ইরানের রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লার বাইরে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে শনিবার (৪ জুলাই) ভোর থেকেই হাজারো মানুষ দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়েছেন। সকাল ছয়টার দিকে অনুষ্ঠানস্থলের প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হলে সেখানে অপেক্ষমাণ মানুষের ঢল নেমে আসে।
শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শোক ও দাফন কর্মসূচি। আগামী সাত দিন ধরে ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে শোকযাত্রা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলবে। প্রথম দিনেই তেহরানে বিভিন্ন দেশের নেতারা তাঁর প্রতি শেষশ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
শনিবার ও রোববার সাধারণ মানুষের জন্য শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং তাঁর পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
ইরানি কর্তৃপক্ষের ধারণা, সাড়ে তিন দশক দেশটির নেতৃত্ব দেওয়া খামেনিকে শেষবিদায় জানাতে আগামী তিন দিনে শুধু তেহরানেই দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে।
শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই বহু মানুষ ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লার বাইরে অপেক্ষা করতে শুরু করেন। শনিবার ভোরের পর সেই ভিড় আরও বাড়তে থাকে। সকাল ছয়টা থেকে জনসাধারণের জন্য অনুষ্ঠানস্থল উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
শেষশ্রদ্ধা জানাতে আসা সোমায়ি হামেদি নামে এক ব্যক্তি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা আমাদের নেতাকে শেষবিদায় জানাতে চাই। তাই এভাবে অপেক্ষা করাটা আমাদের জন্য বেদনাদায়ক কিংবা কঠিন কিছু নয়।’
বিপুল জনসমাগমকে কেন্দ্র করে তেহরানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল সীমিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আকাশপথও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ১৯৮৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর এটিই দেশটির সবচেয়ে বড় জনসমাগম হতে যাচ্ছে। সে সময় তাঁর শেষকৃত্যে প্রায় এক কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
নিরাপত্তাজনিত কারণে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি শোকানুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন না। সম্প্রতি তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শোক কর্মসূচি অনুযায়ী, সোমবার ও মঙ্গলবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ নিয়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের কোম শহরে শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বুধবার মরদেহ ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেওয়া হবে। সেখান থেকে কারবালা পর্যন্ত জনসাধারণের অংশগ্রহণে শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
পরে মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। আগামী শুক্রবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরের ইমাম রেজার মাজারে তাঁকে দাফন করা হবে। মাশহাদই ছিল তাঁর জন্মস্থান।
এর আগে গত মার্চে তাঁকে দাফনের পরিকল্পনা থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই সূচি পিছিয়ে যায়।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই হামলার মধ্য দিয়েই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হয়। পরে সংঘাতের ৪০ দিন পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। গত ১৭ জুন দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে। বর্তমানে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্থায়ী শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চলছে।
খামেনির প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাতে শুক্রবার তেহরানে বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলও অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।
এ ছাড়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখেইল কাভেলাশভিলি, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ, ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন ও কেন্দ্রীয় উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারিটা, চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির সহসভাপতি হে ওয়েই, তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ছাড়াও ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিরা প্রয়াত ইরানি নেতার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানান।


