জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খরা ও মরুকরণ মানবসভ্যতার জন্য অন্যতম বড় হুমকি হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য ও সমাজনীতি বিষয়ক গবেষক এবং গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান।
বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বুধবার (১৭ জুন) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূমি বর্তমানে মরুকরণের ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘ভূমির অধিকার ও ভবিষ্যৎ: খরা মোকাবিলায় নারীর নেতৃত্ব ও সম্মিলিত প্রয়াস’ ভূমির স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা রক্ষার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ড. আনিসুর রহমান বলেন, নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশও ক্রমেই খরা ও ভূমি অবক্ষয়ের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুরসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি খরার প্রবণতা বাড়ছে।
তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরণ বদলে গেছে। একদিকে অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও বন্যা, অন্যদিকে অনাবৃষ্টির কারণে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, মরুকরণ ও খরার পেছনে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণও বড় ভূমিকা রাখছে। বোরো চাষে ভূগর্ভস্থ পানির অতিনির্ভরশীলতা, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং রাসায়নিক সারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ভূমির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে।
অভিন্ন নদীগুলোর উজানে পানি প্রত্যাহার ও বাঁধ নির্মাণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে অনেক নদী প্রায় শুকিয়ে যাচ্ছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ড. আনিসুর রহমান বলেন, খরা ও মরুকরণের প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে ফসলহানি, গবাদিপশুর খাদ্যসংকট এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ুজনিত কারণে গ্রাম থেকে শহরমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা নগরায়ণ ও সামাজিক সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
সংকট মোকাবিলায় তিনি ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ, নদী-খাল পুনঃখনন, খরা ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবনে গবেষণা, সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণ এবং আধুনিক সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করেন। পাশাপাশি অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে কার্যকর পানি কূটনীতি জোরদারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
ড. আনিসুর রহমান বলেন, ‘ভূমি কোনো সীমাহীন সম্পদ নয়। একবার মাটির উর্বরতা হারিয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে এখনই ভূমি ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
তিনি সরকার, পরিবেশবাদী সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণকে ভূমি অবক্ষয় রোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বৃক্ষরোপণ ও টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশকে মরুকরণের ঝুঁকি থেকে রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন।





