দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ, বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পাচ্ছে আসামিরা, এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে এক গবেষণায়।
শনিবার (২ মে) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় এই গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং তা নিরসনের উপায়’ শীর্ষক এ গবেষণা উপস্থাপন করা হয় সভায়। আয়োজন করে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা (সেলপ) কর্মসূচি।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিষ্পত্তিকৃত মামলাগুলোর মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশে সাজা হয়েছে, ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস দেওয়া হয়েছে এবং ১৩ শতাংশ মামলায় আপস হয়েছে। আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে সময় লাগছে প্রায় ১ হাজার ৩৭০ দিন বা ৩ দশমিক ৭ বছর। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার তারিখ পড়ছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। জাতীয় বাজেটের দিকে তাকালে এটি স্পষ্ট হয়। পুরো বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা, সেখানে শুধু বিটিভির জন্য বরাদ্দ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বিচার বিভাগ এই সীমিত বরাদ্দে পরিচালিত হচ্ছে বিচারকদের বেতন, প্রশাসনিক খরচ, অবকাঠামো সবকিছু মিলিয়ে এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ মামলা কমিয়ে ৪ লাখে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। তবে মামলার শাখা-প্রশাখা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হচ্ছে। বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়াতে মানসিকতা, কাঠামো ও সক্ষমতায় পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্। তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা থেকেই রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়। এসব খাতে কার্যকর সেবা না থাকলে সামগ্রিকভাবে আস্থা কমে যায়।
তিনি আরও বলেন, বাজেট বাড়ানো জরুরি কিন্তু এটা সমাধান নয়। জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ না থাকলে পরিবর্তন আসবে না। নারী ও শিশুবান্ধব বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে ফলাফল নির্ভর কাজ করতে হবে। কাঙ্খিত বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিতে প্রয়োজন ‘কালেক্টিভ রেসপনসিবিলিটি’, এ জন্য সব পক্ষকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে এবং ‘এক সরকার’ এর ধারনাকে জোরদার করা দরকার যেখানে পুলিশ, চিকিৎসক ও আইন মন্ত্রনালয়ের প্রতিনিধিরা ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করবেন সবচেয়ে দুর্বলকে মাথায় রেখে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, সাজার হার কম হওয়ায় অনেকে ধারণা করেন মিথ্যা মামলা হয়, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যেসব নারী সহিংসতার শিকার হন, তার প্রায় ৭০ শতাংশই সামাজিক কাঠামো, মানসিকতা ও সামাজিক কলঙ্কের কারণে আদালত পর্যন্ত আসেন না। এসব মামলায় কঠোর শাস্তির বিধান থাকায় অভিযুক্ত পক্ষ নানাভাবে চাপ তৈরির চেষ্টা করে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে জটিলতার কারণে অনেক মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে।
গবেষণার তথ্যে দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। অভিযোগকারী ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ঘনঘন সময় প্রার্থনা, তদন্তে বিলম্ব, দুর্বল প্রমাণ ব্যবস্থা এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাব বিচার বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে গবেষণায় চিহ্নিত হয়েছে। আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য এ প্রতিবন্ধকতাসমূহের যথাযথ সমাধান না করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫-এ সময়সীমা কমিয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে।
গবেষণায় বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। তার মধ্যে আইনগত সময়সীমা কঠোরভাবে তদারকি, অপ্রয়োজনীয় মুলতবি সীমিত করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, সময়মতো ফরেনসিক ও মেডিকেল রিপোর্ট প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, প্রসিকিউটরদের কার্যক্রম মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু, গোপনীয় বিচার এবং ভুক্তভোগী-সংবেদনশীল বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, অন্যান্য সহায়ক সেবা (আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং, আশ্রয়কেন্দ্র) সম্প্রসারণ ও মামলার অধিক চাপযুক্ত জেলাগুলোতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি করা অন্যতম।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে সারাদেশে ব্র্যাকের সেলপ কর্মসূচি ২৬৮টি আইন সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে আইনি সহায়তা দিয়েছে, যাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। প্রায় ১১ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছেছে আইনি সচেতনতার বার্তা, যা তাদের আত্মবিশ্বাস ও ন্যায়বিচার পাওয়ার সক্ষমতা বাড়িয়েছে



