ব্যাংকের গ্রাহকরা পুরো টাকা ফেরত পাবেন, লুটেরাদের সম্পদ নিলাম হবে

ব্যাংকের গ্রাহকরা পুরো টাকা ফেরত পাবেন, লুটেরাদের সম্পদ নিলাম হবে

খেলাপি ঋণে ধুঁকতে থাকা ব্যাংকগুলোর গ্রাহকরা সুদসহ পুরো টাকা ফেরত পাবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ব্যাংক দেউলিয়া হলে আমানতকারীরা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা ফেরত পাওয়া বিষয়ে ‘হেয়ার কাট’ নামে যে বিধান হয়েছে কার্যকর হবে না জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সুদসহ পুরো টাকা ফেরত পাবেন আমানতকারীরা। তবে এজন্য ধৈর্য ধারণ করতে হবে।

ব্যাংকের গ্রাহকরা পুরো টাকা ফেরত পাবেন, লুটেরাদের সম্পদ নিলাম হবে

বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধি-৭১ অনুযায়ী জরুরি জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের জবাবে অর্থমন্ত্রী একথা বলেন। বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রেহেনা আক্তার রানুর নোটিশটি আনেন।

নোটিশে রেহেনা আক্তার রানু প্রশ্ন রেখে বলেন, সারাজীবনের কষ্টার্জিত আয় বিশ্বাস করে ব্যাংকে রেখেছিল। ব্যাংক থেকে টাকা লুট হলে মানুষ কোথায় যাবে? একজন মানুষের টাকা ব্যাংকে আছে, টাকা তুলতে পারছে না বলে চিকিৎসা করতে পারছে না। টাকার অভাবে অনেকে মৃত্যুবরণ করছে। লুটেরা মালিকপক্ষ বিদেশে পালিয়ে আরামে জীবন যাপন করছে। লুটেরা এবং ব্যাংকখেকো মালিকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে তাদের সমস্ত সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে গ্রাহকদের টাকা গ্রাহকদের হাতে ফিরিয়ে দিতে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে রেজ্যুলেশন আইনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে সুরক্ষিত আমানতের পরিমাণ সর্বোচ্চ এক লাখ থেকে দুই লাখে উন্নীত করা হয়েছে। অবসায়নধীন ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা আমানতের অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরত পাচ্ছেন। আগে ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষা আইনের আওতাভুক্ত ছিল না।

অর্থমন্ত্রী বলেন, পাঁচটি ব্যাংকের বিনিয়োগ অনিয়মে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলমান রয়েছে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে সম্পদ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্যাংকের পাওনা আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে দায়ী ব্যক্তির সম্পদ অথবা তহবিলের সব আয়, সম্পত্তি অধিকার এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে বিক্রি ও নিলামের গ্রাহকের টাকা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করি।

দেওয়ানি মামলাও করা হবে জানিয়ে অর্মথন্ত্রী বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা খেলাপি ঋণের টাকা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক তাদের ঋণের টাকা উদ্ধারের জন্য ‘নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করেছে। ৯টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানকে ‘নো উইন, নো ফি’ শর্তে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ১১ চুক্তির প্রথম পর্যায়ে ৬টি হল, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, শিকদার, নাসা ও ওরিয়েন্ট গ্রুপ নিয়ে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

ঋণ খেলাপিদের বিদেশ থেকে ধরে এনে থেরাপি দেওয়ার দাবি জানিয়ে রেহেনা আক্তার রানু বলেন, তারা তাদের সম্পদের ১০-১২ গুণ বেশি টাকা লুট করেছে। সম্পত্তি বিক্রি করে এই টাকা আদায় সম্ভব নয়। একদিকে মানুষ টাকা তোলার চিন্তায় আছে; আরেকদিকে এখানে যোগ হয়েছে হেয়ারকাট নামক এক ‘মরণকাট’ সমস্যা। ব্যাংক ডাকাতদের ডাকাতির দায়ভার কেন আমানতকারীদের নিতে হবে? আমানতকারীদের কি অপরাধ? হেয়ারকাট নামক এই মরণকাঠিটি প্রত্যাহার করতে হবে। মরণকাট প্রত্যাহার করে ৭৫ লাখ গ্রাহককে স্বস্তি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আপনার মন্ত্রণালয়ের আছে কি না?

জবাবে অর্থমন্ত্রী হেসে বলেন, আমি ভীত-সন্ত্রস্ত বোধ করছি। আগেই বলেছি এটা একটা হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। আগেও বলেছি সংসদে—যারা আমানতকারী, তাদের আমানত সুদসহ ফেরত দেওয়া হবে, ইনশাআল্লাহ। তবে একটু ধৈর্য ধরতে হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকগুলো সবগুলোই লোকসানের মধ্যে আছে এবং লোকসান কিন্তু প্রতিদিন বাড়ছে। লোকসানি একটা ব্যাংক. যেখাসে তার আমানতই ফিরিয়ে দিতে পারছে না এবং তাকে সুদ দেওয়া যে কত কঠিন, সেটা আপনারা বুঝতে হবে। আমানত এবং সুদ ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু এটার জন্য একটু সময়ের প্রয়োজন। এই ব্যাংকগুলো হেয়ারকাট থাকবে না। হেয়ারকাট তো বাদ যাবে।

আমির খসরু বলেন, জানি আমানতকারীদের অপেক্ষা করারও সময় নাই। মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে, মেয়ের বিয়ে দিতে পারছে না। প্রতিনিয়ত এই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি প্রতিনিয়ত। এটার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে। তবে নিশ্চিতভাবে এটা বলতে পারি, আমানতকারীরা তাদের টাকা ফেরত পাবে, সুদসহ ফেরত পাবে।

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদের চাকরিজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে: সংসদে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী

একাত্তর বিধির অপর এক নোটিশের জবাবে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ দিয়ে চাকুরি নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আজম খান। তিনি বলেন, যেসব অমুক্তিযোদ্ধা ও তাদের ওয়ারিশ জালিয়াতির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিভিন্ন চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধি-৭১ এর নোটিশের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

এর আগে জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের আলোচনায় এনসিপির আখতার হোসেন বলেন, বিগত দেড় দশকে প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের অত্যন্ত স্পর্শক দপ্তরগুলোতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পেয়ে ঘাপটি মেরে থাকা বিশালসংখ্যক সুবিধাভোগী কর্মকর্তা কর্মচারী বর্তমানে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুনরায় ক্ষমতায় আনতে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ প্রাপ্ত ৯০ হাজার ৫২৭ জনের সনদ যাচাই বাছাইকালে ইতোমধ্যে অন্তত ৮ হাজার জনের সনদে জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। প্রতি ১০০ জনের মধ্যে সাত আট জনের তথ্যে গুরুতর গরমিল পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচারী আমলে জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এই চক্রকে অবিলম্বে চাকরিচ্যুতি করে আইনের আওতায় আনা না হলে এরা রাষ্ট্রের গোপনীয় তথ্য পাচার করে বা ১৯৯৬ সালের মত সিভিল মিলিটারি বা জুডিশিয়াল ক্যু এর উসকানি দিয়ে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুনর্বাসনের মাধ্যমে বড় ধরনের জাতীয় সংকট তৈরি করতে পারে। তিনি ভুয়া সনদধারী সকল কর্মকর্তা কর্মচারীকে দ্রুততম সময়ে চাকরিচুত করার বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চান।

Scroll to Top