নেদারল্যান্ডসের আধিপত্য নাকি জাপান-সুইডেনের গতিঝড়, কার হাতে নকআউট টিকিট | চ্যানেল আই অনলাইন

নেদারল্যান্ডসের আধিপত্য নাকি জাপান-সুইডেনের গতিঝড়, কার হাতে নকআউট টিকিট | চ্যানেল আই অনলাইন

ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন কিছু গ্রুপ থাকে, যেখানে শুধু পয়েন্টের লড়াই নয়, মুখোমুখি হয় ইতিহাস, স্বপ্ন আর নতুন সম্ভাবনা। ২০২৬ বিশ্বকাপের ‘গ্রুপ-এফ’ যেন ঠিক তেমনই এক যুদ্ধক্ষেত্র। একদিকে তিনবারের রানার্সআপ নেদারল্যান্ডস। বিশ্ব ফুটবলকে টোটাল ফুটবলের দর্শন উপহার দেয়া দলটি এখনও খুঁজছে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি। তবে অধরা শিরোপা পথে গ্রুপপর্বে তাদের বড় বাধা জাপান ও সুইডেন। এমনকি রক্ষণে মনোযোগ রেখে যেকোনো দলের পয়েন্ট কেড়ে নিতে পারে আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়াও।

কাগজে-কলমে এবং শক্তিমত্তায় এই গ্রুপে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবে। ভার্জিল ফন ডাইকের নেতৃত্বে আবারও শিরোপার স্বপ্ন দেখছে ডাচ বাহিনী। তবে পথটা মোটেও সহজ নয়। কারণ একই গ্রুপে আছে এশিয়ার পরাশক্তি জাপান। বড় বড় দলকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয় সামুরাই ব্লুরা। এবার তাদের লক্ষ্য ইতিহাসের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনাল। গ্রুপের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী সুইডেন। ভিক্টর গাইকেরেসকে সামনে রেখে আবারও বিশ্বমঞ্চে ফিরেছে তারা। অন্যদিকে, আফ্রিকার নীরব যোদ্ধা তিউনিসিয়া নিজেদের সপ্তম বিশ্বকাপ মিশনে নামছে গ্রুপপর্ব পেরুবার লক্ষ্যে। শক্তিমত্তা ও ইতিহাসের বিচারে কে কতটা এগিয়ে, চলুন দেখে নেওয়া যাক চ্যানেল আই অনলাইনের বিশ্লেষণ এক নজরে।

ফিফার সবশেষ প্রকাশিত র‌্যাঙ্কিংয়ে ‘এফ’ গ্রুপে সবার চেয়ে এগিয়ে নেদারল্যান্ডস। ৯ নম্বরে আছে তারা। এরপরই অবস্থান জাপানের, র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৮ নম্বরে দেশটি। ৪৮ নম্বরে থাকা আইভরি কোস্ট আছে তৃতীয় স্থানে। সবার শেষে অবস্থান করা তিউনিসিয়ার ফিফা র‌্যাঙ্কিং ৪৬তম।

নেদারল্যান্ডস
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ট্রাজিক এবং রোমাঞ্চকর নাম নেদারল্যান্ডস। বিশ্ব ফুটবলে ছাপ রাখা অনেক ফুটবলারই জন্ম নিয়েছে দেশটিতে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, কখনোই বিশ্বকাপ জিততে পারেনি নেদারল্যান্ডস। অথচ বিশ্বকাপে বরাবরই শক্তিধর দল হিসেবে বিবেচিত হয় ডাচরা। বিশ্বকাপে মোট ১১বার অংশ নিয়ে নিজেদের সামর্থের প্রমাণ দিয়ে ১৯৭৪, ১৯৭৮ এবং ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে। সবশেষ ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয় তারা।

ইউরোপীয় অঞ্চলের বাছাইয়ে অপরাজিত থেকেই চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিয়েছে রোনাল্ড কোম্যানের দল। এবার ডাচ দলের শক্তির জায়গা রক্ষণ। এছাড়া বল দখলে রাখা, দ্রুত পাসিং ও আক্রমণাত্মক ট্রানজিশনে এগিয়ে থাকবে তারা।

জাপান
নতুন ভোরের প্রতীক্ষায় সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের। গত বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারানো ব্লু সামুরাইরা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা এখন আর শুধু লড়াকু দল নয়, বরং জায়ান্ট কিলার। স্বাগতিকদের বাইরে প্রথম দেশ হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে তারা। জাপান এখন আর শুধু রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে না, বরং তাদের প্রেসিং এবং দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ শক্তিশালী রক্ষণভাগের জন্য আতঙ্কের কারণ। এছাড়া ইউরোপের ক্লাবগুলোতে তাদের উপস্থিতি এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে সামুরাইদের আত্মবিশ্বাসকে।

১৯৯৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেয় জাপান। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। তবে শেষ ষোলো তাদের সেরা সাফল্য। ২০০২, ২০১০, ২০১৮ ও ২০২২-চারবার নকআউট পর্বে পৌঁছালেও কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্নটি এখনো অধরাই রয়ে গেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে জাপানের লক্ষ্যটা তাই প্রথমবারের মতো শেষ আটের বাধা টপকানো। কন্ডিশনিং এবং দীর্ঘ ভ্রমণের ধকল সামলে উত্তর আমেরিকার বৈরী আবহাওয়ায় জাপান যদি তাদের সহজাত গতি বজায় রাখতে পারে, তবে নতুন কোনো রূপকথা লেখা হওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার।

সুইডেন
১৯৫৮ সালের রানার্স-আপ এবং ১৯৯৪ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান অধিকারী সুইডেন ২০২২ বিশ্বকাপে বাছাইপর্ব পেরোতে পারেনি। এবারের বাছাইপর্বেও একই পথে হাঁটছিল তারা। ছয় ম্যাচের একটিতেও জয়ের মুখ দেখেনি, গ্রুপের তলানিতে থেকেই শেষ করেছিল। তাতে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে থাকার কথা ছিল না তাদের। তবে নেশনস লিগের সমীকরণের মারপ্যাঁচে পাওয়া ‘লাইফলাইন’কে কাজে লাগিয়েছে তারা।

লিগ ‘বি’ থেকে অবনমিত হওয়াটাই যেন শেষ পর্যন্ত তাদের ভাগ্য খুলে দেয়। ২০২৪-২৫ মৌসুমে লিগ ‘সি’তে আজারবাইজান ও এস্তোনিয়ার মতো দলগুলোর বিপক্ষে সহজ জয় প্লে-অফের দরজা খুলে দেয় দেশটি। কিন্তু প্লে-অফে ইউক্রেন আর পোল্যান্ডের মতো শক্তিশালী বাধা টপকানো ছিল কঠিন। তবে গ্রাহাম পটারের যাদুর কাঠিতে বিশ্ব মঞ্চের টিকিট কেটেছে তারা।

বাছাইপর্বের সেই নড়বড়ে রক্ষণ আর দিশাহীন মাঝমাঠ এখন পটারের অধীনে অনেক বেশি সুসংহত এবং আত্মবিশ্বাসী। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে আমেরিকান মাটিতে তৃতীয় হওয়া দলটি এবারও সেই মিরাকেলের অপেক্ষায়। এবার তকমাটা ‘আন্ডারডগ’ হলেও তাদের শক্তিমত্তা কোনো অংশেই কম নয়। এখন দেখার বিষয়, গ্রুপপর্ব পেরিয়ে আরও বড় কোনো চমক উপহার দেয় কিনা তারা।

১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার মাটিতে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নামে তিউনিসিয়া। মেক্সিকোর বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ৩-১ গোলে জয় পায়। প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে জয়ের স্বাদ পায় তারা। তারপর পোল্যান্ডের কাছে মাত্র ১-০ গোলে হারের পর পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ে চমক দেখিয়ে আসর শেষ করেছিল তারা।

তিউনিসিয়া
১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার মাটিতে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নামে তিউনিসিয়া। এরপর ২০ বছরের অপেক্ষা পেরিয়ে ১৯৯৮ সালে ফেরে। পরের দুটি বিশ্বকাপেও টানা অংশ নেয় তারা। এরপর আবার একযুগের অপেক্ষা। ২০১৮ সালে ফেরার পর এ নিয়ে তৃতীয়বা বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে আফ্রিকার দেশটি। সবমিলিয়ে ২০২৬ আসর তাদের সপ্তম অংশ গ্রহণ।

বিশ্বকাপে তারা এখন পর্যন্ত গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে পারেনি, তবে সাম্প্রতিক আসরগুলোতে তাদের ধারাবাহিক উপস্থিতি দলকে অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করেছে। তিউনিসিয়ার বড় শক্তি তাদের শারীরিক ফুটবল ও জমাট রক্ষণভাগ। কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রে যখন তারা মাঠে নামবে, সেই অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণায় ভর করে। বিশ্বকাপে তাদের সেরা সাফল্য মেক্সিকোকে ৩-১ গোলে পরাজিত করা হয়তো তারকাখচিত দল নয়, কিন্তু কঠিন প্রতিরক্ষা আর দলগত শৃঙ্খলার কারণে যে কোনো বড় দলের জন্যই তারা হতে পারে অস্বস্তির কারণ। আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লেখা দলটি এবার খুঁজছে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠার প্রথম সাফল্য।

শক্তিমত্তা ও অভিজ্ঞতার বিচারে গ্রুপ-এফ থেকে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকবে নেদারল্যান্ডস। আসল লড়াইটি হবে মূলত দ্বিতীয় স্থান নিয়ে। সেখানে জাপানের গতি বনাম সুইডেনের পাওয়ার-ফুটবলের একটি দুর্দান্ত মহাকাব্যিক লড়াই দেখা যাবে। জাপান অবশ্য তাদের সাম্প্রতিক বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা এবং বড় ম্যাচ জেতার অভ্যাসের কারণে সুইডেনের চেয়ে এগিয়ে থাকবে। অন্যদিকে তিউনিসিয়া যদি কোনো অঘটন ঘটিয়ে পয়েন্ট কেড়ে নিতে পারে, তবে এই গ্রুপের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, তিনবারের রানার্সআপদের অপূর্ণ স্বপ্ন, এশিয়ার নতুন শক্তির উত্থান, সুইডেনের প্রত্যাবর্তন আর তিউনিসিয়ার ইতিহাস বদলের লড়াই। সব মিলিয়ে গ্রুপ এফ হতে যাচ্ছে রোমাঞ্চ, নাটক আর অনিশ্চয়তায় ভরপুর এক অধ্যায়।

Scroll to Top