসএফ যা করেছিল অন্ধকারে, বিজিবি তার সমাধান করেছে প্রকাশ্যে—পতাকা বৈঠক, ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া ও চিকিৎসাগত সমন্বয় নিশ্চিত করে। বিএসএফের এই পুশ-ইনকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে বরাবরই দাবি করে আসছে বিজিবি।
প্রশ্ন যা রয়ে গেল
সোনালী খাতুনের পরিবার আজ অবশেষে এক হয়েছে, কিন্তু ঘরে ফেরা মানেই ন্যায়বিচারের সমাপ্তি নয়। যে প্রশাসনযন্ত্র বৈধ যাচাই ছাড়াই ৬ জন ভারতীয় নাগরিককে বিদেশি ঘোষণা করেছিল, যে প্রশাসন সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ পাওয়ার পরও একটি পরিবারকে পুরো এক বছর বিচ্ছিন্ন রেখেছিল, যে রাষ্ট্র একটি নবজাতককে তার বাবার কোল থেকে সাত মাস দূরে রেখেছিল—তাদের জবাবদিহিতা এখনও বাকি। সোনালী খাতুনের গল্প কেবল একটি সীমান্ত-দুর্ঘটনার গল্প নয়; এটি একটি প্রশ্ন—যে সংবিধান নিজেকে জীবন, স্বাধীনতা ও পারিবারিক ঐক্যের রক্ষাকবচ বলে দাবি করে, বাস্তবে একজন দরিদ্র বাংলাভাষী নারীর জন্য তা কতটা কার্যকর ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর ভারতকেই দিতে হবে— নিজের আদালতের রায়ের প্রতি, নিজের সংবিধানের প্রতি এবং নিজের গণতান্ত্রিক দাবির প্রতি সততা বজায় রেখে। কারণ যতদিন না একটি রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দরিদ্র, সবচেয়ে প্রান্তিক নাগরিকের জন্যও সমান দ্রুততায়, সমান মর্যাদায় বিচার নিশ্চিত করতে পারবে, ততদিন সংবিধানের পাতায় লেখা প্রতিটি অধিকারই থেকে যাবে কেবল একটি প্রতিশ্রুতি—যা সোনালী খাতুনের মতো মানুষদের জন্য কখনো বাস্তব হয়ে ওঠে না।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)





